আকাশ কালো হয়ে এসেছে। হাওয়া দিচ্ছে। তখনও বৃষ্টি নামেনি। আচমকা শুরু হয়ে গেল বিদ্যুতের ঝলকানি আর ঘনঘন বাজ পড়ার শব্দ। তুমুল বৃষ্টিতেও বজ্রপাত কমছে না। পরিবেশবিদ ও আবহাওয়াবিদদের দাবি, গত কয়েক বছর ধরে রাঢ়বঙ্গ ও কলকাতায় বাজ পড়া অত্যাধিক বেড়ে গিয়েছে। গ্রামীণ এলাকাতেও দূষণের কারণে বাজ পড়া বাড়ছে বলে বিশেষজ্ঞদের অনুমান। সোমবার সন্ধ্যায় বর্ধমান ও সংলগ্ন এলাকায় ঘন ঘন বজ্রপাত-সহ ভাল বৃষ্টি হয়েছে। কালবৈশাখীর সময়ে জেলায় বজ্রপাতে ন’জনের মৃত্যু হয়েছে। বিপর্যয় মোকাবিলা দফতরের দাবি, বিকেলের পর থেকে বজ্রপাত হওয়ায় প্রাণহানি বা জখমের সংখ্যা তুলনামূলক ভাবে কম।
বিপর্যয় মোকাবিলা দফতর সূত্রে জানা যায়, আলিপুর আবহাওয়া দফতরের তালিকা অনুযায়ী পূর্ব বর্ধমান, বাঁকুড়া ও পুরুলিয়া ‘বজ্রপাত-অঞ্চল’। পূর্ব বর্ধমানের মন্তেশ্বর, জামালপুর ও গলসি ২ ব্লক নিয়ে আবহাওয়া দফতর উদ্বিগ্ন। তথ্য ও নথি অনুযায়ী, ওই তিনটে ব্লকে বাজ পড়ার ঘনত্ব ও সংখ্যা বেশি। প্রাণহানি ও জখমও বেশি। আবহাওয়া দফতর জানিয়েছে, রাজ্য ও কেন্দ্র সরকারের যৌথ উদ্যোগে ও আলিপুর আবহাওয়া দফতরের সহযোগিতায় ওই তিনটে ব্লকে সম্ভবত অগস্ট মাস থেকে টানা এক বছর নানা কর্মসূচি হবে। স্থানীয় মানুষ, চাষিদের, স্কুল-কলেজ পড়ুয়াদের সচেতন করা হবে। বজ্রপাতের আগাম সঙ্কেত পেতে আবহাওয়া দফতরের ‘দামিনী’ মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন নিয়েওপ্রচার হবে।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাটমসফেরিক সায়েন্স বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপক ও গবেষক সুব্রত মিদ্যা বলেন, “কিউমুলোনিম্বাস বা বজ্রগর্ভ মেঘ থেকেই সাধারণত বজ্রপাত হয়। উষ্ণায়ন বেড়ে যাওয়ায় বজ্রপাতের পরিমাণ বাড়ছে। একটি নির্দিষ্ট জায়গায় বজ্রপাত হওয়ার মূল কারণ, অল্প জায়গায় মধ্যে মেঘ মাটির দিকে যাচ্ছে।’’ বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, এলাকার বায়ু দূষণ সম্পর্কে নির্দিষ্ট গবেষণা রিপোর্ট পাওয়া গেলে একটি অঞ্চল জুড়ে কেন বজ্রপাত হচ্ছে, তা স্পষ্ট করে ব্যাখা করা সম্ভব। আবহাওয়াবিদদের দাবি, বজ্রপাতের একটা অন্যতম কারণ বাতাসে জলীয় বাষ্পের আধিক্য আর তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়া। আর এই তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে প্রত্যক্ষ ভাবে জড়িত দূষণ। দূষণের মাত্রা বাড়লে বজ্রগর্ভ মেঘ তৈরি হওয়ার আদর্শ পরিবেশ তৈরি হচ্ছে।
পরিবেশবিদদের দাবি, জেলার মোট ভৌগলিক আয়তনের অন্তত ৩৩% বনাঞ্চল থাকার কথা। সেখানে বনাঞ্চল রয়েছে ১৩.৮%। আর গাছ রয়েছে ২৭% এলাকায়। পরিবেশবিদদের দাবি, বর্ধমানে চালকল, হিমঘর-সহ ছোট ছোট কারখানা থাকার কারণে বায়ু দূষণ পরিস্থিতি উদ্বেগের। তা ছাড়া কৃষি কাজে পাম্প, মোটর ভ্যান, ট্রাক্টরের মতো যানবাহন ডিজ়েল আর কেরোসিন মিশ্রিত তেলে চলে। পরিবেশ বিজ্ঞানী, বেসরকারি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য অপূর্বরতন ঘোষ বলেন, “কাটা তেলের উপরে নির্ভর করে অতিরিক্ত যানবাহন চলাচল করায় জেলার ওই তিনটি জায়গাতে বাতাসে নাইট্রোজেন গ্যাসের পরিমাণ বেড়ে যায়। তার ফলে বজ্রপাতও বাড়ছে।”
বজ্রপাতে মৃত্যু
২০২৪ সালে: ২৩ জন
২০২৫ সাল: ১০ জন
২০২৬ সাল: ৯ জন (এপ্রিল, মে, জুনের হিসাব)