ফেলুদা, ব্যোমকেশ বাঙালির মননে বহু দিন। তবে গত কয়েক বছর ওটিটি প্ল্যাটফর্ম এবং রুপোলি পর্দার দৌলতে তরুণ প্রজন্মের মনে জায়গা করে নিয়েছে আর এক গোয়ন্দা চরিত্র একেন। সম্প্রতি মুক্তি পয়েছে ‘দ্য একেন: কেরালায় কুরুক্ষেত্র’। বাপি ও প্রমথকে সঙ্গে নিয়ে একেনবাবু জড়িয়ে পড়েছে এমন এক রহস্যে, যার সূত্র লুকিয়ে রয়েছে এক জটিল ষড়যন্ত্রে।
একেনবাবু ছবি মানে শুধু রহস্যের জট নয়, প্রতিটি ছবিতে থাকে দুর্দান্ত লোকেশন। সিনেমা দেখার সঙ্গে সঙ্গে দর্শকদের একপ্রস্ত মানসভ্রমণও হয়ে যায়। এ বার একেনবাবু কেরলমে। এক সাক্ষাৎকারে একেনবাবুর চরিত্রে অভিনয়কারী অনির্বাণ চক্রবর্তী জানিয়েছেন, এই ছবির শুটিং হয়েছে কোচি, মুন্নার এবং আলেপ্পিতে। ভ্রমণপিপাসুদের কাছে কেরলমের এই তিন জায়গাই জনপ্রিয়। পর্দায় একেন দেখার পাশাপাশি পরিকল্পনা করতে পারেন কেরলম সফরের। কী ভাবে ছবির শুটিং স্পটগুলি ঘুরে নেবেন?
শুরুটা কোচি থেকেই করা ভাল। এখানে রয়েছে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এরনাকুলাম জংশন রেলস্টেশন। ফলে রেলপথে বা বিমানপথে— দু'ভাবেই আসা যাবে। কোচি কেরলমের বাণিজ্যিক রাজধানী হিসাবে পরিচিত। বহু শতক ধরে এই বন্দর শহর পর্তুগিজ, ডাচ এবং ব্রিটিশ ব্যবসায়ীদের বাণিজ্যকেন্দ্র ছিল। ফলে কোচিতে দেখা মেলে বিবিধ স্থাপত্যের।
চাইনিজ় ফিশিং নেট এখানকার অন্যতম আকর্ষণ। ছবি:সংগৃহীত।
একটি দিন রাখুন কোচি শহরটি ঘুরে দেখার জন্য। আরব সাগরের তীরে ফোর্ট কোচি, ডাচ প্যালেস, ইহুদিদের সিনাগগ, চাইনিজ় ফিশিং নেট ও অবশ্যই মিউজিয়াম দেখুন। ফোর্ট কোচিতে দেখুন পর্তুগিজ নাবিক ভাস্কো ডা গামার সমাধিস্থল। যাঁরা ঐতিহাসিক শহর দেখতে ভালবাসেন, তাঁরা কোচিতে দু’রাত থেকে যান।
আথিরাপল্লি জলপ্রপাতও সময় করে ঘুরে নিতে পারেন। ছবি:সংগৃহীত।
আরও একটি দিন বাড়িয়ে তালিকায় জুড়ে নিতে পারেন আথিরাপল্লি জলপ্রপাত। “বর্ষোরে মেঘা মেঘা…” ঐশ্বর্যা রাইয়ের নাচের দৃশ্যে দেখা গিয়েছিল দুধ সাদা এই জলপ্রপাতের অংশ। চালাকুডি নদীর জলই ঝরে পড়ছে জলপ্রপাত হয়ে। কোচি থেকে এই স্থানের দূরত্ব পড়বে ১২০ কিলোমিটার। কোচি থেকে সকালে বেরিয়ে জলপ্রপাত দেখে মুন্নারেও চলে যেতে পারেন, আবার কোচিতেও ফিরতে পারেন।
কোচি থেকে মুন্নার
কোচি থেকে সরাসরি মুন্নারে গেলে দূরত্ব পড়বে ১২৫ কিলোমিটার। গাড়ি বুক করে নেওয়াই ভাল। সে ক্ষেত্রে আসার পথে দেখে নিতে পারেন ভারালা জলপ্রপাত। পথেই পড়ে এই জলপ্রপাত। চাইলে টিকিট কেটে ঢুঁ মারতে পারেন এখানকার ভেষজ বাগানে। মুন্নারে আসার পাহাড়ি পথের ঢালে সবুজ চা-বাগিচার সৌন্দর্য বার বার থমকাতে বাধ্য করবে।
৫,২০০ ফুট উচ্চতায় শৈলশহরটিতে সারা বছর আবহাওয়া থাকে মনোরম। সন্ধ্যার পরে হালকা ঠান্ডা লাগে। ঢেউখেলানো সবুজ চা বাগান, মশলার বাগান, ঘন জঙ্গল, উচ্ছ্বল ঝর্না, হ্রদ, পাহাড়ি নদী— এ সব নিয়েই তার সৌন্দর্য।
শৈলশহর মুন্নার থাক ভ্রমণতালিকায়। ছবি:সংগৃহীত।
মুন্নার ভাল ভাবে দেখতে হলে দুই-তিন দিন হাতে রাখুন। এখানকার অন্যতম আকর্ষণ পাহাড়ের কোলে মাট্টুপ্পেট্টি জলাধার। মাট্টুপ্পেট্টির টলটলে পান্না-সবুজ জলে নৌকায় ভেসে পড়ুন। এর পর ইকো পয়েন্ট দেখে চলে আসুন কুন্ডলা লেক। শহর থেকে ৩২ কিলোমিটার দূরে ১৭০০ মিটার উচ্চতায় মুন্নারের সর্বোচ্চ স্থানে পৌঁছে দিগন্তবিস্তৃত পশ্চিমঘাট পাহাড় আর মেঘ-কুয়াশার খেলা দেখুন। এ ছাড়া ৯ কিলোমিটার দূরে দেখে নিতে পারেন আট্টুকাল জলপ্রপাত। প্রথম দিনের সফর শেষ হবে পোথোমেডু ভিউ পয়েন্টে। সূর্য ডোবার পালা শেষ করে ফিরুন হোটেলে।
দ্বিতীয় দিন ঘুরে নিন এরাভিকুলাম জাতীয় উদ্যান। অনেকেই একে রাজামালাই নামে চেনেন। এই স্থান নীলগিরি থার নামে এক প্রকার পাহাড়ি ছাগলের বাসস্থান। দেশের মধ্যে একমাত্র এই পাহাড়ি অভয়ারণ্যেই তার দেখা মেলে। ফেব্রুয়ারি-মার্চ ছাড়া সারা বছরই অরণ্য খোলা থাকে সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত। পারমিট নিয়ে বনবিভাগের মিনিবাসে রোমাঞ্চকর বনভ্রমণ উপভোগ করুন। অগ্রিম অনলাইন টিকিট কেটে নিতে পারেন। বন দফতরের বাসে ভিতরে ঘোরা যায়। কিছুটা অংশ হেঁটে দেখার সুযোগ থাকে।
মুন্নার থেকে আলেপ্পি
মুন্নার সফর শেষ করে তালিকায় জুড়ে নিতে পারেন আলেপ্পি। বর্তমান নাম আলাপ্পুঝা। সড়কপথে দূরত্ব ১৭২ কিলোমিটারের মতো। সাড়ে ৫-৬ ঘণ্টা সময় লাগবে।
ভেম্বানাদ হ্রদ, পুন্নামাডা হ্রদ ও আরব সাগরে ঘেরা এই শহরের বুক চিরে অসংখ্য খাঁড়িপথের জাল তৈরি হয়েছে। জলপথের এমন বিস্তারের জন্য অনেকে এই স্থলকে ‘প্রাচ্যের ভেনিস’-ও বলেন। খাঁড়িপথের দু’পাশে নারকেল গাছের সারি। কোথাও সবুজ ধানখেত। বিশাল জলপথের পাশেই দ্বীপের মতো ছোট ছোট গ্রাম। এমন সৌন্দর্য ভারতে শুধু কেরলমেই মেলে।
কেরলমের ব্যাকওয়াটারে চলছে হাউস বোট। ছবি:সংগৃহীত।
বেসরকারি ভেসেলে বা সরকারি জলযানে উঠে ভেসে পড়ুন জলজীবনের ছবি দেখতে। ব্যাকওয়াটারে ভাসতে ভাসতে দৃশ্যমান হবে ঘরবাড়ি, নারকেল গাছের সারি, কাজু আর গোলমরিচের বাগান, পাখিদের আনাগোনা। টুকরো টুকরো জলছবি দেখতে দেখতে এক সময় পৌঁছে যাবেন প্রসারিত অষ্টমুড়ি লেকে।
এখানে চাইনিজ ফিশিং নেট নিয়ে জেলেদের ব্যস্ততা চলছে আর ভেসে আছে হাউসবোট। অভিজ্ঞতা স্মরণীয় করতে চাইলে হাউসবোট ভাড়া করেও থাকতে পারেন। কাশ্মীরের হাউসবোটের চেয়ে কেরলমের হাউসবোট আলাদা। জলপথে ভেসে ছোটখাটো ‘স্টপেজ’-এ নেমে চেখে নেতে পারেন কেরলমের রন্ধনশৈলীতে তৈরি চিংড়ি থেকে রকমারি খাবার। ব্যাকওয়াটারে ‘দিল সে’-সহ একাধিক হিন্দি এবং দক্ষিণী ছবির শুটিং হয়েছে। কেরলমের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য একে 'ঈশ্বরের আপন দেশ বলে’। এই তিন জায়গার বাইরেও কেরলমে অসংখ্য দর্শনীয় স্থল রয়েছে। কোভালম, ভারকালার মতো একাধিক সমুদ্র সৈকত না দেখলে কেরলম ভ্রমণ অসম্পূর্ণ রয়ে যেতে পারে।
কোথায় থাকবেন
কেরলমের যে কোনও পর্যটনস্থলেই ছোট-বড়, মাঝারি নানা মাপের হোটেল, রিসর্ট রয়েছে। চাইলে হোম স্টে-ও পেয়ে যেতে পারেন।
কী ভাবে যাবেন
কোচিতে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর রয়েছে। ট্রেনে গেলে নামুন এরনাকুলাম জংশন স্টেশনে। তিরুঅনন্তপুরম হয়েও যাওয়া যায়।