রাজ্যসভার সূত্র পুরসভায় চলবে না! এই নীতির পক্ষেই মত ও স্বর জোরালো হচ্ছে বিজেপিতে।
বিধানসভা নির্বাচনে বিপুল জয়ের পরে এ বার কলকাতা ও হাওড়ার পুর-নিগমে নিষ্কণ্টক জয় পেতে অনেক আগে থেকেই প্রস্তুতিতে নেমে পড়েছে বিজেপি। আর পুরভোট যত কাছে আসছে, বর্তমান শাসকের ঘরে তত বাড়ছে প্রাক্তন শাসকের দিক থেকে আসা অনুরোধের ‘চাপ’। নানা দলে ভাগ হয়ে থাকা পুরনো তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা-নেত্রীদের কেউ চাইছেন বিজেপির সঙ্গে জোট হোক, কেউ চাইছেন নিদেনপক্ষে তাঁদের প্রার্থীদের টিকিটের ব্যবস্থা হোক! কিন্তু বিজেপির ঘরের চেহারা যথাসম্ভব ‘সাবেক’ রাখতে এক অবস্থানে দাঁড়াচ্ছেন দলের রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য এবং দুই প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি সুকান্ত মজুমদার ও রাহুল সিন্হা। শেষ দু’জনই কলকাতা ও হাওড়ায় পুরভোটে দলের সাংগঠনিক কমিটির দায়িত্বে আছেন।
রাজ্যে পালাবদলের পরে তৃণমূল ছেড়ে আসা চার জন সাংসদ পরপর বিজেপির টিকিটে আবার রাজ্যসভায় ফিরেছেন। যা নিয়ে দলের অন্দরে যথেষ্ট প্রতিক্রিয়া আছে। তার পরে সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, কাকলি ঘোষ দস্তিদারদের এনসিপিআই-এর দেওয়া পুরভোটে জোটের প্রস্তাব বারেবারেই খারিজ করেছেন বিজেপির রাজ্য নেতৃত্ব। একই সঙ্গে প্রাক্তন পুর-প্রতিনিধিদের একাংশ তৃণমূল ছেড়ে এসেই যাতে বিজেপির প্রার্থী না হয়ে যান, সেই বিষয়েও দলে আলোচনা হয়েছে। পুরভোটের প্রস্তুতি-বৈঠকের মাঝেই দিল্লি সফর সেরে এসেছেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক। সূত্রের খবর, একান্ত ‘ব্যতিক্রমী’ পরিস্থিতি না-হলে তৃণমূল বা অন্য দল থেকে আসা কাউকে ‘তৎকাল’ টিকিট না-দেওয়ারই সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে স্থানীয় বা ওয়ার্ড স্তরে যাঁরা অন্য দল থেকে এসে আগে থেকেই বিজেপির সঙ্গে কাজ করছেন, তাঁদের কারও কারও কথা ভাবা যেতে পারে বলে আলোচনা হয়েছে।
বিধানসভা ভোটে ৬ মাস আগেই বৃহত্তর কলকাতায় ১৭টি আসনের মধ্যে ১০টিতে জিতেছিল বিজেপি। বিধানসভা নির্বাচনের ফলের নিরিখে কলকাতা পুরসভার পুরনো ১৪৪টি ওয়ার্ডের মধ্যে ১০৪টিতে তারা এগিয়ে। পুনর্বিন্যাসের পরে ২০৯টি ওয়ার্ডের হিসেবে ধরলে বিজেপি এগিয়ে প্রায় ১৫৯টি ওয়ার্ডে। পুরভোটের সাংগঠনিক প্রস্তুতিতে থাকা দলের এক বিধায়কের কথায়, ‘‘একা লড়েই বিজেপি যেখানে এত দূর এগিয়েছে, তার পরে জটিলতার মধ্যে আমরা যাব কেন! তৃণমূল মূলত দক্ষিণ কলকাতার দল। দক্ষিণে তাদের কিছু পরিচিত পুর-প্রতিনিধিও যদি ছেড়ে বেরিয়ে আসেন, তা হলে দলটার আর কিছুই থাকবে না! সেই জন্যই একটা বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।’’
নিজেদের শক্তিতে ভর করে এবং পুরনো সৈনিকদের গুরুত্ব দিয়েই যে তাঁরা পুর-যুদ্ধ জয় করতে চান, সেই নীতি স্পষ্ট করে দিচ্ছেন শমীক-সুকান্ত-রাহুলেরা। রাজ্য সভাপতি শমীকের কথায়, ‘‘মানুষ শুধু জামা বদলাতে বিজেপিকে ভোট দেননি! আমরা একার শক্তিতে দুই-তৃতীয়াংশ আসন জিতে সরকার গড়েছি। একক শক্তিতেই হাওড়া ও কলকাতা পুরভোটে বোর্ড তৈরির ক্ষমতা রাখি।’’ তৃণমূল থেকে প্রাক্তন পুর-প্রতিনিধিদের নেওয়া প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী সুকান্তের মন্তব্য, ‘‘তাঁরা যোগাযোগ করুন, তাঁরা কলিং বেল বাজান, কিন্তু আমরা দরজা খুলব কেন?’’ পাশাপাশিই তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন, ‘‘রাজনীতিতে ক্ষমতার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের আসা-যাওয়া বাড়ে। আমরা মনে রাখছি, যখন আমাদের একটু খারাপ সময় ছিল, তখন কারা দলের সঙ্গে ছিলেন। তাঁরা যাতে বঞ্চিত না হন, দল সে দিকে খেয়াল রাখবে।’’ প্রাথমিক ভাবে সোমবার সন্ধ্যার মধ্যে ড্রপ বক্সে বিজেপির প্রার্থী-পদের আবেদন নেওয়া শেষ হবে বলে ঠিক হয়েছে।
তবে দলেরই এক সাংসদ বলে রাখছেন, ‘‘পদ্মের টিকিটের জন্য অন্য দলের যাঁরা মরিয়া, তাঁরা আরও মরিয়া হবেন! উপরের দিকে যেতে চাইবেন। ধরে নিয়েই মোকাবিলা করতে হবে!’’