নথি প্রকাশ্যে কী ভাবে? প্রশ্ন তুলেছিল কালীঘাটপন্থী তৃণমূল। শুধু প্রশ্ন তোলা নয়। নথি প্রকাশ্যে আসার মূলে এসএসকেএম— এই ধারণাকে অগ্রাধিকার দিয়ে পাঠানো হল আইনি নোটিসও। জবাবে, নথির সন্ধানস্থল নবান্নের চোদ্দো তলায় মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ড্রয়ারই কি না, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর প্রতিক্রিয়ায় তৈরি হয়েছে সেই জল্পনা।
প্রাক্তন বনাম বর্তমানের দ্বৈরথে আইনি নোটিসের সম্মুখীন হয়েছিলেন এসএসকেএম কর্তৃপক্ষ। এক জন রোগীর চিকিৎসা সংক্রান্ত নথি কী ভাবে প্রকাশ্যে এল সেই প্রশ্নে সোমবার সকালে ই-মেল মারফত এসএসকেএম কর্তৃপক্ষকে আইনি চিঠি পাঠান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আইনজীবী অর্ক নাগ। অভিযোগ করেছিলেন, এ ভাবে কোনও সরকারি সংস্থা ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস করতে পারে না। সোমবার সকালে আইনজীবী মারফত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাঠানো নোটিসে তিরের মুখে ছিলেন এসএসকেএম কর্তৃপক্ষ।
সোমবার বিকেলে সেই তিরেরই অভিমুখ ঘুরিয়ে নবান্নে বসে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেন, ‘‘কাগজ এসএসকেএমে ছিল না। কাগজ এসএসকেএমে থাকার কথা নয়। কোথা থেকে কাগজ পেয়েছি প্রয়োজনে আমি বলে দেব। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হয়তো জানেন না, উনি কেস করেছিলেন! উনি নিজেই বিজেপির প্রলয় পালের নেতৃত্বে ‘পা ভেঙে দেওয়া হয়েছে’ বলে মামলা করেছিলেন। ওই মামলা সিআইডি’র কাছে গিয়েছিল। তার পর কোত্থেকে কাগজ পেয়েছি আমি বলে দেব।’’
এর পরেই মুখ্যমন্ত্রীর ইঙ্গিতপূর্ণ সংযোজন, ‘‘উনি ভেবেছিলেন জিতে চতুর্থ বার এখানে মুখ্যমন্ত্রী হয়ে আসবেন। উনি অনেক কাগজ নিজের ড্রয়ারে রেখে গিয়েছিলেন।’’ সেই ড্রয়ারেই কি তা হলে ওই নথি ছিল? মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‘আমি এখনই তা বলছি না, প্রয়োজন হলে বলব। আমি শুধু বলছি, উনি ভেবেছিলেন চতুর্থ বার মুখ্যমন্ত্রী হবেন। অনেক কাগজ উনি বার করে নিয়ে যাননি। ওঁর ড্রয়ারেই অনেক কাগজ ছিল।’’
২০২১ সালের ১০ মার্চ নন্দীগ্রামে বিধানসভা ভোটের প্রচারে আহত হয়েছিলেন প্রার্থী মমতা। তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী অভিযোগ করেছিলেন, বিরুলিয়া বাজারে তিনি গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে একটি মন্দিরে প্রণাম করার সময় চার-পাঁচ জন এসে তাঁকে গাড়ির দরজা দিয়ে চেপ্টে দেওয়ায় পায়ে চোট পেয়েছেন তিনি। নন্দীগ্রাম থেকে মমতাকে এসএসকেএমে আনিয়ে উডবার্ন ওয়ার্ডের সাড়ে ১২ নম্বর কেবিনে ভর্তি করানো হয়েছিল। সেই সময়ের চিকিৎসা সংক্রান্ত নথি বিতর্কের জলই গড়িয়েছে আইনি নোটিসে। যার সূত্রপাত হয় গত শনিবার।
গত শুক্রবার নন্দীগ্রামে ভোটের প্রচারে গিয়ে মমতার পা-ভাঙা নিয়ে মন্তব্য করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। বলেছিলেন, তাঁর কাছে নথি আছে। পরের দিন সেই নথি দেখান মুখ্যমন্ত্রী। মঙ্গলবার নন্দীগ্রাম বিধানসভার উপনির্বাচন। তার ৭২ ঘণ্টা আগে শনিবার মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী উডবার্ন ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন থাকাকালীন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের চিকিৎসা সংক্রান্ত নথি দেখিয়ে অভিযোগ করেন, ২০২১ সালে নন্দীগ্রামে গিয়ে পা ভাঙা নিয়ে ‘মিথ্যা দাবি’ করেছিলেন তৃণমূলনেত্রী! একই সঙ্গে তিনি ঘোষণা করেন, ‘মিথ্যা প্রচারে’র জন্য তদন্তও শুরু করা হবে। উপনির্বাচন মিটলেই এ সংক্রান্ত পদক্ষেপের কথা জানানো হবে।
নন্দীগ্রামে ভোটপ্রচার শুরুর ঠিক আগে শনিবারই এক জন রোগীর চিকিৎসা সংক্রান্ত নথি কী ভাবে প্রকাশ্যে আনা হল, সেই প্রশ্নে সমাজমাধ্যমে সরব হয়েছিলেন কালীঘাটপন্থী তৃণমূলের বিধায়ক কুণাল ঘোষ। এর পর এ দিন সকালে এসএসকেএমের অধিকর্তা মণিময় বন্দ্যোপাধ্যায়, এমএসভিপি পীযূষ রায় এবং স্নায়ুরোগ বিভাগের প্রধান অতনু বিশ্বাসকে আইনি চিঠি পাঠান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আইনজীবী অর্ক নাগ। সেই চিঠিতে এসএসকেএম কর্তৃপক্ষ প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর চিকিৎসা সংক্রান্ত নথি বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পাঠিয়েছেন কি না তা জানতে চাওয়া হয়েছে। নথি পাঠানো হলে আইনানুগ পদ্ধতি মানা হয়েছিল কি?
এসএসকেএম কর্তৃপক্ষকে নোটিস পাঠানোর কারণ প্রসঙ্গে মমতার আইনজীবী বলেন, ‘‘আমাদের বক্তব্য খুব স্পষ্ট, একজন ব্যক্তির মেডিক্যাল রেকর্ড মুখ্যমন্ত্রীর এক্তিয়ার বহির্ভূত যদি না তিনি তা আইনের মাধ্যমে পেয়ে থাকেন। আইনের মাধ্যমে হয়েছে বলে আমাদের জানা নেই। মুখ্যমন্ত্রী নিজের পদাধিকার বলে সরকারি হাসপাতালে থাকা কোনও মেডিক্যাল রেকর্ড বার করে, সেই মেডিক্যাল রেকর্ডের পছন্দমতো দু’টো পাতা দেখিয়ে সিআইডি তদন্তের কথা বলতেই পারেন, তবে সেটা আইনবহির্ভূত। কী ক্ষমতাবলে তিনি কাগজগুলো আনালেন?’’
যার প্রেক্ষিতে নবান্নের সাংবাদিক বৈঠক থেকে আইনি নোটিসের ভিত্তি নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন শুভেন্দু। সেই সূত্রেই মমতার আইনজীবীর উদ্দেশে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‘আপনাদের মাধ্যমে ওঁর আইনজীবীকে বলছি, ঘাঁটাঘাটি একটু কম করুন। বেশি ঘাঁটাঘাটি করতে না বলুন। এক্স-রে প্লেট, এমআরআই যদি দেখাতে শুরু করি বাড়ি থেকে বেরোতে পারবেন না!’’