তৃণমূলের নেতারা আড়ালে। জেলায় পুজোর সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু চমক বা জৌলুস আগের মতো থাকবে কি না তা নিয়ে পুজো সমন্বয় কমিটির সদস্যদের মধ্যে চর্চা চলছে। বহু পুজো কমিটি খরচের ক্ষেত্রে ‘সংযমী’ হয়েছে। ফলে জাঁকজমকের জন্য পরিচিত দুর্গাপুজোগুলির আড়ম্বর কিছুটা কমবে কি না তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
বর্ধমান ও মেমারি মেমারি শহর, গুসকরা ও অন্য গ্রামীণ এলাকাতেও এ বার কান পাতলে শোনা যাচ্ছে পুজোর খরচ নিয়ে উদ্বেগের কথা। পুজো উদ্যোক্তাদের অনেকে বলছেন, তৃণমূল নেতারা সরাসরি পুজোর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ফলে বাড়তি সুবিধা সব জায়গাতেই মিলত। তৃণমূল জমানায় দলে কোন নেতার ‘ওজন’ কত, তার উপরে ভিত্তি করে ব্যবসায়ী বা ঠিকাদাররা ঠিক করতেন, কোন পুজোয় কত টাকা তাঁরা ঢালবেন। সেই সব ‘রাজনৈতিক দাদাদের’ নাম করলে দর কষাকষি ছাড়াই বিজ্ঞাপনদাতারা বিজ্ঞাপন দিতেন। পুজোর খরচ তোলার জন্য বিভিন্ন ক্লাব লটারি-প্রতিযোগিতা করে। ‘নেতাদের’ ফোনে নিমেষের মধ্যে টিকিট নেওয়ার প্রতিযোগিতা শুরু হত।
এ বার সে সব উধাও। বিজেপি আমলে পুজো কমিটির সঙ্গে যুক্ত সেই সব তৃণমূল নেতাদের অনেকেই এখন জেলে বা অন্তরালে রয়েছেন। অনেক পুজো আবার চলে গিয়েছে বিজেপির দখলে। সেখানে তৃণমূলের নেতারা ঠাঁই পাচ্ছেন না। মেমারি ১ ব্লকের এক তৃণমূল নেতা বলছিলেন, “অনেক পুজো বিজেপি দখল করে নিয়েছে। কিন্তু কোথায় গেলে চাঁদা মিলবে, সে সম্পর্কে সম্যক ধারণা তাঁদের নেই। ফলে আমাদের হাত ধরে উজ্জ্বল হয়ে ওঠা পুজো এ বার টিমটিম করবে।”
বর্ধমান শহরের বাজেপ্রতাপপুরের একটি পুজোর সঙ্গে এক তৃণমূল নেতার নাম জড়িয়ে থাকত। ক্ষমতায় পালাবদলের পরে ওই নেতা এখন অন্তরালে। পুজোর বিজ্ঞাপন থেকে শুরু করে মণ্ডপ, সবেতেই থাকত আড়ম্বর আর বৈভবের ঠাসা বুনোট। গত কয়েক বছর ধরে ওই পুজোকে কার্যত শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন সেই নেতা। এলাকাবাসীর দাবি, ওই নেতা তো দূরের কথা, তাঁর সঙ্গীদেরও এখন আর দেখা যাচ্ছে না। ফলে, পুজো দুয়ারে এলেও গতবার যে আয়োজন ছিল, তার ছিটেফোঁটাও চোখে পড়ছে না এ বার। তাঁরা
বলছেন, “এ বার আগের মতো জাঁকজমক হবে না।”
তেলিপুকুরের পুজোও অনেক ছোট হয়ে গিয়েছে। এই পুজোর সঙ্গে বর্ধমান শহরের এক পুর-প্রতিনিধির নাম জুড়ে ছিল। তিনি বিধানসভা ভোটে জেলার একটি বিধানসভায় তৃণমূলের প্রার্থী ছিলেন। সরকার বদলের পরে তিনি নিজেকে অনেকটাই গুটিয়ে নিয়েছেন। রাজনৈতিক কার্যপলাপে দেখা যায় না তাঁকে। এমনকি, পাড়ার ক্লাবেও তাঁর যাতায়াত বন্ধ।
এলাকাবাসীর একাংশ বলছেন, তেলিপুকুরের পুজো ধীরে ধীরে শহরে জায়গা করে নিচ্ছিল। রায়না-খণ্ডঘোষ থেকে প্রচুর মানুষ তেলিপুকুরের পুজোয় আসতেন। পুজোর দিনগুলিতে চলচ্চিত্র শিল্পী থেকে শুরু করে রাজনৈতিক নেতাদের আনাগোনা থাকত। পুজো
কমিটির বর্তমান এক কর্তার কথায়, “যিনি এ সব করতেন,
সেই তৃণমূল নেতাই তো হাত তুলে নিয়েছেন। কার দৌলতে এ বার জাঁকজমক হবে?”
শহরে একটি বিদ্যালয়ের মধ্যে পুজো হয়। এ বারও হচ্ছে। কিন্তু যে তৃণমূল নেতা ওই পুজোয় যুক্ত ছিলেন, তাঁকে এ বার ‘দূরে’ সরিয়ে দিয়েছেন উদ্যোক্তারা। ওই তৃণমূল নেতা পুরসভাকে ব্যবহার করে বিজ্ঞাপন জোগাড় করে দিতেন। করতেন টাকার সংস্থানও। তিনি ‘আড়ালে’ চলে যাওয়ায় পুজোর খরচ তুলতে কালঘাম ছুটছে বর্তমান কমিটির, বলছেন উদ্যোক্তাদের অনেকেই।
শহরের আরও কয়েকটি পুজোর বৈভবও এ বার কমছে। আর্থিক টানাটানি চলছে বলে জানাচ্ছেন আলমগঞ্জ বারোয়ারি, লাল্টু স্মৃতি সঙ্ঘ, লক্ষ্মীপুর, কেশবগঞ্জ চটির পুজো উদ্যোক্তারা। এক পুজো কর্তার দাবি, “পুর প্রতিনিধিরা পুজোয় যুক্ত থাকলে কিছুটা সুবিধা পাওয়া যেত। এ বার বাড়তি চ্যালেঞ্জ নিতে হচ্ছে।” তবে এই পরিস্থিতিতেও বেলপুকুর কিশোর সঙ্ঘ তাদের ২৫ বছরের পুজো করতে চাইছে জাঁকজমক করে। বড় মাঠে পুজো হচ্ছে এ বার। পুজোর সঙ্গে যুক্ত এক বিজেপি নেতা বলেন, “এ বার যে ভাবে পুজো হবে, তা এই এলাকার মানুষ আগে কখনও দেখেননি।”