সারা বছর দিন কাটে দিনমজুরি করে। কিন্তু দুর্গাপুজোর ক’টা দিন কাজকর্ম দূরে সরিয়ে রেখে নাচ-গানে মেতে ওঠেন আউশগ্রামের জঙ্গলঘেরা বড়চাতরা গ্রামের গোরা সরেন, শঙ্কর হেমব্রম, লখীরাম হেমব্রম, লক্ষ্মণ হেমব্রমেরা। তাঁদের কাছে এই পরবের নাম দাঁশাই। আদিবাসী পুরুষেরা ছদ্মবেশে অস্ত্র হাতে এবং মহিলারা ধামসা, মাদলের তালে দল বেঁধে নাচতে বেরোন এই পরবে।
আউশগ্রামের আদিবাসীদের একাংশের দাবি, প্রাচীন কালে ভারতবর্ষে ‘হুদুড় দুর্গা’ নামে এক রাজা ছিলেন, যিনি লোককথায় মহিষাসুর নামে পরিচিত। এক বিদেশি আর্য নারীর কাছে যুদ্ধে পরাজিত হয়ে তিনি রাজ্যপাট হারান এবং নারীর ছদ্মবেশে জঙ্গলে আশ্রয় নেন। সেই সময় জীবনধারণের জন্য ভিক্ষাবৃত্তি অবলম্বন করেছিলেন তিনি। সেই ঘটনাকে স্মরণ করেই আত্মগোপন করে থাকা হুদুড় দুর্গাকে খুঁজতে দাঁশাই উৎসব পালন করেন আদিবাসীরা।
এই উৎসবে আদিবাসী পুরুষেরা ‘ভুয়ৌং’ নামে শুকনো লম্বা লাউয়ের খোল দিয়ে তৈরি একটি বিশেষ বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করেন। এর ভিতরে তির-ধনুক-সহ নানা অস্ত্র লুকিয়ে রাখা হয়। পুরুষেরা ছদ্মবেশে উৎসবে যোগ দেন। শুরুতে গ্রামের মাঝি থানে ভুয়ৌং, ধামসা, লাগরা-সহ নানা বাদ্যযন্ত্র রেখে বেল ফল ও পাতা দিয়ে হুদুড় দুর্গাকে স্মরণ করে পুজো করা হয়। একে ‘বেলবরণ’ বলে। তার পর গ্রাম ও শহরের বিভিন্ন মণ্ডপে ঘুরে ঘুরে নাচ-গান করে মানুষকে আনন্দ দেন তাঁরা।
উৎসবে যোগদানকারীরা জানান, পুজোর চার-পাঁচ দিন ভোরে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েন তাঁরা। গ্রামের প্রতিটি পরিবার থেকে অন্তত এক জন পুরুষকে দলে থাকতে হয়। এর পর আসানসোল, দুর্গাপুর, পানাগড়, বোলপুর ও বর্ধমানের মতো শহরে গিয়ে মণ্ডপে মণ্ডপে ঘোরেন, নাচ দেখান। পাশাপাশি চলে খাওয়াদাওয়া। বাড়ি ফিরতে অনেক দিন রাত গড়িয়ে যায়। কোনও দিন বাড়ি ফেরা সম্ভব না হলে আত্মীয়ের বাড়িতে দল বেঁধে রাত কাটান তাঁরা।
গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা চুরকো হেমব্রম, জিতু কিস্কু ও লক্ষ্মণ হাঁসদারা বলেন, “বাড়ির বাইরে আমরা যখন নাচতে বেরোব, তখন আমরা যেন ভাল ভাবে, সুস্থ ভাবে থাকি, বেলবরণের সময় সেটা প্রার্থনা করি। নাচ দেখিয়ে এই ক’দিনে যে টাকা উপার্জন হয়, তা দিয়ে বাঁদনা পরবের সময় গ্রামের সকলে মিলে উৎসবে মেতে উঠি।” তাঁদের সংযোজন, “উপার্জনটা বড় কথা নয়, এই সময়ে আমরা খুব আনন্দ করি। সেটাই আমাদের সারা বছরের পরিশ্রম ভুলিয়ে রাখে।”