স্নাতক স্তরে প্রত্যেক বছর বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন কলেজে বড় সংখ্যক আসন ফাঁকা পড়ে থাকে। এ বারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, চলতি শিক্ষাবর্ষে স্নাতকোত্তর স্তরেও আসন ফাঁকা পড়ে রয়েছে। যে সব কলেজে স্নাতকোত্তর পড়ানো হয়, সেখানেও একই ছবি দেখা গিয়েছে।
স্নাতকোত্তর স্তরে ফের ভর্তির জন্য বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় আবেদনপত্র নেওয়া শুরু করেছে। বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতকোত্তর স্তরের পড়ুয়া পাচ্ছে না, এই ছবি স্বাভাবিক নয় বলেই মত প্রাক্তন উপাচার্য থেকে শুরু করে শিক্ষানুরাগীদের। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দাবি, জাতীয় শিক্ষানীতির (এনইপি) জন্য প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর স্তরে আসন ফাঁকা রয়েছে। পরের বছর থেকে আসন ফাঁকা থাকবে না। তবে শিক্ষা মহলের একাংশের দাবি, স্কুল সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে শিক্ষকতার চাকরি পাওয়া নিয়ে সংশয় থাকায় স্নাতকোত্তরে পড়ায় পড়ুয়াদের মধ্যে অনীহা তৈরি হচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ৪০টি বিষয় স্নাতকোত্তর স্তরে পড়ানো হয়। মোট ২৬৩০টি আসনের মধ্যে প্রথম দফায় মাত্র ৮৭০ জন ছাত্রছাত্রী স্নাতকোত্তর স্তরে ভর্তি হয়েছেন। ইউজিসির নিয়ম মেনে অগস্ট থেকেই স্নাতকোত্তর স্তরে ক্লাস শুরু করে দিতে হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়কে। কিন্তু সব আসন পূরণ না হওয়ায় ভর্তির জন্যে ফের বিজ্ঞাপন দিতে হয়েছে। কিন্তু সেখানেও সন্তোষজনক ফল মিলছে না বলেই কর্তৃপক্ষের দাবি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের একাংশের দাবি, রাজ্যে কর্মসংস্থানের হাল খারাপ। সে কারণে স্নাতকস্তরেই কলেজগুলিতে আসন ফাঁকা থাকছিল। বিশ্ববিদ্যালয়েও তার ধাক্কা লাগছিল। এ বার জাতীয় শিক্ষা নীতির জন্য স্নাতকোত্তর স্তরে প্রথম বর্ষে ভর্তির জন্য ছাত্রছাত্রী মিলছে না।
বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির নেতা, অর্থনীতির শিক্ষক ভাস্কর গোস্বামী বলেন, “জাতীয় শিক্ষানীতির জন্যই স্নাতকোত্তর স্তরে ভর্তির জন্য ছাত্রছাত্রীদের আগ্রহ কম। সে কারণেই বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর স্তরে আসন ফাঁকা থাকছে।” বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের একাংশের দাবি, জাতীয় স্তরে যতগুলি মূল্যায়ন হয়েছে, তাতে বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় তার গরিমা হারিয়েছে। চলতি শিক্ষাবর্ষে তা ফিরিয়ে আনার সুযোগ ছিল। কিন্তু ছাত্রভর্তিই যদি না হয়, তা হলে কী আর গরিমা ফিরবে? রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সঙ্ঘের শিক্ষক সংগঠনের অন্যতম রাজীবলোচন মহাপাত্রের দাবি, “জাতীয় শিক্ষানীতিতে স্নাতক স্তরের শেষ বছরের কোর্স স্নাতক স্তরের প্রথম বছরের মতো। ৭৫% নম্বর পেয়ে যে সব ছাত্রছাত্রী চতুর্থ বর্ষে এসে ওই কোর্স করার সুযোগ পাচ্ছেন, তাঁরা কলেজেই ভর্তি হয়ে যাচ্ছেন।”
বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যক্ষদের সংগঠনের সম্পাদক, মানকর কলেজের সুকান্ত ভট্টাচার্যও বলেন, “জাতীয় শিক্ষানীতিতে অনার্স চার বছরের। সিমেস্টার পদ্ধতিতে শেষ দু’টি পর্যায়ে (সপ্তম ও অষ্টম সিমেস্টার) স্নাতকোত্তর স্তরের প্রথম বছরের বিষয়গুলি পড়ানো হচ্ছে। ওই ছাত্রছাত্রীরাই কলেজ থেকে সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর স্তরে দ্বিতীয় বছরে পড়ার সুযোগ পাবেন।” কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা মনে করছেন, এ বছরটি জাতীয় শিক্ষানীতির ক্ষেত্রে ‘অন্তর্বতী সময়’। পরের বছর থেকে ভর্তি স্বাভাবিক হবে। যদিও ছাত্রমহল আসন ফাঁকা থাকার নেপথ্যে জাতীয় শিক্ষানীতির পাশাপাশি, কর্মসংস্থান, বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশে বেনিয়ম, পর্যাপ্ত শিক্ষকের অভাবকেও দায়ী করেছে।
এসএফআইয়ের জেলা সম্পাদক উষসী রায়চৌধুরী মনে করেন, “স্নাতকোত্তর ও স্নাতক, উভয় স্তরেই পরীক্ষা গ্রহণ ও ফলাফল প্রকাশে দুর্নীতি, পরিকাঠামো ও পর্যাপ্ত শিক্ষকের ঘাটতি— এসব কারণে বড় অংশের ছাত্রছাত্রী এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এড়িয়ে যাচ্ছেন।” বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী, এবিভিপির বর্ধমান নগরের যুগ্ম-সম্পাদক অন্বেষা সিংহ বলেন, “ভর্তি প্রক্রিয়া এখনও সম্পূর্ণ হয়নি। তাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো ঠিক নয়। কিন্তু বারবার কেন একাধিক দফায় ভর্তি করাতে হচ্ছে, তা নিয়ে কর্তৃপক্ষের আত্মসমালোচনা প্রয়োজন।” এবিভিপি মনে করে, বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার অভাব, শিক্ষা সংক্রান্ত কাজে দেরি এবং ভর্তি ব্যবস্থার স্বচ্ছতার অভাবের মতো বিষয়গুলি গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার। সাতটি বিভাগে স্থায়ী শিক্ষক নিয়োগের দাবিও তোলা হয়েছে।