সাইকেলে বাড়ি বাড়ি খবরের কাগজ বিলি করতেন বাবা। স্নাতক উত্তীর্ণ হওয়ার পরে গৃহশিক্ষকতার পাশাপাশি, বেশ কিছু বাড়িতে কাগজ পৌঁছে দেওয়ার কাজ শুরু করেন তাঁর বড় মেয়ে। আড়াই দশকের বেশি সময় ধরে সেই কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন আসানসোলের বড়তোড়িয়া লাগোয়া শিমুলিয়া গ্রামের বাসিন্দা ফুলেশ্বরী মণ্ডল নামতীর্থ। এই কাজ করেই দুই বোনকে পড়াশোনা করিয়েছেন, তাঁদের বিয়েও দিয়েছেন। ফুলেশ্বরী মনে করেন, তিনি তাঁর দায়িত্বই শুধু পালন করেছেন।
ফুলেশ্বরীর বাবা বিনোদ মন্ডল জানান, তাঁর তিন মেয়ে ও এক ছেলে। ছেলে প্রতিবন্ধী হওয়ার কারণে কাজ করতে পারেননি। মাস আটেক আগে ছেলের মৃত্যু হয়েছে। স্ত্রীর মৃত্যু হয়েছে তারও আগে। বিনোদ জানান, তিনি নিজে ৭৪ বছর বয়স পর্যন্ত সংবাদপত্র বিলির কাজ করতেন। বড় মেয়ে ফুলেশ্বরী বিধানচন্দ্র কলেজ থেকে কলা বিভাগে স্নাতক উত্তীর্ণ হওয়ার পরে গৃহশিক্ষকতা শুরু করেন। ১৯৯৯ সালে সকালে গৃহশিক্ষকতা ও তার পরে বেশ কিছু বাড়িতে সাইকেলে সংবাদপত্র পৌঁছে দেওয়া শুরুকরেন। ধীরে ধীরে ফুলেশ্বরী হকারই হয়ে ওঠেন।
বিনোদ জানান, করোনায় আক্রান্ত হয়ে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ার পর থেকে তিনি আর সাইকেল চালাতে পারেন না। ফুলেশ্বরী হকারের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। বিনোদের কথায়, ‘‘দায়িত্ব নিয়ে দুই বোনের লেখাপড়া করানো, তাদের বিয়ের ব্যবস্থা করেছে ফুলেশ্বরী। এমনকি, আমার কেনা জমিতে বাড়ি তৈরি করাও ওর সাহায্য ছাড়া সম্ভব হত না। ফুলেশ্বরী আমাদের বাড়িতে দশভূজা।’’ ফুলেশ্বরীর স্বামী শিশিরকুমার নামতীর্থ জানান, তিনি আনাজ বিক্রি করেন। অল্প আয় হয়। স্ত্রী বড় ভরসা। প্রতিবেশীরাও জানান, ফুলেশ্বরী এলাকায় অনেকের কাছেই অনুপ্রেরণা। আসানসোলের বিস্তীর্ণ এলাকায় হকার হিসাবে ফুলেশ্বরীকে এক ডাকে চেনেন অনেকেই।
ফুলেশ্বরী জানান, সাইকেলে বাড়ি বাড়ি গিয়ে সংবাদপত্র পৌঁছে দিয়ে তিনি যে সম্মান পান, তাতাঁকে আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে। তিনি বলেন, ‘‘এক সময়ে সংসারে বাবার পাশে দাঁড়ানোটা কর্তব্য বলে মনে হয়েছিল। সেই কর্তব্যই করে যেতে চাই।’’