E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

অভিযুক্তকে থামাতে গুলি কেন প্রাণঘাতী, প্রশ্ন

গত তিনটি ‘এনকাউন্টারে’ই দাবি করা হয়েছে, অভিযুক্ত পুলিশের বন্দুক ছিনিয়ে নিয়ে গুলি করেছে। তাতে প্রশ্ন উঠেছে, এক জন অভিযুক্ত পুলিশের বন্দুক ছিনিয়ে নিল, সেফটি ক্যাচ আনলক করল, গুলি চালাল! অথচ সেই সময়ের মধ্যে পুলিশ পায়ে গুলি করতে পারল না?

কুন্তক চট্টোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ২৮ অক্টোবর ২০২৬ ০৬:২৭

—প্রতীকী চিত্র।

খুনের অধিকার এ দেশে কারও নেই। কিন্তু অপরাধী ধরতে গিয়ে ‘মরতে বসলে’ গুলি করতে পারে পুলিশ। রাজ্য পুলিশের প্রাক্তন কর্তাদের মতে, এমন পরিস্থিতিতে গুলি চালানোর ঘটনা ব্যতিক্রম (‘জেনারেল এক্সসেপশন’) হিসেবেই গণ্য করা হয়। রাজ্যে একের পর এক ‘এনকাউন্টারে’ অভিযুক্তের মৃত্যুর ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে, ব্যতিক্রমই কি তবে ‘নব্য স্বাভাবিক’ হয়ে উঠছে? প্রাক্তন পুলিশকর্তাদের একাংশের মতে, আইনরক্ষককে সুরক্ষাকবচ দিতেই এই ‘ব্যতিক্রমী ঘটনার’ কথা বলেছিল আইন। কিন্তু সেই ‘ব্যতিক্রমের’ ফাঁক গলেই কোথাও গুলি চালানো রীতি হয়ে উঠবে না তো? প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত পুলিশকর্মীদের কোমর থেকে কী ভাবে আনকোরা অভিযুক্ত বন্দুক ছিনিয়ে নিচ্ছে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এক জন প্রাক্তন পুলিশকর্তার মতে, ‘‘যে পুলিশকর্মী নিজের বন্দুক সামলাতে পারেন না তাঁকেই তো আগে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো উচিত!’’

রাজ্যে পালাবদলের পর তিনটি ‘এনকাউন্টার’-এর ঘটনা ঘটেছে। তার মধ্যে দক্ষিণ ২৪ পরগনার নাবালিকাকে ধর্ষণ-খুনের ঘটনায় এক ‘অভিযুক্ত’ আছে। সোমবার গভীর রাতে উত্তর ২৪ পরগনায় ধর্ষণ-খুনে এক অভিযুক্ত এবং মঙ্গলবার মুর্শিদাবাদের সামশেরগঞ্জে এক খুনের অভিযুক্ত ‘এনকাউন্টারে’ মারা যাওয়ার পর পুলিশকর্তাদের একাংশ বলছেন, ‘এনকাউন্টার’ করার অধিকার পুলিশের হাতে চিরকালই ছিল। কিন্তু তেমন কোনও ঘটনা ঘটলে তার নিয়মমাফিক তদন্ত হত। আইনরক্ষক যাতে আইনের অন্যায্য ব্যবহার করা না-করেন, তাই এই ব্যবস্থা। রাজ্য পুলিশের এক প্রাক্তন ডিজি বলছেন, ‘‘পুলিশ গুলি চালালে নিয়মমাফিক এফআইআর করা হয় এবং সংশ্লিষ্ট জেলার এসপিকে সে ব্যাপারে জেলাশাসককে রিপোর্ট দিতে হয়। তার পরে ম্যাজিস্ট্রেট পর্যায়ের তদন্ত হয়। সেই নিয়ম মানা হয় কি? দক্ষিণ ২৪ পরগনার এনকাউন্টারের তদন্ত কত দূর এগিয়েছে?’’

গত তিনটি ‘এনকাউন্টারে’ই দাবি করা হয়েছে, অভিযুক্ত পুলিশের বন্দুক ছিনিয়ে নিয়ে গুলি করেছে। তাতে প্রশ্ন উঠেছে, এক জন অভিযুক্ত পুলিশের বন্দুক ছিনিয়ে নিল, সেফটি ক্যাচ আনলক করল, গুলি চালাল! অথচ সেই সময়ের মধ্যে পুলিশ পায়ে গুলি করতে পারল না? সরাসরি বুকে গুলি করতে হল? রাজ্য পুলিশের এক প্রাক্তন ডিএসপি-র কথায়, ‘‘এই বিষয়গুলিই ম্যাজিস্ট্রেট পর্যায় এবং মানবাধিকার কমিশনের তদন্তে উঠে আসার কথা। কিন্তু এখন সেই তদন্ত হয় কি? এই ধরনের ঘটনা ঘটলে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনেও জানাতে হয়। তিন মাসের মধ্যে রিপোর্ট জমা দিতে হয়।’’ রাজ্যের এক প্রাক্তন এডিজি-র মতে, ‘‘তদন্ত হবে। দোষী হলে চাকরি যাবে, এই ভয় থাকলে পুলিশ বেআইনি কিছু করতে পারবে না। কিন্তু যদি সেই ভয় না থাকে...।’’

দক্ষিণ ২৪ পরগনার ঘটনার পর রাজ্য মানবাধিকার কমিশন সংশ্লিষ্ট এসপি-র রিপোর্ট তলব করেছিল। তার পরে কী হয়েছে, তা স্পষ্ট হয়নি। রাজ্য পুলিশের এক প্রাক্তন এসপি-র দাবি, ‘‘আগে মানবাধিকার কমিশন যখন তুলনামূলক বেশি সক্রিয় ছিল, তখন তারা নিজেরাই এই ধরনের ঘটনার অনুসন্ধান করত।’’

বর্তমান পুলিশকর্তাদের অনেকে বলছেন, পুলিশের বন্দুক ছিনিয়ে গুলি কোনও সাধারণ অভিযুক্ত করে না। দাগি, মার্কামারা দুষ্কৃতীরা তা করতে পারে। তেমন অভিযুক্তের ক্ষেত্রে হাতকড়া পরানোর রাস্তা খোলা থাকে। উপরন্তু, ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতা অনুযায়ী ঘটনার পুনর্নির্মাণ, তল্লাশি সব কিছুতেই ভিডিয়োগ্রাফি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। পুলিশকর্তাদের মতে, নিয়মমাফিক ঘটনার পুনর্নির্মাণ করা হলে ভিডিয়োগ্রাফিতেই বন্দুক ছিনিয়ে নেওয়া, পুলিশের ‘আত্মরক্ষার্থে’ গুলি করা সব কিছু ধরা পড়বে!

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Encounter

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy