আনাজ ব্যবসায়ী বৈদ্যুতিন দাঁড়িপাল্লায় কুমড়ো ওজন করতে করতে বলছেন, “এক কেজির দাম ৪০ টাকা। আড়াই’শো কুমড়োর দাম তা হলে কত হবে?”
দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে প্রাথমিক স্কুলের কয়েক জন ছাত্রছাত্রী। পাশে শিক্ষকেরা। এক শিক্ষক বললেন, “এক কেজি মানে এক হাজার গ্রাম। তা হলে আড়াই’শো গ্রামের কত দাম হবে?” এক ছাত্রের প্রশ্ন, “স্যর, ‘শো’ বলতে কী বোঝানো হচ্ছে।” কেজি-গ্রামের সম্পর্ক বুঝতেই কুমড়োর দাম মিটিয়ে দেয় ছাত্রছাত্রীরা। শুধু কুমড়ো নয়, এ ভাবেই শিক্ষকদের সঙ্গে আলু, পটল, বাঁধাকপি, ধনেপাতা, লঙ্কা কিনেছে ছাত্রছাত্রীরা। মুদির দোকান থেকে কিনেছে নুন, ধনেগুঁড়ো, জিরেগুঁড়ো, লঙ্কা, হলুদগুঁড়ো, সর্ষের তেলও।
স্কুলের পাঠ্য পুস্তকে ওজন ও দাম নিয়ে নানা অঙ্ক থাকে। খাতায়-কলমে সে অঙ্ক কষতে পারলেও বাস্তবে দোকানে গিয়ে কেনার সময়ে হাবুডুবু খায় পড়ুয়ারা। খণ্ডঘোষের গোপালবেড়া পঞ্চায়েতের ইন্দুটি প্রাথমিক স্কুলের অভিভাবকদের একাংশ একটি বৈঠকে দাবি করেছিলেন, অল্প শিক্ষিত এক জন আনাজ বা মুদি ব্যবসায়ী যে ভাবে চটপট হিসাব করেন, তাঁদের বাড়ির ছেলেরা খাতায়-কলমে সেই হিসাব করতে পারলেও মুখেমুখে তা পারছে না। দোকানির ভাষা তারা বুঝতে পারছে না। এর পরেই স্কুল কর্তৃপক্ষ ঠিক করেন, ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে তাঁরা বাজারে যাবেন। তা হলে তারা হাতেকলমে হিসাব বুঝতে পারবে। মুখেমুখে হিসাব শিখতে পারবে। আনাজ-মশলা সম্পর্কেও সম্যক জ্ঞান হবে। সেই মতো সম্প্রতি ইন্দুটি গ্রামের চতুর্থ শ্রেণির ১২ জন পড়ুয়াকে টোটোয় চাপিয়ে রায়নার মিরেপোতা বাজারে নিয়ে যান প্রধান শিক্ষক শুভেন্দু ঘোষাল ও সহ-শিক্ষক সৌমিক মণ্ডল। প্রধান শিক্ষক বলেন, “দোকানিরা যে ভাষায় কথা বলেন, সেই ভাষা বুঝতে পড়ুয়াদের অসুবিধা হচ্ছে। দোকানিরাও খুব সুন্দর করে পড়ুয়াদের বুঝিয়ে দিয়েছেন।” পড়ুয়ারাই আলু-পটল, মশলা-তেল কেনায় কেজি-গ্রামের সম্পর্ক কী, তা কিছুটা আন্দাজ করতে পেরেছে। কী ভাবে দাম করতে হয়, কী ভাবে দাম মেটাতে হয়, সে সব জেনেছে তারা। ওজন সম্পর্কেও ধারণা হয়েছে। ওই পড়ুয়াদের মধ্যে শ্রেয়ষী দাস, সৈকত মালিক, শেখ তানভির, অদ্রিকা দাসরা বলে, “কী ভাবে বাজার করতে হয় তা শিখলাম। দোকানদার কী ভাবে কথা বলেন, সেটা কিছুটা বুঝলাম। অঙ্ক বইতে যে সব পরিমাণ, একক লেখা থাকে, সেগুলো নিজের চোখে দেখলাম। বড় হয়ে গিয়েছিমনে হচ্ছে।”
সৌমিক বলেন, “ওই আনাজ-মুদি দ্রব্য আমরা মিডডে মিলে ব্যবহার করব। নিজেদের কেনা আনাজের রান্না দেখে ছাত্রছাত্রীরাও খুশি হবে।” প্রধান শিক্ষক বলেন, “পুঁথিগত শিক্ষার বাইরে ব্যবহারিক শিক্ষার মাধ্যমে শেখার অভ্যাস গড়ে তুলতে চাইছি। চতুর্থ শ্রেণির পড়ুয়াদের দিয়ে এই উদ্যোগ শুরু হল। আগামী দিনে নিচু ক্লাসের পড়ুয়াদেরও বাজারে নিয়ে গিয়ে শিক্ষা দেওয়া হবে।”
খণ্ডঘোষ ১ নম্বর চক্রের স্কুল পরিদর্শক কাহিম শেখ বলেন, “বিষয়টি আমার কানে এসেছে। খুবই ভাল উদ্যোগ। এতে পড়ুয়াদেরউৎসাহ বাড়বে।”