বর্ধমানের নবাবহাট মোড়ের একটি নার্সিংহোমে অস্ত্রোপচারের পর চার বছরের শিশু অরণ্য রায়ের মৃত্যুর ঘটনায় ‘ভুয়ো’ চিকিৎসক শেখ সায়েদুল হককে অবশেষে গ্রেফতার করল পুলিশ। দিল্লি থেকে তাঁকে বর্ধমানে নিয়ে আসা হয়। বুধবার অভিযুক্তকে বর্ধমান সিজেএম আদালতে হাজির করানো হলে তদন্তের প্রয়োজনে ১০ দিনের পুলিশি হেফাজত চাওয়া হয়। আদালত ধৃতের ছ’দিনের পুলিশি হেফাজত মঞ্জুর করেছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, বর্ধমানের দেওয়ানদিঘি থানার আলমপুরে সায়েদুলের আদি বাড়ি। বর্তমানে বর্ধমান শহরের গোলাপবাগ মোড় এলাকার একটি আবাসনে থাকতেন তিনি। অভিযোগ, শিশুমৃত্যুর ঘটনার পর থেকেই গা-ঢাকা দিয়েছিলেন অভিযুক্ত। বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় তাঁর বিরুদ্ধে লুকআউট নোটিস জারির জন্য পুলিশের তরফে আবেদন জানানো হয়। পরে ব্যুরো অব ইমিগ্রেশন তাঁর বিরুদ্ধে লুকআউট নোটিস জারি করে। পাশাপাশি, অভিযুক্তকে গ্রেফতারের জন্য পরোয়ানা জারির আবেদন জানায় পুলিশ। সেই আবেদন মঞ্জুর করে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে পরোয়ানা জারির নির্দেশ দেয় সিজেএম আদালাত।
মঙ্গলবার দিল্লি বিমানবন্দর থেকে বর্ধমান থানায় ফ্যাক্স করে সায়েদুলকে আটকে রাখার বিষয়টি জানানো হয়। পুলিশ সূত্রের দাবি, দিল্লি থেকে শারজার বিমান ধরার পরিকল্পনা ছিল তাঁর। খবর পেয়েই দিল্লি বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে বর্ধমান পুলিশ। রাতেই দিল্লি বিমানবন্দর থেকে তাঁকে আটক করা হয়। বুধবার অভিযুক্তকে বর্ধমানে নিয়ে আসা হয়। পুলিশের দাবি, জিজ্ঞাসাবাদে সায়েদুল ‘ভুয়ো’ মেডিক্যাল সার্টিফিকেট ব্যবহার করে চিকিৎসা করার কথা স্বীকার করেছেন। আর কোন কোন নার্সিংহোমে তিনি চিকিৎসা করতেন, তা-ও তাঁর কাছ থেকে জানার চেষ্টা করছেন তদন্তকারীরা।
আরও পড়ুন:
ঘটনার সূত্রপাত গত ২ সেপ্টেম্বর। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, পশ্চিম মেদিনীপুরের চন্দ্রকোনা থানার দেউপুরের বাসিন্দা জয়ন্ত রায় তাঁর চার বছরের ছেলে অরণ্যকে ফাইমোসিসের অস্ত্রোপচারের জন্য নবাবহাট মোড়ের ওই নার্সিংহোমে ভর্তি করেন। সে দিনই শিশুটির অস্ত্রোপচার হয়। অস্ত্রোপচারের পরই তার মৃত্যু হয় বলে অভিযোগ। চিকিৎসক ও নার্সিংহোম কর্তৃপক্ষের গাফিলতিতে ছেলের মৃত্যু হয়েছে এই অভিযোগে ১১ সেপ্টেম্বর বর্ধমান থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন অরণ্যের বাবা। অভিযোগের ভিত্তিতে মামলা রুজু করে তদন্ত শুরু করে পুলিশ। ঘটনার তদন্তে জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিকের নির্দেশে মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করা হয়। শিশুটির মৃত্যুর কারণ খতিয়ে দেখতে দেহ ময়নাতদন্তও করা হয়। ভিসেরা-সহ বিভিন্ন নমুনা পরীক্ষার জন্য ল্যাবরেটরিতে পাঠানো হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। তদন্তে পুলিশ জানতে পারে, অরণ্যের অস্ত্রোপচার করেছিলেন সায়েদুল। অভিযোগ, তিনি নিজেকে ল্যাপারোস্কোপিক সার্জন বলে দাবি করতেন। তদন্তকারীদের দাবি, অভিযুক্তের চিকিৎসা সংক্রান্ত সব ডিগ্রি জাল। পরে রাজ্য মেডিক্যাল কাউন্সিল তাঁর রেজিস্ট্রেশন বাতিল করে। জেলা স্বাস্থ্য দফতরের তরফেও তাঁর রেজিস্ট্রেশন নম্বর জাল বলে পুলিশকে জানানো হয়।
অন্য দিকে, অরণ্যের মৃত্যুর ঘটনায় তদন্তে নেমে পুলিশ ১১ সেপ্টেম্বর কৌশিক দত্ত নামে এক জনকে গ্রেফতার করে। পরে ওই নার্সিংহোমের দুই মালিক শেখ সুরজ আহমেদ এবং আনিসুর মণ্ডল ওরফে আনিশকে গ্রেফতার করা হয়। তাঁদেরও পুলিশি হেফাজতে নেওয়া হয়েছিল। তন্ময় বন্দ্যোপাধ্যায় নামে আরও এক জনকেও গ্রেফতার করেছে পুলিশ। শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় সায়েদুলের বিরুদ্ধে ইচ্ছাকৃতভাবে মৃত্যু ঘটানোর অভিযোগের বিষয়টি খতিয়ে দেখছে পুলিশ। সেই কারণে মামলায় ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ১০৩(১) ধারা যুক্ত করার জন্য আদালতে আবেদন জানানো হয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে খবর।