চোখের সামনে খেলনা গাড়ির মতো একের পর এক যাত্রী বোঝাই বাস, গাড়ি ভেসে যেতে দেখেছেন বর্ধমানের বিধানপল্লির বাসিন্দা, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক কল্যাণকুমার তা ও ব্যবসায়ী বিপ্লব হাজরা (সাহেব)। শনিবার রাতে নেপালের রসুই থেকে বাড়ি ফিরলেও দু’চোখের পাতা এক করতে পারেননি তাঁরা। দুই পর্যটক বলেন, “হড়পা বান আসছে বলে নেপালের পুলিশ রসুউয়ের সেতু আটকে দিয়েছিল। আমাদের বাসটি কোনও মতে পাহাড়ের উপর দিকে উঠে পড়ে। সেখান থেকে দেখি, তিন-চার তলা উঁচু জলরাশি সব ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।”
কলকাতার একটি পর্যটন সংস্থার সঙ্গে কৈলাস ও মান সরোবর ভ্রমণের উদ্দেশে নেপালে গিয়েছিলেন দু’জন। বর্ধমান স্টেশনে ট্রেনে ওঠার সময়ে বর্ধমানের কালীবাজারের বাসিন্দা বিপ্লবের সঙ্গে দেখা হয় কল্যাণের। তাঁরা ২২ অগস্ট কাঠমান্ডু পৌঁছন। কিন্তু চিনের ভিসা আসতে দেরি হওয়ায় দু’দিন নেপালেই থাকতে হয় তাঁদের। ২৫ অগস্ট সন্ধ্যায় ভিসা আসে। ২৬ অগস্ট ভোর সাড়ে ৬টায় তাঁরা রওনা দেন। অবসরপ্রাপ্ত ওই শিক্ষকের দাবি, “ওই রাস্তায় বিদুর পুর-এলাকায় আমাদের বাসটি ১৫-২০ মিনিট দাঁড়িয়েছিল। চা-বিস্কুট খেয়ে ফের রওনা দিয়েছিলাম। রসুই সেতুর কাছে আমাদের পুলিশ আটকে বলল, ‘হড়পা বান আসছে, পালান’। বাসের জানালা দিয়ে দেখলাম, স্কুলের শিশু, অভিভাবক, পুলিশ প্রাণভয়ে ছুটছেন। বাস কোনও রকমে ঘুরিয়ে পাহাড়ে উঁচু জায়গায় তোলেন চালক।’’
কল্যাণের বর্ণনায়, “বাস পাহাড়ে উঠতেই দেখলাম, সাদা মেঘের উপর দিয়ে কালো-বাদামি জলের স্রোত চোখের পলকে সব ভাসিয়ে নিয়ে গেল। সমাজমাধ্যমে ও টিভির পর্দায় যে সেতুটিকে ভেসে যেতে দেখা যাচ্ছে, সেই রসুই সেতুকে চোখের সামনে খড়কুটোর মতো ভেসে যেতে দেখেছি।” বিপ্লব বলেন, “পুরীর সমুদ্রের গর্জন ওই স্রোতের কাছে যেন শিশু। নীচের রাস্তায় যে সব যাত্রী বোঝাই বাস, গাড়ি ছিল, সেগুলি খেলনা গাড়ির মতো যেন উবে গেল। রাস্তার ধারে থাকা দোকানগুলি এক পলকে হারিয়ে গেল। ত্রিশূলী নদী দিয়ে দু’-তিনতলা বাড়ির সমান উঁচু জলরাশি ধোঁয়ার কুণ্ডলীর মতো তীব্র গতিতে ধেয়ে এসে বাড়িঘর, গাড়ি, বড় বড় গাছ— সব ভাসিয়ে নিয়ে গেল। প্রাণ বাঁচাতে উঁচু জায়গার দিকে ছুটে যাওয়া মানুষকে চোখের সামনে জলের তোড়ে ভেসে যেতে দেখেছি।পড়ে ছিল শুধু কাদা আর কাদা। দৃশ্যটা সত্যিই হাড়হিম করার মতো। পাহাড়ে দাঁড়িয়ে কেবল আশঙ্কা হচ্ছিল, কাদাজলের স্রোত আমাদের দিকে ধেয়ে আসবে না তো!’’ সঙ্গে জোড়েন, ‘‘যে সেতুটি পার হয়ে আমাদের এগিয়ে যাওয়ার কথা ছিল, সেটিও নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। চার পাশে শুধুই হাহাকার। সবুজ পাহাড় নিমেষে কালো হয়ে গেল। আশ্রয়ের খোঁজে ছুটছিলেন বহু মানুষ।’’
দু’জনই বলেন, “মৃত্যু কী, তা চোখের সামনে দেখে এলাম। এখনও শিউরে উঠছি। গা-হাত-পা কাঁপছে।” বিপ্লব বলেন, “শোলে সিনেমার সেই দৃশ্যের কথা মনে আসছিল। ঘোড়া ছুটিয়ে গব্বর আসার আগে যেমন হাট ফাঁকা হয়ে যেত, হড়পা বানের কথা শুনে তেমনই লোকজনকে প্রাণহাতে দৌড়তে দেখেছি।” বিপ্লব ও কল্যাণের পরিজনেরা জানান, হড়পা বানের ছবি দেখার পরে তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছিলেন। যোগাযোগ না হওয়ায় উদ্বেগ বাড়ছিল। তাঁরা বাড়ি ফেরায় চিন্তা কেটেছে। দুই পর্যটকের কথায়, “এমন অভিজ্ঞতা যেন কারও না হয়।’’