কথায় বলে, যে রাঁধে সে চুলও বাঁধে। তিনি সংসারের যাবতীয় দায়-দায়িত্ব সামলান। আবার নিজ উদ্যোগে আর্থিক ভাবে স্বাবলম্বীও। শুধু নিজের পায়ে দাঁড়াননি। তাঁর মতো আরও প্রায় ৫০০ সাধারণ বধূকে রুজি-রোজগারের সুযোগ করে দিয়েছেন। দিয়েছেন আর্থিক ভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার অহঙ্কার। তিনি ‘অন্য দুর্গা’ মঞ্জু দাস।
পূর্ব বর্ধমানের বড়শুলের বাসিন্দা মঞ্জু। সাধারণ নিম্নবিত্ত পরিবারের বধূ থেকে তিনি এখন উদ্যোগপতিও বটে। তাঁর উদ্যোগে গড়ে উঠেছে কর্মসংস্থানের বড় পরিসর। কাজের সুযোগ পেয়েছেন ভিন্জেলার মহিলারাও।
মঞ্জুরা রাখি বানান। তাঁদের বানানো তৈরি রাখি কেবল পূর্ব বর্ধমান জেলা কিংবা পশ্চিমবঙ্গে নয়, বিক্রি হয় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। এমনকি, সুদূর আমেরিকাতেও গিয়েছে মঞ্জুদের হাতে তৈরি রাখি।
শুরুটা হয়েছিল স্বামীর হাত ধরে। মঞ্জুর স্বামী সন্দীপ দাস দীর্ঘদিন ধরে রাখি বানানোর কাজ করতেন। সেই ব্যবসাকে আরও বড় আকার দিয়েছেন মঞ্জু। তাঁদের কাজ উৎসবকেন্দ্রিক বা মরসুমি নয়, দাস দম্পতির সারাবছরের জীবিকাই হল রাখি তৈরি। ধীরে ধীরে আশপাশের মহিলাদেরও নিজেদের কাজের সঙ্গে যুক্ত করেছেন তাঁরা। ঘরকন্নার কাজ সেরে অবসর সময়ে ওই কাজের মাধ্যমে উপার্জনের নতুন রাস্তা পেয়েছেন নিম্নবিত্ত পরিবারের বধূরা। এখন হাটগোবিন্দপুর, রায়না, জামালপুর-সহ পূর্ব বর্ধমানের বিভিন্ন এলাকার মহিলারা রাখি বানাচ্ছেন মঞ্জুর হাত ধরে। সম্প্রতি হুগলি জেলার কয়েক জন মহিলাও ওই কর্মযজ্ঞে শামিল হয়েছেন। মঞ্জুর কথায়, ‘‘রাখি তৈরির কাজ সারাবছরই চলে। আমরা বিভিন্ন ধরনের রাখি তৈরি করি। প্রতি বছর নতুন নতুন এবং বিভিন্ন জায়গা থেকে বরাত আসে। সেই বরাত অনুযায়ী উৎপাদন হয়।’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘এ বছরও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অর্ডার এসেছে। সেই অনুযায়ী রাখি তৈরি করে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।’’
বিভিন্ন সংস্থা এবং কোম্পানি মঞ্জুর কাছে রাখি তৈরির কাঁচামাল ও অন্যান্য উপকরণ পাঠায়। সেই সঙ্গে যায় ক্যাটালগ। সেগুলো দেখে নির্দিষ্ট নকশা অনুযায়ী রাখি তৈরি করেন মঞ্জুরা। অনেকে আবার ক্যাটালগ পাঠায় না। সে ক্ষেত্রে মঞ্জু নিজেই নতুন নতুন নকশার রাখির নমুনা তৈরি করে কোম্পানিগুলোকে পাঠায়। পছন্দ হলে সেই অনুযায়ী তৈরি হয় রাখির কাজ। মঞ্জুর অধীনে যে মহিলারা রাখি তৈরি করছেন, তাঁদেরও নকশার নমুনা দিয়ে দেন তিনি। সেগুলো অনুসরণ করে রাখি তৈরি করেন তাঁরা। নমুনা জমা দেন মঞ্জুর কাছে। মঞ্জু মঞ্জুর করলে শুরু হয় গড়ার কাজ। এ ভাবেই রাখি উৎপাদনের পুরো প্রক্রিয়াটি পরিচালনা করেন পূর্ব বর্ধমানের বধূ।
উৎসবের রঙিন সুতো বানিয়ে কেবল ভাই-বোনের সম্পর্কের বন্ধন তৈরি করছেন না মঞ্জু। সুতোর টানে তিনি একসূত্রে বাঁধছেন কয়েকশো মহিলার জীবন-জীবিকাকে। সংসার সামলেও যে কাজ করে স্বনির্ভর হচ্ছেন গ্রামীণ মহিলারা।