দুয়ারে দুর্গাপুজো। আর মাস দুয়েকের মধ্যেই শুরু হবে আলু চাষের প্রস্তুতি। এই সময়ে মজুত আলু বিক্রি করে পুজো ও পরবর্তী চাষের খরচ তোলেন চাষিরা। চাষিদের দাবি, এ বার মজুত আলুর দর যে স্তরে নেমেছে, তাতে লাভ তো দূরের কথা, আলু বিক্রি করলে কোনও রকমে চাষের খরচের অর্ধেক উঠছে।
হিমঘরে মজুত জ্যোতি আলুর বস্তা পিছু বন্ডের দর শনিবার কোথাও ছিল ১৩০ টাকা, কোথাও ১৩৫ টাকা। হিমঘর থেকে বার করা বাছাই আলুর বস্তা বিক্রি হয়েছে ৩৭০ টাকা দরে। ছোট আলু (ক্যাট) বিক্রি হয়েছে ৭০ টাকা প্রতি বস্তায়। চাষিদের দাবি, গত মরসুমে কেজি প্রতি আলু ফলাতে খরচ হয়েছে ৩ টাকা ৫০ পয়সার বেশি। চড়া দামে বস্তা কেনা ও হিমঘর পাঠাতে বস্তা পিছু খরচ হয়েছিল প্রায় ৬০ টাকা। বন্ডের যা বর্তমান দর, তাতে এখন আলু বিক্রি করে কেজি প্রতি দেড় টাকারও কম অর্থ মিলছে।
কালনার আলু চাষি হেমন্ত মিত্র বলেন, ‘‘আলু তোলার সময়ে বস্তা পিছু দর ছিল ২৫০ টাকার আশপাশে। তখন ক্রেতা তেমন ছিলেন না। লাভ না মেলায় হিমঘরে আলু মজুত রেখেছিলাম। আশা ছিল দর বাড়বে, কিন্তু বাড়ল না। আলু বিক্রি করলে বিপুল লোকসান হচ্ছে। সামনেই পুজো। ছেলেমেয়েদের পোশাক-সহ বেশ কিছু খরচ রয়েছে। আলু চাষে ভরাডুবি হবে ভাবিনি।’’ আর এক চাষি সুখেন সাঁতরার কথায়, ‘‘মজুত আলু কিছুটা রেখে দিই। তাতে চলতি মরসুমের চাষের কিছু অর্থ ওঠে। এ বার তা হবে না। কী ভাবে চাষ করব, তা নিয়ে দুশ্চিন্তা কাটছে না। সরকার যদি কিছু করে চাষিরা বাঁচবেন। না হলে বহু চাষিকে ঋণের জালে জড়িয়ে যেতে হবে।’’
গত মরসুমে আবহাওয়া ভাল থাকায় আলুর ফলন ভাল হয়। প্রগতিশীল আলু ব্যবসায়ী সমিতির হিসাব, রাজ্যের হিমঘরগুলিতে মজুত হয়েছিল ১৬ কোটি ১ লক্ষ ৮ হাজার ২৭৮ বস্তা আলু। আলু ব্যবসায়ীদের দাবি, এত বিপুল পরিমাণ আলু আগে কখনও হিমঘরে মজুত হয়নি। সাধারণত অগস্টের মধ্যে মজুত আলুর ৫০ শতাংশ হিমঘর থেকে বেরিয়ে গেলে আলুর দর ভাল হয়। এ বার অগস্ট পর্যন্ত আলু বেরিয়েছে মাত্র ৩৯.৮৭ শতাংশ। শতাংশের বিচারে হিমঘর থেকে আলু বেরোনোর হার হুগলিতে ৪৩.৪, দুই মেদিনীপুরে ৪২.৬৭, বাঁকুড়ায় ৩৭.৫৩, বর্ধমানে ৪২.৮০, বীরভূমে ৩৮, মুর্শিদাবাদে ৩৫.৯৩, হাওড়ায় ৩২.৫৩ এবং উত্তরবঙ্গে ৩১.৫০।
সম্প্রতি আলু ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করেন কৃষি বিপণন মন্ত্রী দিলীপ ঘোষ। ব্যবসায়ীরা ভিন্ রাজ্যে আলু নিয়ে যাওয়ার পরিবহণের খরচে ও হিমঘর ভাড়ায় ভর্তুকি-সহ একাধিক দাবি জানান। কিন্তু এ বিষয়ে সরকারের থেকে ইতিবাচক বার্তা আসেনি, দাবি আলু ব্যবসায়ী সমিতির এক রাজ্য কমিটির সদস্যের। তাঁর কথায়, ‘‘পরিবহণ খরচে ভর্তুকি দিয়ে বাইরের রাজ্যে যতটা সম্ভব আলু পাঠানো নিয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। কোন জায়গা থেকে কোন রাজ্যে কত আলু যায়, সরকারকে জানিয়েছি। বলা হয়েছিল ফের একটি বৈঠক হবে। এখনও তা হয়নি।’’ একাধিক আলু ব্যবসায়ীর দাবি, ‘‘আগেও বাইরের রাজ্যে আলুর পরিবহণে ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে। তবে তাতে লাভ হয়েছে অল্প কিছু ব্যবসায়ীর। ফের তা করা হলেও তাতে চাষি এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের লাভ হবে না।’’ প্রগতিশীল আলু ব্যবসায়ী সমিতির রাজ্য সভাপতি জগবন্ধু মণ্ডল বলেন, ‘‘আলুর পরিস্থিতির কথা সরকারের নজরে এনেছি। আশা করছি, সরকার সদর্থক পদক্ষেপ করবে।’’