বৃদ্ধকে মারধর করে খুন করার অপরাধে বাবা ও ছেলেকে যাবজ্জীবন কারাবাসের সাজার নির্দেশ দিলেন বর্ধমান আদালতের তৃতীয় অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা বিচারক রাজেশ তামাং। বিচারকের নির্দেশ, হাজতবাসের সঙ্গে অপরাধীদের ১০ হাজার টাকা করে জরিমানা দিতে হবে। অনাদায়ে আরও ছ’মাস থাকতে হবে সংশোধনাগারে।
আদালত সূত্রে খবর, সাজাপ্রাপ্তদের নাম ফাল্গুনী দত্ত (মৃতের ছেলে) ও অনিরুদ্ধ দত্ত (মৃতের নাতি)। তাঁদের বাড়ি বর্ধমান থানার সরাইটিকরে। মামলা প্রসঙ্গে সরকারি আইনজীবী শিবরাম ঘোষাল বলেন, ‘‘বৃদ্ধের চিকিৎসা ও ওষুধের জন্য খরচ হতে। পরিবারের কাছে বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। এই কারণেই বৃদ্ধকে মারধর করে মেরে ফেলা হয়। এই মামলায় ১১ জন সাক্ষীর মধ্যে মোট আট জন সাক্ষ্য দিয়েছেন। সাক্ষীদের মধ্যে বেশির ভাগ জনই বৃদ্ধের পড়শি।’’
২০২২ সালের ২৯ জুন বৃদ্ধকে মারধর করা হয়। স্থানীয় কয়েকজন যুবক বিষয়টি জানতে পেরে ওই বৃদ্ধের ঘরে যান। তবে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায় ঘরের দরজা ও জানলা বন্ধ। ভিতর থেকে শোনা যায় বৃদ্ধকে মারার শব্দ ও তাঁর কাতর আর্জি। যুবকদের দাবি, বৃদ্ধের ছেলে ও নাতি তাঁদের জানিয়েছিলেন দরজা খোলা হবে না। এর পরে ওই যুবকেরা জোরাজুরি করলে ফাল্গুনী ও অনিরুদ্ধ তাঁদের লক্ষ্য করে জুতো ছোঁড়েন। পরে দরজা ভেঙে ভিতরে ঢুকলে দেখা যায় গুরুতর জখম অবস্থায় মেঝেতে পড়ে আছেন বৃদ্ধ। তাঁর কান ও মাথা দিয়ে রক্ত বার হচ্ছে। শরীরের বিভিন্ন জায়গায় আঘাতের চিহ্ন। পাশেই বসে ছিলেন বৃদ্ধের ছেলে ও নাতি।
স্থানীয় থানায় ফোন করে ওই যুবকেরা বিষয়টি জানান। ঘটনাস্থলে পুলিশ এসে বৃদ্ধকে উদ্ধার করে বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজে নিয়ে যায়। সেখানেই মৃত্যু হয় ৮৬ বছরের বৃদ্ধের।
পরে প্রতিবেশী সুরজিৎ সূত্রধর থানায় অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগের ভিত্তিতে খুন, মারধর-সহ বিভিন্ন ধারায় মামলা রুজু করে অভিযুক্ত বাবা ও ছেলেকে গ্রেফতার করে পুলিশ। সেই বছরেরই ৯ সেপ্টেম্বর অভিযুক্ত দু’জনের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট পেশ করেন তদন্তকারী আধিকারিক শান্তনু চন্দ্র। অভিযুক্তদের হেফাজতে নিয়ে রেখে বিচার সম্পূর্ণ করার জন্য আবেদন জানিয়েছিলেন তদন্তকারী আধিকারিক। প্রসঙ্গত, গ্রেফতারের পর থেকেই দুই অভিযুক্তের ঠিকানা সংশোধনাগার।
আরও পড়ুন:
সরকারি আইনজীবী জানান, ধৃতদের দাবি ছিল বিছানা থেকে পড়ে গিয়ে বৃদ্ধের মৃত্যু হয়েছে। তাঁদের তরফে আদালতেও একই দাবি তুলে ধরা হয়। তবে ময়নাতদন্তের রিপোর্টে বৃদ্ধের শরীরে ২১টি ক্ষতচিহ্নের কথা উল্লেখ করা হয়। দীর্ঘক্ষণ মারধরের ফলে বৃদ্ধের মৃত্যু হয়েছে বলেও রিপোর্টে জানানো হয়। এ ছাড়াও সাক্ষীদের বয়ানেও মারধরের কথা উল্লেখ রয়েছে। সমস্ত বিষয় খতিয়ে দেখে বিচারক নিশ্চিত হন খাট থেকে পড়ে গিয়ে বৃদ্ধের মৃত্যু হয়নি।
জানা গিয়েছে, সাজা ঘোষণার আগে অনিরুদ্ধের অসুস্থতার কথা তুলে ধরে কম সাজা দেওয়ার জন্য বিচারকের কাছে আবেদন জানিয়েছিলেন ফাল্গুনী। সমস্ত বিষয় খতিয়ে দেখে বৃহস্পতিবার বাবা ও ছেলেকে দোষী সাব্যস্ত করে সাজা ঘোষণা করেন বিচারক। বর্ধমান আদালতের রায়কে চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন সাজাপ্রাপ্তদের আইনজীবী।