জমানা বদলেও অভিযোগের ধরনে বদল নেই! তৃণমূল আমলে রাজ্যের মেডিক্যাল কলেজগুলির সাংস্কৃতিক অনুঠান ঘিরে জোর করে চাঁদা নেওয়ার অভিযোগ ছিল। আরজি কর আন্দোলনের সময় সেই অভিযোগের প্রেক্ষিতে অভীক দে, বিরূপাক্ষ বিশ্বাসদের বিরুদ্ধে জুনিয়র চিকিৎসকদের বিক্ষোভের জেরে তপ্ত হয়ে উঠেছিল বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজ। সেই বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজেই এ বছরের বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে চাঁদা আদায়কে কেন্দ্র করে তৈরি হল বিতর্ক। অভিযোগ, দু’দিনের কলেজ ফেস্টের জন্য প্রথম বর্ষের এমবিবিএস পড়ুয়াদের কাছে ৫৫০০ টাকা করে চাওয়া হচ্ছে। শুধু তাই নয়, চাঁদা আদায়ের ক্ষেত্রে আরএসএসের চিকিৎসক সংগঠন ন্যাশনাল মেডিকস অর্গানাইজেশনের (এনএমও) নাম ব্যবহার করে পড়ুয়াদের উপর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। এই পরিস্থিতিতে প্রতিবাদ জানালে হেনস্থার শিকার হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করে বিষয়টি নিয়ে সরব হয়েছেন এক পড়ুয়া। সমাজমাধ্যমে ওই পড়ুয়ার পোস্ট আবার বিভাগীয় প্রধানদের গ্রুপে শেয়ার করেছেন বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজের এক শিক্ষক-চিকিৎসক।
সমাজমাধ্যমে করা পোস্টে প্রথম বর্ষের চিকিৎসক পড়ুয়া লিখেছেন, ইতিমধ্যেই বইপত্র, হাড়ের সেট-সহ পড়াশোনার জন্য প্রচুর টাকা খরচ হয়েছে। এর উপর মেডিক্যাল কলেজের হস্টেলে ঘর না পাওয়ায় প্রতি মাসে ৪৫০০ টাকা ভাড়া দিয়ে বাইরে পেয়িং গেস্ট হিসেবে থাকতে হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে ফেস্টের জন্য এত টাকা দিতে তাঁর মতো অনেক পড়ুয়াই আর্থিক সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন।
পোস্টে ওই পড়ুয়ার আরও দাবি, ফেস্টের চাঁদা আদায়ের ক্ষেত্রে কয়েক জন সিনিয়র এনএমও-র নাম ব্যবহার করে পড়ুয়াদের উপর চাপ সৃষ্টি করছেন। পড়ুয়ার বক্তব্য, "এনএমও একটি অরাজনৈতিক সংগঠন বলেই জেনেছি। কিন্তু সেই সংগঠনের নাম ব্যবহার করে পড়ুয়াদের ভয় দেখানো বা টাকা দিতে বাধ্য করার চেষ্টা হলে বিষয়টি দুর্ভাগ্যজনক।"
প্রথম বর্ষের পড়ুয়াদের একাংশের অভিযোগ প্রসঙ্গে বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজের সিনিয়র চিকিৎসক পড়ুয়াদের একাংশ জানাচ্ছে, ফেস্টের চাঁদা নিয়ে যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে তা জানার পর এ বছরের ফেস্ট আয়োজকদের তরফে বিষয়টি নিয়ে ফেস্ট কমিটির সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করতে বলা হয়েছিল। কিন্তু অভিযোগকারীরা সেই আবেদনে সাড়া দেননি। এ নিয়ে প্রথম বর্ষের পড়ুয়াদের দাবি, ফেস্ট কমিটির সদস্যেরাই চাঁদা দেওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছেন। ফলে তাঁদের কাছে অভিযোগ জানালে সমস্যা বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন অভিযোগকারীরা।
প্রসঙ্গত, বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজের বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানকে ঘিরে এ ধরনের অভিযোগ প্রথম নয়। যার প্রেক্ষিতে এ বছরের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ঘিরে যাতে বিগত বছরের মতো অভিযোগ না ওঠে তার জন্য গত সেপ্টেম্বরে পাঁচ সদস্যের একটি 'সুপারভিশন কমিটি' গঠন করেন অধ্যক্ষ সব্যসাচী দাস। বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজের এমএসভিপি শান্তুনু সেনের নেতৃত্বে গঠিত কমিটির অন্য সদস্যেরা হলেন অ্যানাস্থেসিওলজি, ফিজিওলজির বিভাগীয় প্রধান চিকিৎসক সুমন্ত ঘোষ মৌলিক, চিকিৎসক অরুণিমা চৌধুরী এবং কমিউনিটি মেডিসিনের অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর সঞ্জীব বন্দ্যোপাধ্যায়। বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান কী ভাবে পরিচালিত হবে তার একটি আদর্শ কার্যবিধি (SOP) তৈরি করার কথা এই কমিটির। সেই এসওপি তৈরি হওয়ার আগেই জোর করে চাঁদা আদায় সংক্রান্ত অভিযোগ প্রসঙ্গে সংশ্লিষ্ট কমিটির প্রধান এমএসভিপি শান্তুনু সেন বলেন, "এসওপি আমরা খুব তাড়াতাড়ি জমা দিয়ে দেব। আমাদের তৈরি এসওপি-তে বলাই আছে কারও কাছ থেকে জোর করে চাঁদা বা অন্য কোনও কিছুর নাম করে টাকা নেওয়া যাবে না। চিকিৎসক পড়ুয়াদের যাঁরা অভিযোগ করছেন তাঁরা আনুষ্ঠানিক ভাবে আমাদের কাছে অভিযোগ করলে নিশ্চিত ভাবে আমরা ব্যবস্থা নেব। কিন্তু তার জন্য আগে ইনস্টিটিউশনের অভিভাবক অধ্যক্ষের কাছে অভিযোগ জানাতে হবে।" 'সুপারভিশন কমিটি'র অন্য এক সদস্য চিকিৎসক জানাচ্ছেন, সম্প্রতি ফেস্ট কবে হবে তা নিয়ে কলেজের ছাত্রদের দুই গোষ্ঠীর মধ্যে মতভেদ দেখা দেয়। এই অভিযোগ সেই দুই গোষ্ঠীর টানাপড়েনের ফলও হতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
এই ঘটনা প্রসঙ্গে এনএমও-র রাজ্য সম্পাদক চিকিৎসক অর্ণপ পাল বলেন, "এনএমও একটি অরাজনৈতিক সংগঠন। সারা বছরে আমাদের কী কী কর্মসূচি পালন করা হবে, তার সুনির্দিষ্ট একটি তালিকা রয়েছে। কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে যে নবীনবরণ বা বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয় সেখানে এনএমও কখনওই সংগঠন হিসেবে যুক্ত থাকে না। এনএমও-র কোনও সদস্য এ ধরনের অনুষ্ঠানে থাকতে পারে। কিন্তু সংগঠনগত ভাবে এ ধরনের অনুষ্ঠানের জন্য টাকা তোলার সঙ্গে আমরা যুক্ত নই। এনএমও-র নাম করে টাকা তোলা হচ্ছে বলে যদি কেউ আমাদের লিখিত ভাবে জানান, তা হলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আমরা আইনত ব্যবস্থা নেব।"
বর্ধমান মেডিক্যালের শারীরবিদ্যা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান চিকিৎসক অরুণিমা চৌধুরী জানান, এ বিষয়ে তিনি আগেই কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ জানিয়েছেন। তিনি বলেন, “আমি জীবনে কোনওদিন কোনও ধরনের তোলাবাজিকে সমর্থন করিনি। ‘স্পন্দন’ কমিটির সদস্যেরা আমার নাম ব্যবহার করে টাকা তুলেছেন। আমি এর নিন্দা জানাচ্ছি। ভবিষ্যৎ চিকিৎসকদের এমন আচরণে আমি বিব্রত এবং অসহায় বোধ করছি।”