নাবালিকা বিয়ে নিয়ে কড়া অবস্থান নিয়েছে রাজ্য সরকার। নাবালিকা মা হলে, স্বামীর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। পাশাপাশি বিয়ে যাঁরা দেবেন, সেই কাজী বা পুরোহিতদের বিরুদ্ধেও আইনি পদক্ষেপ করার কথা বলা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশের পরেই নড়েচড়ে বসেছে দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা প্রশাসন। মঙ্গলবার জেলার একাধিক জায়গায় সচেতনতা কর্মসূচির আয়োজন হয়।
নাবালিকা বিয়ে বা কমবয়সে মা হওয়ার ক্ষেত্রে রাজ্যে অনেকটাই এগিয়ে রয়েছে দক্ষিণ ২৪ পরগনা। বিশেষ করে সুন্দরবন লাগোয়া ও অন্য গ্রামীণ এলাকাগুলিতে নাবালিকা বিয়ের প্রবণতা অত্যন্ত বেশি। পাল্লা দিয়ে নাবালিকা মায়ের সংখ্যাও বেশ উদ্বেগজনক। জেলার প্রত্যন্ত এবং সুন্দরবন লাগোয়া কুলতলি ব্লকে চলতি বছরের এপ্রিল থেকে অগষ্ট মাস পর্যন্ত প্রাতিষ্ঠানিক প্রসব হয়েছে ৪৩৮ জন কিশোরীর। স্থানীয় সূত্রের খবর, এর বাইরে বাড়িতেও প্রসব হয়েছে অনেকের। প্রশাসন সূত্রে দাবি, বাল্য বিবাহ রুখতে লাগাতার প্রচার চালানো হয়। কোথাও বাল্য বিবাহের খবর মিললে পুলিশ-প্রশাসন গিয়ে সেই বিয়ে আটকেও দেয়। তারপরেও একটি ব্লকেই এত পরিমাণে কিশোরী মায়ের সংখ্যায় উদ্বেগ বাড়ছে।
এ দিন দুপুরে সাগরের খান সাহেব আবাদ হাই স্কুলে দশম ও একাদশ শ্রেণির দু’শোর বেশি ছাত্রীকে নিয়ে সচেতনতনা কর্মসূচি হয়। কাকদ্বীপ মহকুমা শাসক শুভঙ্কর ভট্টাচার্যের উদ্যোগে আয়োজিত অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সাগরের বিডিও অনন্ত কুমার গোস্বামী, সাগর থানার ওসি অর্পণ নায়েক, ব্লক স্বাস্থ্য আধিকারিক তন্ময় ঘোষ, স্কুলের প্রধান শিক্ষক জয়দেব দাস-সহ বিভিন্ন দফতরের আধিকারিকেরা। বাল্যবিবাহের কুফল, কম বয়সে মাতৃত্বের ঝুঁকি এবং এর আইনি পরিণতি নিয়ে সচেতন করা হয়। কোনও নাবালিকার বিয়ে ঠিক হওয়ার খবর পেলে তা প্রশাসনের নজরে আনার কথাও বলা হয়।
বিডিও বলেন, “বাল্যবিবাহ রুখতে প্রশাসনের পাশাপাশি পরিবার, স্কুল এবং স্থানীয় বাসিন্দাদেরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। আগাম খবর পাওয়া গেলে বিয়ে হওয়ার আগেই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করা সম্ভব।” প্রধান শিক্ষকের কথায়, “মেয়েদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরি করাও স্কুলের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।”
কুলতলির পশ্চিম গাবতলা এলাকায় এ দিন সচেতনতা শিবির করে স্থানীয় থানার পুলিশ। এলাকার বহু মহিলা উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের বাল্য বিবাহের কুফল বোঝানো হয়।
সরকারের নির্দেশে মিশ্র প্রতিক্রিয়া মিলেছে পুরোহিত-কাজিদের কাছ থেকে। ক্যানিংয়ের এক পুরোহিত নিতাই চক্রবর্তী বলেন, “এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই। এবার থেকে বিয়ের মন্ত্র পোড়ানোর কাজ এলেই ছেলে মেয়ের জন্ম পঞ্জি দেখে তবেই বিয়ে দেব।” এলাকার এক কাজী মহম্মদ মোবারক বলেন, “তথ্য যাচাই করার কাজ কি আমাদের, পুলিশ এই কাজ করুক। কেউ তো আমাদের ভুয়ো সার্টিফিকেটও দেখাতে পারে, তা না বুঝতে পেরে বিয়ে দিলেও কি আমাদের সাজা হবে?”
এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা। ক্যানিং মহকুমা হাসপাতালের স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ সুতর্ষি মণ্ডল বলেন, “নাবালিকারা সন্তান প্রসবের জন্য এলে অনেক সময়ই নানা ধরনের শারীরিক জটিলতা লক্ষ্য করা যায়। অনেক সময় প্রাণহানির সম্ভবনাও থাকে। সেই কারণে সরকারের এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই।”