একই মায়ের সন্তান। সেই তিন বোন বিয়ে করলেন এক জনকেই! উত্তরপ্রদেশের অমরোহা জেলার ঘটনাটি ইতিমধ্যেই হইচই ফেলে দিয়েছে সে রাজ্য জুড়ে। আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। আলোড়ন পড়েছে সমাজমাধ্যমেও। জানা গিয়েছে, অমরোহার বাসিন্দা ওই তিন বোন স্থানীয় মন্দিরে একই সঙ্গে একই যুবককে বিয়ে করেছেন। বিয়ের পর একে অপরের থেকে আলাদা হয়ে যাওয়ার বিষয়টি সহ্য করতে পারবেন না জানিয়েই তাঁরা ওই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন। তিন বোনের একই যুবককে বিয়ের একাধিক ভিডিয়ো ইতিমধ্যেই প্রকাশ্যে এসেছে। ভাইরাল হয়েছে ভিডিয়োগুলি। যদিও সেই ভিডিয়োর সত্যতা যাচাই করেনি আনন্দবাজার ডট কম।
আরও পড়ুন:
সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অমরোহার হাসানপুরের ধৌরিয়া গ্রামের বাসিন্দা সরোজ, সাবিত্রী এবং সন্তোষ তিন বোন। গত ১৭ জুলাই চামুণ্ডা মাতা মন্দিরে বিকাশ নামের এক যুবকের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তাঁরা। তিন বোনই এলাকায় সমাজমাধ্যমে রিল এবং ভিডিয়ো বানানোর জন্য পরিচিত ছিলেন। বিকাশ তাঁদের সেই সব ভিডিয়োর চিত্রগ্রাহক হিসাবে কাজ করতেন। সেই বিকাশকেই একসঙ্গে বিয়ের সিদ্ধান্ত নেন সরোজ, সাবিত্রী এবং সন্তোষ।
তিন বোনের বিয়ের ভিডিয়োয় দেখা গিয়েছে, হিন্দু রীতি মেনে বিয়ের আচার-অনুষ্ঠান পালন করছেন বিকাশ। শাড়ি পরে, মাথায় ঘোমটা দেওয়া বরের পাশে সারিবদ্ধ ভাবে বসে রয়েছেন তিন বোন। আচার-অনুষ্ঠান শেষে বিকাশ তিন বোনের প্রত্যেকের সিঁথিতে সিঁদুর পরিয়ে দেন এবং অগ্নিকে সাক্ষী রেখে তাঁদের সঙ্গে সাত পাক ঘোরেন। উল্লেখ্য, এই অনুষ্ঠানে পুরোহিত ছাড়া উভয় পক্ষের কোনও আত্মীয় বা বন্ধু-বান্ধব উপস্থিত ছিলেন না।
ধৌরিয়া গ্রামের বাসিন্দা তথা কন্টেন্ট ক্রিয়েটর (বিষয়স্রষ্টা) তিন বোন জানান, তাঁরা সব সময়ই একসঙ্গে থেকেছেন এবং ভিন্ন ভিন্ন পুরুষকে বিয়ে করে আলাদা হয়ে যাওয়ার কথা ভেবেই তাঁরা মানসিক ভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে বড় বোন সরোজের দাবি, বিয়ের পর তিন বোন আলাদা হয়ে যাবেন ভেবে তাঁরা আত্মহত্যার কথাও ভেবেছিলেন। পরে সিদ্ধান্ত বদলে ফেলেন। ঠিক করেন, তিন বোন মিলে এক জনকেই বিয়ে করবেন এবং একসঙ্গে থাকবেন। তিন বোনই জানিয়েছেন, তাঁরা সবাই প্রাপ্তবয়স্ক এবং স্বেচ্ছায় এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
আরও পড়ুন:
সরোজ, সাবিত্রী এবং সন্তোষ এ-ও জানিয়েছেন, বিকাশ গত ছ’মাস ধরে তাঁদের ক্যামেরাম্যান হিসাবে কাজ করছিলেন এবং সমাজমাধ্যমের জন্য তৈরি ভিডিয়োগুলিতে প্রায়ই তাঁদের স্বামীর চরিত্রে অভিনয় করতেন। তাই তাঁকেই সত্যিকারে স্বামী বানানোর সিদ্ধান্ত নেন তিন বোন। অন্য দিকে বিকাশ জানিয়েছেন, বোনেদের একে অপরের প্রতি গভীর ভালবাসার বিষয়টি বুঝতে পেরেই তিনি তাঁদের বিয়ের প্রস্তাব গ্রহণ দেন। বিকাশ সংবাদমাধ্যমে বলেন, ‘‘ওরা (তিন বোন) বার বার আমাকে বলছিল যে বিয়ের পর আলাদা থাকতে চায় না। আমি ওদের আবেগকে সম্মান জানিয়েছি এবং বিয়েতে রাজি হয়েছি কারণ আমিও চেয়েছিলাম ওরা যেন একসঙ্গে থাকতে পারে। আমরা পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি এবং আশা করি মানুষ আমাদের এই পছন্দকে সম্মান জানাবে।’’
কিন্তু এই বিয়ে কি আদৌ বৈধ? ১৯৫৫ সালের হিন্দু বিবাহ আইন অনুযায়ী, একটি হিন্দু বিয়ে সাধারণত তখনই বৈধ বলে গণ্য হয় যখন বিয়ের সময় কোনও পক্ষেরই আগের পক্ষের কোনও জীবনসঙ্গী জীবিত থাকেন না। এর অর্থ হল, ভারতে হিন্দুদের ক্ষেত্রে বহুবিবাহ, অর্থাৎ এক জন পুরুষের একাধিক স্ত্রী বা এক নারীর একাধিক স্বামী থাকা— কোনওটিই আইনত স্বীকৃত নয়। ফলে বিয়ের ভিডিয়ো অনলাইনে ব্যাপক সাড়া ফেললেও এই বিয়ের আইনি মর্যাদার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ভাবে কিছু জানা যায়নি।
আরও পড়ুন:
অন্য দিকে, তাঁদের সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি দেওয়ার সময় পৌরাণিক কাহিনির তুলনা টেনেছেন সরোজ, সাবিত্রী এবং সন্তোষ। সমাজমাধ্যমে সমালোচনার মুখে ওই বোনেরা নিজেদের সিদ্ধান্তের সপক্ষে যুক্তি দিয়ে আরও একটি ভিডিয়ো প্রকাশ করেন। হিন্দু পৌরাণিক কাহিনির প্রসঙ্গ টেনে তাঁরা যুক্তি দেখান, একাধিক জীবনসঙ্গী থাকার ঐতিহাসিক নজির বহু শতাব্দী ধরেই রয়েছে। তাঁরা বলেন, ‘‘রাজা দশরথের তিন রানি ছিলেন। তখনও কি সেটা কোনও অপমানজনক বিষয় ছিল?’’ তাঁদের সেই বক্তব্য বিতর্ককে আরও উস্কে দিয়েছে। কেউ কেউ বিষয়টিকে ব্যক্তিগত স্বাধীনতার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলেও অনেকে যুক্তি দিয়েছেন যে পৌরাণিক কাহিনি এবং আধুনিক আইনের তুলনা করা যায় না।
আরও পড়ুন:
তিন বোনের বিয়ের ভিডিয়োগুলি সমাজমাধ্যমে একাধিক অ্যাকাউন্ট থেকে পোস্ট করা হয়েছে। ইতিমধ্যেই বহু মানুষ দেখেছেন সেই ভিডিয়ো। লাইক এবং কমেন্টের বন্যা বয়ে গিয়েছে। ভিডিয়োটি দেখার পর নেটাগরিকদের অনেকে যেমন মজার মজার মন্তব্য করেছেন, তেমনই আবার বিস্ময় প্রকাশ করেছেন অনেকে। ঘটনাটির সমালোচনাও করেছেন নেটাগরিকদের একাংশ। এক নেটাগরিক লিখেছেন, ‘‘ব্যক্তিগত পছন্দ এবং সঙ্গী বেছে নেওয়ার ব্যক্তিগত অধিকারকে বাঁচিয়ে রাখা উচিত। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে এঁরা বিয়ে নিয়ে ছেলেখেলা করছেন।’’ অন্য এক জন আবার মজা করে লিখেছেন, ‘‘এখানে বিয়ের জন্য এক জন মেয়েও পাওয়া যাচ্ছে না, আর দাদা তিন জনকে বিয়ে করেছেন।’’ তৃতীয় এক নেটাগরিক মন্তব্য করেছেন, ‘‘হিন্দু বিবাহ আইন, ১৯৫৫ অনুসারে, হিন্দুদের জন্য বহুবিবাহ অবৈধ।”