একসময় বসিরহাটের কথা বললেই উঠে আসত ‘মুন্সির গামছা’র নাম। বিশিষ্ট অতিথিদের সংবর্ধনা থেকে শুরু করে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সম্মান জানানোর অন্যতম অনুষঙ্গ ছিল হাতে বোনা এই সুতির গামছা। জেলার গণ্ডি ছাড়িয়ে রাজ্যের নানা প্রান্তে যার কদর ছিল, সেই ঐতিহ্যবাহী শিল্প আজ অস্তিত্বের সংকটে। পাওয়ারলুমের সঙ্গে প্রতিযোগিতা, সুতোর লাগামছাড়া দাম এবং লাভজনক বাজারের অভাবে একের পর এক বন্ধ হয়ে গিয়েছে তাঁতঘর। এখন হাতে গোনা কয়েকজন কারিগরের হাতেই টিঁকে রয়েছে প্রায় দেড়শো বছরের এই ঐতিহ্য।
উত্তর ২৪ পরগনার বসিরহাটের পিফাঁ, ভ্যাবলা, কেয়ামারি, মাটিয়া-সহ একাধিক এলাকায় একসময় শতাধিক হস্তচালিত তাঁতঘরে তৈরি হত খাঁটি সুতির মুন্সির গামছা। বাংলা-সহ দেশের অন্যত্রও এর বিপুল চাহিদা ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই শিল্প ক্রমশ হারিয়ে যেতে বসেছে। বসিরহাটের বাসিন্দা সাহিত্যিক জয়ন্তী চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘‘এখানকার ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে মুন্সির গামছা। তবে এই নামের নেপথ্যে কোনও নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা পারিবারিক উপাধি রয়েছে কি না, তার লিখিত প্রমাণ মেলেনি। স্থানীয় তাঁতি পরিবারগুলির মুখে মুখেই ছড়িয়ে রয়েছে নামটির ইতিহাসের নানা কাহিনি।’’
বর্তমানে পানিতর গ্রামের কারিগর আব্দুল মান্নান মোল্লা প্রায় একাই এই ঐতিহ্য ধরে রাখার চেষ্টা করছেন। তাঁর কথায়, সারাদিন পরিশ্রম করেও অল্প কয়েকটি গামছা তৈরি হয়। সেই আয়ে সংসার চালানোই কঠিন হয়ে উঠেছে।
একসময় এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত নূর হোসেন মোল্লা জানান, লাভ না থাকায় বহু তাঁতি পেশা বদল করতে বাধ্য হয়েছেন। কেউ দিনমজুর, কেউ ইটভাটার শ্রমিক, কেউ টোটোচালক, আবার অনেকে কাজের খোঁজে ভিনরাজ্যে চলে গিয়েছেন।
স্থানীয় ব্যবসায়ী প্রশান্ত সাহার দাবি, হাতে বোনা মুন্সির গামছার চাহিদা এখনও রয়েছে। কিন্তু কারিগরের সংখ্যা কমে যাওয়ায় বাজারের চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না।
শিল্পের সঙ্গে যুক্তদের দাবি, বসিরহাটের এই ঐতিহ্য রক্ষায় সরকারি উদ্যোগ জরুরি। সুতোর উপর ভর্তুকি, আর্থিক সহায়তা এবং নতুন প্রজন্মকে এই শিল্পে যুক্ত করার ব্যবস্থা না হলে, অদূর ভবিষ্যতে মুন্সির গামছাশুধুই ইতিহাসের অংশ হয়ে যাবে।
বসিরহাট দক্ষিণের তৃণমূল বিধায়ক সুরজিৎ মিত্র বলেন, “বসিরহাটের ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্প মুন্সির গামছার বিষয়টি বিধানসভায় মুখ্যমন্ত্রীর নজরে আনব।” অন্যদিকে, বিজেপির বসিরহাট সাংগঠনিক জেলার সভাপতি সুকল্যাণ বৈদ্য বলেন, “বসিরহাটের নাম শুনলেই বাইরের মানুষ প্রথমে মুন্সির গামছার কথাই বলেন। এই ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করব।”