মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বয়স হয়েছে। এই বয়সে ভোটে আর না-দাঁড়ানোই ভাল! নন্দীগ্রাম ছেড়ে ভবানীপুর বিধানসভা আসন ধরে রাখার নেপথ্যে কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে এ ভাষাতেই কটাক্ষ করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর মতে, মমতার যা বয়স হয়েছে, তাতে তাঁর এখন বিশ্রাম নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে নথি চুরির চেষ্টা সংক্রান্ত ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যয়ের অভিযোগ নিয়ে তদন্তেরও আশ্বাস দেন শুভেন্দু। তিনি জানান, ঋতব্রতেরা যদি এ বিষয়ে এফআইআর করেন, তবে তদন্তভার সিআইডি-কে দেওয়া হবে। শুভেন্দুর আশ্বাসের পর পুলিশে অভিযোগ জানানোর বিষয়ে তোড়জোড় শুরু হয়েছে ঋতব্রত শিবিরে।
বুধবার বিধানসভায় বিধায়ক হিসেবে শপথ নেন নন্দীগ্রাম এবং রেজিনগরের জয়ী বিজেপি প্রার্থী হাসিরানি রথ এবং শাখারভ সরকার। সেই শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে শুভেন্দুর বক্তৃতায় উঠে এসেছে নানা প্রসঙ্গ। তাঁর প্রাক্তন আপ্তসহায়ক চন্দ্রনাথ রথের খুনের তদন্ত থেকে শুরু করে নন্দীগ্রামের আসন ছাড়ার কারণও ব্যাখ্যা করেন তিনি। শুভেন্দুর মতে, ‘‘এত দিন সংখ্যালঘুদের দূরে সরিয়ে রাখা হত। সেই সংখ্যালঘুরা রেজিনগরে বিজেপি-কে ভোট দিয়েছে।’’ একই সঙ্গে পালাবদলের পর রাজ্যের উন্নয়নে গত ছ’মাসে তাঁর সরকার কী কী করছেন তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে শুভেন্দু বলেন, ‘‘ছ’মাসে যা দেখছেন, সেটা সকালের চা-বিস্কুট। ব্রেকফাস্ট এখনও বাকি। তার পরে তো লাঞ্চ।’’
বিধানসভায় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে হাসিরানি রথ। —নিজস্ব চিত্র।
বিগত কয়েকটি বিধানসভা নির্বাচনে নন্দীগ্রাম থেকে জিতে বিধায়ক হয়েছিলেন শুভেন্দু। তবে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে নন্দীগ্রামের পাশাপাশি লড়েছিলেন ভবানীপুর থেকেও। ভবানীপুরে তিনি রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূলনেত্রী মমতাকে হারান। ভোটে জেতার পর ভবানীপুর আসন ধরে রেখে ছেড়ে দেন নন্দীগ্রাম। বুধবার তিনি ব্যাখ্যা করেন নন্দীগ্রাম কেন ছেড়ে দিয়েছেন। তাঁর মতে, তিনি যদি ভবানীপুর ছেড়ে দিতেন তবে সেই আসনে আবার দাঁড়াতে পারতেন মমতা। সেই সুযোগ দিতে চাননি। মমতার নাম না-করে শুভেন্দুর কটাক্ষ, ‘‘ভবানীপুর ছাড়লে যিনি আমার কাছে দু’বার হেরেছেন, তিনি দাঁড়ানোর সুযোগ পেয়ে যেতেন। সেই সুযোগটা না দেওয়াই ভাল। এই বয়সে তাঁর না দাঁড়ানোই ভাল। অনেক বয়স হয়ে গিয়েছে। প্রায় ৭৫। এই বয়সে বিশ্রাম নেওয়ার কথা। সেই কারণে আমি নন্দীগ্রাম ছেড়েছি।’’
বিধায়ক হিসেবে শপথ নিলেন রেজিনগরের জয়ী বিজেপি প্রার্থী শাখারভ সরকার। —নিজস্ব চিত্র।
বুধবার বিধানসভায় উপস্থিত ছিলেন পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার বিরোধী দলনেতা তথা বিক্ষুব্ধ তৃণমূল নেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। হাসিরানি এবং শাখারভকে অভিনন্দন জানান তিনি। তার পরেই বক্তৃতা করতে উঠে ঋতব্রতদের অভিযোগের তদন্ত সিআইডি-কে দেওয়ার কথা বলেন মুখ্যমন্ত্রী। উল্লেখ্য, গত সোমবার ভোরে সমাজমাধ্যমে একটি দীর্ঘ পোস্ট করেছিলেন ঋতব্রত। সেই পোস্টেই তিনি নথি চুরির অভিযোগ করেন। ঋতব্রতদের দাবি ছিল, কালীঘাট শিবিরের হলফনামা চার্টার্ড ফ্লাইটে করে রবিবার সন্ধ্যায় দিল্লি পৌঁছে গিয়েছে। কিন্তু তাঁর শিবিরের আর্থিক সঙ্গতি নেই। তাই সড়কপথে হলফনামা পাঠানো হয়েছিল। সোমবার ভোর সাড়ে ৩টে নাগাদ সেই ট্রাকে হামলা হয়। অভিযোগ, দুষ্কৃতীরা তাঁদের নথি ছিনতাইয়ের চেষ্টা করেছিল। গোটা ঘটনার নেপথ্যে মমতাপন্থী কালীঘাট শিবিরের হাত রয়েছে বলে মনে করেন ঋতব্রত। শুভেন্দু বলেন, ‘‘আপনারা নিজেরা লড়ালড়ি করুন। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা যাতে অবনতি না-হয় সেটা দেখতে হবে।’’ কেন তিনি এই কথা বলছেন তার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ঋতব্রতের পোস্টের কথা উল্লেখ করেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘‘বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় সমাজমাধ্যমে একটি পোস্ট করেছেন তাঁদের নথি ছিনতাই করার চেষ্টা হয়েছে। আপনারা যদি এফআইআর করেন আমরা এটা সিআইডি-কে দিয়ে দেব।’’ শুভেন্দুর আশ্বাস প্রসঙ্গে অধিবেশন শেষে ঋতব্রত জানান, গণতান্ত্রিক তৃণমূলের তরফে রাজ্য পুলিশের কাছে অভিযোগ করা হবে।
আরও পড়ুন:
ভোটের ফলপ্রকাশের পর পরই খুন হয়েছিলেন চন্দ্রনাথ। নন্দীগ্রামে শুভেন্দুর ছেড়ে দেওয়া আসনে চন্দ্রনাথের মা হাসিরানিকে প্রার্থী করে বিজেপি। সেই আসনে হাসিরানিকে জয়ী করার জন্য নন্দীগ্রামের মানুষকে ‘ধন্যবাদ’ জানান শুভেন্দু। তার পরেই চন্দ্রনাথ-খুনের তদন্তের কথা বলেন তিনি। আগেও তিনি অভিযোগ করেছিলেন, চন্দ্রনাথকে খুন করতে দু’কোটি টাকা ‘সুপারি’ দেওয়া হয়েছে। সেই প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বুধবার বিধানসভায় দাঁড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‘এই মামলায় সাত জনকে গ্রেফতার করেছে সিবিআই। শুটার এবং সুপারি কিলার সকলেই গ্রেফতার হয়েছে। কে দু’কোটি টাকার সুপারি দিয়েছিল, এখন শুধু সেটাই সামনে আসা বাকি। টাকাটা কোথা থেকে এসেছিল? কালীঘাট থেকে, ক্যামাক স্ট্রিট থেকে এসেছিল না ডায়মন্ড হারবারের কেউ দিয়েছিল— এই টুকু জানা বাকি।’’