প্রায় দু’দশক আগে একটি বাড়ির ভিত খোঁড়ার সময়ে দুর্গাপুরের সিটি সেন্টারের অম্বুজা টাউনশিপে খোঁজ মিলেছিল প্রাচীন সুড়ঙ্গের। বছর সাতেক আগে সেখানে পার্ক গড়ে তোলে দুর্গাপুর পুরসভা। অভিযোগ, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সেই পার্ক মাঝে মাঝেই ঝোপঝাড়ে ঢেকে যায়। অবিলম্বে ওই পার্কের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের দাবি তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। পুরসভার তরফে জানানো হয়েছে, ইতিমধ্যে পরিষ্কার করার কাজ শুরু হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, অম্বুজা টাউনশিপের বিশাল জলাশয় ও কালীবাড়ি লাগোয়া একটি ফাঁকা জায়গায় ২০০৭ সালে বাড়ি তৈরি করার জন্য ভিত খুঁড়তে শুরু করেন জায়গাটির মালিক। ফুট দুয়েক খুঁড়তেই বেরিয়ে আসে একটি সুড়ঙ্গ। পাথরের খিলান দিয়ে উপর-নীচে বাঁধানো সুড়ঙ্গটি উচ্চতায় প্রায় আড়াই ফুট ও চওড়ায় প্রায় দুই ফুট। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের আধিকারিকেরা সুড়ঙ্গটি ঘুরে দেখেন। তাঁরা জানান, মধ্যযুগে নির্মিত ওই সুড়ঙ্গটির স্থাপত্যে রোমান শৈলীর মিশ্রণ রয়েছে।
পুরসভার ‘হেরিটেজ কনজ়ারভেশন কমিটি’র তরফে পরে একটি বোর্ড দিয়ে উল্লেখ করা হয়, ‘আগাগোড়া চুন, বালি, সুরকির মিশ্রণে গাঁথা নানা আকারের বেলেপাথরের খণ্ডে খিলান-সহ তৈরি এই সুড়ঙ্গটির নির্মাণকাল মুঘল শাসনের শেষ দিক (সতেরো শতক)। রাজ্য প্রত্নতত্ত্ব দফতরের অভিমত, উত্তর দক্ষিণে দীর্ঘ এই সুড়ঙ্গটি জলাশয়ে জল সরবরাহ বা অতিরিক্ত জল নির্গমনের কাজেও যে এটি বহুল ব্যবহৃত হত, তা নিঃসন্দেহ। তবে এই সুড়ঙ্গটি পলায়নের গোপন পথ রূপেও ব্যবহৃত হত। রোমক স্থাপত্য রীতিতে প্রভাবিত অন্ত্যমধ্যযুগীয় এই স্থাপত্যটি দুর্গাপুর শিল্পনগরীর বিস্মৃত সময়কালের এক গুরুত্বপূর্ণ প্রত্ননিদর্শন।’
পাশের জলাশয়ে শীতে পরিযায়ী পাখিরা ভিড় করে। তা ছাড়া, পাশেই রয়েছে বটগাছের ছায়ায় থাকা প্রাচীন কালীমন্দির। যদিও পাথরের তৈরি পুরনো মন্দির বটগাছের গুঁড়িতে ঢাকা পড়ে গিয়েছে। প্রতি সন্ধ্যায় পুজোর সময়ে উচ্চারিত হয় ‘বন্দে মাতরম জয় জয় ভারতবর্ষম’ মন্ত্র। প্রবীণদের অনেকে জানান, অতীতে জঙ্গলের ভিতরে ছিল এই মন্দির। ব্রিটিশ আমলে এখানে আশ্রয় নিতেন বিপ্লবীরা। মন্দিরের বিগ্রহকে ‘ভারতমাতা’ রূপে পুজো করে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যেতেন। তাই এখানে পুজোর মূল মন্ত্র ‘বন্দে মাতরম, জয় জয় ভারতবর্ষম, ঐক্যম শরণং গচ্ছামি, সত্যম শরণং গচ্ছামি..।’
এমন জায়গায় সুড়ঙ্গের খোঁজ মেলায় আকর্ষণ বেড়ে যায় এলাকার। পুরসভা ‘অম্রুত’ প্রকল্পে সুড়ঙ্গকে কেন্দ্র করে পার্ক গড়ার পরিকল্পনা করে। রেলিং তৈরি করে, আলো লাগিয়ে, ছোটদের খেলার জন্য নানা ব্যবস্থা করা হয়। ২০১৯-এর ১২ জুন ‘অম্বুজা কালীবাড়ি উদ্যান’ উদ্বোধন করেন তৎকালীন মেয়র দিলীপ অগস্তি।
অভিযোগ, পার্ক নির্মাণের পরে সে ভাবে নিয়মিত নজরদারি কখনও ছিল না। মাঝে মাঝেই আগাছায় ভরে যায় পার্ক। এ বার বর্ষাতেও একই হাল হয়। দেখে বোঝার উপায় ছিল না, এখানে একটি পুরাকীর্তি রয়েছে। তবে পুরসভা সূত্রে জানা গিয়েছে, ইতিমধ্যে পার্ক চত্বর সাফ করার কাজ শুরু হয়েছে। অনেকটা কাজ হয়ে গিয়েছে। বাকিটাও দ্রুত করে ফেলা হবে।