পুজোর মধ্যে এ বার অভূতপূর্ব রাজনৈতিক পরিস্থিতি দেখা দিল রাজ্যে।
দুর্গা পুজো শুরুর সঙ্গে সঙ্গেই রাজ্যের নানা প্রান্তে বামপন্থীদের বইয়ের বিপণিতে একের পর এক হামলার ঘটনা ঘটছে। কোথাও স্টল তৈরির সময়েই ভেঙে দেওয়া হচ্ছে, কোথাও তৈরি হওয়া স্টলে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠছে। একই সঙ্গে অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রেই পুলিশ হামলার সময়ে নিষ্ক্রিয়, আবার কিছু জায়গায় পুলিশও বিপণি খুলিয়ে দিতে সক্রিয়। এমতাবস্থায় ‘সংগঠিত প্রতিরোধে’র ডাক দিলেন শাসক দল বিজেপিরই রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য! যার প্রেক্ষিতে বামেদের পাল্টা প্রশ্ন, শাসক পক্ষই কি চাইছে পুজোর মধ্যে রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ হোক? অশান্তি বাধলে তার দায় তখন কি রাজ্য প্রশাসন নেবে? মানুষকে সঙ্গে নিয়ে বইয়ের প্রচার চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি পুজোর সময়ের ঐতিহ্য মেনে শান্তি-সম্প্রীতি বজায় রাখার আবেদন জানিয়েছেন বাম নেতৃত্ব। আর এই পরিস্থিতিতে বামেদের পাশেই দাঁড়িয়েছেন রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
হাওড়ার বোটানিক্যাল গার্ডেন এলাকায় আইএইচই ওয়েলফেয়ার কমিটির মণ্ডপ সংলগ্ন সিপিএমের বইয়ের বিপণি ভেঙে দেওয়া হয়েছিল পঞ্চমীর রাতে। সেই পুজোতেই ষষ্ঠীর সকালে গিয়ে বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য বলেছেন, ‘‘পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে গত ৪ মে-র পর থেকে কিছু বিচ্ছিন্ন শক্তির উত্থান হয়েছে। এদের আমি চিনি না! এরা বিজেপির পতাকা নিয়ে বিভিন্ন কিছু ঘটনা ঘটাচ্ছে। আমি মানুষকে বলব, এদের বিরুদ্ধে সংগঠিত প্রতিরোধ করুন। প্রয়োজনে পুলিশকে জানান।’’ তাঁর সংযোজন, ‘‘আমরা বহুত্ববাদী সমাজে বাস করি। ভারত চিন বা উত্তর কোরিয়া নয়। ভারতীয় গণতন্ত্রের মূল সুর বিরোধিতার অধিকার।’’ শমীক যেখানে গিয়েছিলেন, সেখানে ভাঙা স্টল আবার দাঁড় করিয়ে বই বিক্রি করতে বসে গিয়েছেন বাম কর্মী-সমর্থকেরা।
বামেদের পক্ষে দাঁড়িয়ে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা শুক্রবারই বলেছেন, ‘‘সর্বত্র দখলদারি। মত প্রকাশের স্বাধীনতা নেই। বাংলা থেকে দিল্লি, অঘোষিত হলেও সর্বত্র জরুরি অবস্থা চলছে। রাজনৈতিক মতাদর্শ প্রচার ও প্রসারের অধিকার সাংবিধানিক অধিকার।’’ তাঁর আরও বক্তব্য, ‘‘বিভিন্ন পুজো মণ্ডপে আমাদের দলীয় মুখপত্রের স্টল হতো। সব পুজো দখল করেছে। আমরা অসম্মানিত হতে চাইনি। যেখানে সম্ভব, দলের কর্মীরা সেখানে নিজেদের পত্র-পত্রিকা প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করছেন।’’
বামেদের বইয়ের বিপণি খুলতে না-দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়ে সিপিএমের রাজ্য দফতরের কাছে হোর্ডিং। —নিজস্ব চিত্র।
পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে পুজোর মধ্যেই এ দিন নজিরবিহীন ভাবে আলিমুদ্দিন স্ট্রিটে সিপিএমের রাজ্য দফতরে সিপিএম, সিপিআই, ফরওয়ার্ড ব্লক, আরএসপি, এসইউসি এবং সিপিআই (এম-এল) লিবারেশন নেতৃত্ব একসঙ্গে বসে ‘মুক্ত চিন্তা ও মতপ্রকাশের অধিকারের উপরে ফ্যাসিবাদী আক্রমণ’ মোকাবিলার ডাক দিয়েছেন। সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম বলেছেন, ‘‘রাজ্যে বুক স্টলের উপরে যে হামলা হচ্ছে, তা আসলে ফ্যাসিবাদী কায়দায় গণতন্ত্রের উপরেই আক্রমণ। হামলাকারী দুষ্কৃতীদের বিরুদ্ধে স্বরাষ্ট্রসচিব এবং রাজ্য পুলিশের ডিজি-র কাছে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাচ্ছি আমরা। যেখানে হামলা হবে, সেখানে মানুষ আরও বেশি করে আসবেন, বই বিক্রি হবে।’’ তাঁর সংযোজন, ‘‘পুজোর সময়ে রাজনৈতিক কর্মসূচি সাধারণত হয় না। কিন্তু এই আক্রমণ করে বাধ্য করা হচ্ছে পথে নামতে। তখন আবার বললে হবে না যে, উৎসবের পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে! আমরা আক্রান্ত, পরিশ্রান্ত নই।’’ সিপিএমের সেলিম, সিপিআইয়ের স্বপন বন্দ্যোপাধ্যায়, ফ ব-র নরেন চট্টোপাধ্যায়, আরএসপি-র দেবাশিস মুখোপাধ্যায়, এসইউসি-র চণ্ডীদাস ভট্টাচার্য, লিবারশেনের কার্তিক পালেরা একসুরেই জানিয়েছেন, তাঁরা উৎসবের মধ্যে অশান্তি চাইছেন না। কিন্তু বিপণি ভেঙে জোর করে বই কেড়ে নিলে মানুষকে সঙ্গে নিয়েই প্রতিবাদ হবে, আবার বই জড়ো করে বসা হবে।