সরকার গঠন হয়েছে মাসতিনেক। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কাজ এগোচ্ছে দ্রুত গতিতেই। তবে তারই মধ্যে কোথাও কোথাও দল ও সরকারের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি নজরে আসছে শাসক শিবিরের। দল ও সরকারের মধ্যে সেতু গড়তে আরও পদক্ষেপের ভাবনা শুরু হয়েছে বিজেপির অন্দরে।
সঙ্ঘ পরিবার এবং বিজেপির সাংগঠনিক রীতি মেনে সরকারে কারও হাতেই একক কর্তৃত্ব ছেড়ে দেওয়া হয়নি। নীতিগত সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে দলের মনোভাব বুঝেই এগোতে হয় সরকারকে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ-সহ বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের আস্থাভাজন। কিন্তু মন্ত্রিসভায় আরএসএস এবং বিজেপির নিজস্ব প্রভাবও রয়েছে। আর নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে ‘রিমোট কন্ট্রোল’ রয়েছে কেন্দ্রীয় ভাবে দিল্লির হাতে। আপাতত দিল্লির দূতের মাধ্যমে সরকারের কাজে ‘নজরদারি’ চলছে। তাঁকে দিয়েই সরকারের নানা সিদ্ধান্তে সবুজ সঙ্কেত নেওয়া হচ্ছে। সূত্রের খবর, দল ও সরকারের মধ্যে নিয়মিত আদানপ্রদান বাড়িয়ে কাজের প্রক্রিয়া যাতে মসৃণ করা যায়, সেই লক্ষ্যে ‘ব্রিজ কমিটি’ গড়ার পরিকল্পনা বিজেপি শিবিরে আলোচনায় এসেছে। সে ক্ষেত্রে মন্ত্রিসভা এবং দলের মধ্যে থেকে প্রতিনিধি নিয়ে কমিটি হবে, যারা দু’পক্ষের মতের সমন্বয় করে কাজে সাহায্য করবে।
রাজ্যে বামফ্রন্ট ক্ষমতায় থাকা এবং পরিষদীয় রাজনীতিতে সক্রিয়তা বেশি থাকাকালীন এই ধরনের ‘ব্রিজ কমিটি’ রেখেই সব সময়ে কাজ পরিচালনা করে এসেছে সিপিএম। সরকার তথা বিধানসভায় যাঁরা নীতি ও সিদ্ধান্ত রূপায়ণ করছেন, তাঁদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেয় ‘ব্রিজ কমিটি’। তা ছাড়া, বাম সরকারের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী দলেরও রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য ছিলেন। বিজেপির তরফে রাজ্যে এখন কোর কমিটি সরকারের সঙ্গে সমন্বয়ের কাজ করছে। দলের সিদ্ধান্ত গ্রহণের শীর্ষ স্তর হিসেবে এই কমিটিতে মুখ্যমন্ত্রী আছেন। অন্য দিকে আছেন বিজেপির সাংগঠনিক পর্যবেক্ষক সুনীল বনসল, মঙ্গল পাণ্ডে ও অমিত মালব্য, দলের রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য, প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি সুকান্ত মজুমদার, সাংগঠনিক সাধারণ সম্পাদক অমিতাভ চক্রবর্তী ও সতীশ ধন্ড এবং রাজ্য সাধারণ সম্পাদকেরা। কমিটির বৈঠক ঘন ঘন হয়, এমন অবশ্য নয়। রাজ্য বিজেপির এক শীর্ষ নেতার বক্তব্য, ‘‘সরকার ও দলের কাজ আলাদা। কিন্তু সরকারের সঙ্গে দলের সমন্বয় নিয়মিত ও মসৃণ থাকা জরুরি। আপাতত কোর কমিটির মাধ্যমে কাজ চলছে। তবে ব্রিজ কমিটি এই সমন্বয়ের জন্য উপযুক্ত মডেল। এর পরে ব্রিজ কমিটি গঠনে হাত দিতে হবে।’’ সূত্রের ইঙ্গিত, কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার রদবদল এবং নিতিন নবীনের নেতৃত্বে সর্বভারতীয় বিজেপির সাংগঠনিক কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হলে রাজ্যে এই বিষয়ে পদক্ষেপ হতে পারে।
বিজেপি সূত্রের খবর, নতুন সরকারের মন্ত্রী ও বিধায়কদের মধ্যে সমন্বয়ের সমস্যা হলে মূলত মুখ্যমন্ত্রীই সেই সমস্যা মেটাতে উদ্যোগী হচ্ছেন। বিধানসভায় মন্ত্রীরা যাতে নিজেদের ঘরে সপ্তাহে এক দিন করে বিধায়কদের সময় দেন, সেই পরামর্শও মুখ্যমন্ত্রী দিয়েছেন। আর বিজেপির তরফে কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক পর্যবেক্ষক বনসল সমন্বয় রাখছেন মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে। তবে তাঁর হাতে একাধিক দায়িত্ব রয়েছে বলে তাঁর ‘দূত’ হিসেবে কৃষ্ণকান্ত উপাধ্যায়কে রাখা হয়েছে। একটি সূত্রের ইঙ্গিত, পারতপক্ষে প্রতি সপ্তাহে দিনদুয়েক কৃষ্ণকান্ত যাতে কলকাতায় থেকে সরকার ও দলের মধ্যেকার বকেয়া বিষয় দেখে নেন, সেই বার্তা দেওয়া হয়েছে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের তরফে।
রাজ্যে মন্ত্রিসভা গঠনে বেশ খানিকটা সময় লেগেছিল দিল্লির সম্মতির অপেক্ষাতেই। এখনও সরকারের হাতে থাকা বিভিন্ন নিগমের দায়িত্বে নতুন মুখ আনা হয়নি। বিধানসভার বিভিন্ন কমিটি বণ্টনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তও ঘোষণা হয়নি। বিজেপির এক রাজ্য নেতার কথায়, ‘‘মুখ্যমন্ত্রী অত্যন্ত দ্রুত গতিতে কাজ করছেন। তবে আমাদের দলের নিয়মে নানা বিষয়েই কেন্দ্রীয় মত গুরুত্বপূর্ণ। তাতে হয়তো একটু সময় লেগে যায়, তবে নিয়ন্ত্রণও থাকে। সমন্বয়ের ব্যবস্থা ঠিক হলে কাজে সুবিধা হবে।’’