প্রতি বছর বর্ষায় গাড়ুই নদী উপচে ভাসে আসানসোল শহরের একাংশ। এই নদী সংস্কারের দাবি দীর্ঘদিনের। এ বার বর্ষার শুরুতে নদী সংস্কার হয়নি। তাই ভারী বৃষ্টিতে কী হবে, সে নিয়ে আশঙ্কায় শহরবাসী। গাড়ুই সংস্কার কবে, পুরসভার কোন আমলে হয়েছিল, সে নিয়ে রাজনৈতিক চাপান-উতোর তৈরি হয়েছে। রাজ্যের পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী তথা আসানসোল দক্ষিণের বিজেপি বিধায়ক অগ্নিমিত্রা পাল জানান, এখনই গাড়ুই নিয়ে পরিকল্পনা নেই। প্রয়োজনে সমীক্ষা করা হবে।
বারাবনি বিধানসভা কেন্দ্রে ডাবর গ্রামের দক্ষিণ দিক থেকে নিচু জায়গার জল সঙ্কীর্ণ প্রাকৃতিক জলধারা হিসাবে দক্ষিণ দিকে গড়িয়ে গিয়ে গাড়ুই নদী সৃষ্টি করেছে। এর পরে সীতারামপুরের কাছে এসে পূর্ব দিকে বাঁক নিয়ে আসানসোল পুরসভা এলাকায় প্রবেশ করেছে এই জলধারা। গোপালনগর বা ঘাগরবুড়ি মন্দিরের কাছে তার সঙ্গে মিলিত হয়েছে নুনিয়া নদী। ডাবর গ্রামেরই পূর্ব দিকের নিচু জমি থেকে প্রাকৃতিক জলধারা হিসাবে নুনিয়া নদী প্রথমে পূর্ব দিকে এবং তার পরে দক্ষিণে এসে গাড়ুইকে সঙ্গে নিয়ে রানিগঞ্জের নারায়ণকুড়িতে দামোদরের সঙ্গে মিশছে।
আসানসোল শহরে, বিশেষ করে কুরেশি মহল্লা থেকে ধাদকা রোড পর্যন্ত প্রায় দেড় কিলোমিটার গাড়ুই নদীর দু’পাড়ের জমি দখল করে বাসস্থান থেকে কারখানা তৈরি হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ওকে রোড থেকে এক দিকে কংক্রিটের পাড় তৈরি করা হয়েছে। অন্য দিকে তা না হওয়ায়, বৃষ্টিতে জল বাড়লে হাজি কদম রসুল উচ্চ বিদ্যালয়ের এক তলায় জল ঢুকে যায়। রাস্তা চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। রেলপাড়ের সমস্ত নর্দমা গাড়ুই নদীতে মিশেছে। নর্দমা থেকে নদীতে ব্যাগ তৈরি কারখানার পরিত্যক্ত বর্জ্য, স্থানীয় বাসিন্দারা নানা আবর্জনা ফেলেন বলে অভিযোগ। এ ছাড়া, আসানসোল শহরের বিভিন্ন এলাকার জল চারটি বড় চ্যানেলের মাধ্যমে গাড়ুই নদীতে মেশে।
২০২১ সালে প্রবল বর্ষণে গাড়ুই নদী উপচে রেলপাড় এলাকার সঙ্গে শহরের দু’টি এই রকম বড় চ্যানেল লাগোয়া এলাকার একাংশেরও বড় ক্ষতি হয়েছিল। রেলপাড়-সহ উত্তর আসানসোলের অংশ দক্ষিণ আসানসোল থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এর পরে ২০২৪ সালে কল্যাণপুরে জলমগ্ন নিচু সেতু পেরোতে গিয়ে গাড়ি-সহ জলে তলিয়ে গিয়ে মৃত্যু হয় এক ব্যক্তির।
ভূগোলের শিক্ষক সুরজিৎ ভট্টাচার্য জানান, আসানসোল শহরে ঢোকার আগে গাড়ুই নদীতে সালানপুর এবং বারাবনি ব্লক এলাকার একশোর বেশি গ্রামের নিকাশির জল মিশছে। জলবিভাজিকা উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে এই জল গ্রামেই সংরক্ষণ করা দরকার। আসানসোল শহরে গাড়ুই নদীর দু’পাড়ে প্রচুর বাড়ি ও বহুতল তৈরি হয়েছে। নদীর দু’পাড় দখল হওয়ায়, সঙ্কীর্ণ হয়ে গিয়েছে প্রবাহপথ। নদীর নাব্যতা বাড়ানোর ব্যবস্থা করা দরকার। প্রয়োজনে জবরদখল ভাঙতে হবে, না হলে বার বার শুধু আবর্জনা সরিয়ে কোনও লাভ হবে না, মনে করছেন তিনি। একই সঙ্গে, শহরের চারটি বড় ‘স্টর্ম ওয়াটার চ্যানেল’-এর নাব্যতাও বাড়ানো দরকার বলে দাবি তাঁর।
আসানসোল পুরসভার প্রাক্তন মেয়র তথা পাণ্ডবেশ্বরের বিধায়ক জিতেন্দ্র তিওয়ারি জানান, গাড়ুই নদী সংস্কার করতে গেলে গোড়া থেকে শেষ থেকে পর্যন্ত করতে হবে। শুধু কল্যাণপুর থেকে রেলপাড় এলাকায় আবর্জনা বা পলি সরিয়ে দিলে হবে না। সিপিএমের রাজ্য কমিটির সদস্য পার্থ মুখোপাধ্যায়ের দাবি, ২০০৯ সালের আগে তাঁদের দলের পুরবোর্ডের আমলে শেষ বার গাড়ুই নদী সংস্কার করা হয়েছিল। নদী বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়েই গাড়ুই নদী সংস্কার করা দরকার, জানান তিনি।
আসানসোল পুরসভার কংগ্রেসের প্রাক্তন কাউন্সিলর এসএম মোস্তফার যদিও দাবি, ২০২৫ সালেও গাড়ুই নদী সংস্কার হয়েছে। প্রতি বছর এই কাজ করা দরকার। প্রাক্তন ডেপুটি মেয়র ওয়াসিমুল হকেরও দাবি, তাঁরা প্রতি বছরই নিজেরা দাঁড়িয়ে থেকে নদী সংস্কার করিয়েছেন। পুরসভার বোর্ড ভেঙে দেওয়ায়, এ বার কী ভাবে তা হবে, তা তাঁদের জানা নেই।
রাজ্যের পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রার দাবি, গাড়ুই সংস্কারের জন্য গত পুরবোর্ডকে অনেক টাকা দেওয়া হয়েছিল। তাই এখনই গাড়ুই নিয়ে কোনও পরিকল্পনা নেই। প্রয়োজনে সমীক্ষা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, জানান তিনি।