যাব কি যাব না, সে ভাবনা আছে। তবে যেতে চাইলেও এত তাড়াতাড়ি যে যাওয়া উচিত নয়, সে প্রশ্নে বিশেষ দ্বিমত নেই!
ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় ‘কারচুপি’র অভিযোগ এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণের দাবিতে দলের সর্বভারতীয় নেতৃত্বের সঙ্গে রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নৈকট্য ঘিরে বঙ্গ সিপিএমের অন্দরে পরিস্থিতি এখন এই রকমই। দলের একাংশ মনে করে, পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় এসেই বিজেপি যে ভাবে দাঁত-নখ বার করেছে, তার পরে সব বিরোধী দলের ঐক্যবদ্ধ হওয়াই অনিবার্য। আর অন্য একাংশের আশঙ্কা, রাজ্যে গণতান্ত্রিক পরিবেশ রক্ষা ও বিরোধীদের মর্যাদার প্রশ্নে মমতার দলের যে ‘রেকর্ড, সে সব ভুলে ‘গণতন্ত্র বাঁচানো’র স্বার্থে তাদেরই হাত ধরা মানে বিজেপির হাতে আরও হাতিয়ার তুলে দেওয়া! চার বছর আগে সিপিএমের কান্নুর পার্টি কংগ্রেসে দলের প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক প্রকাশ কারাট মমতার দলের কাজকর্মের উদাহরণ দিয়েই যে বলেছিলেন তৃণমূলকে তাঁরা ‘গণতান্ত্রিক শক্তি’ হিসেবে মানতে নারাজ, সেই কথা মনে করাচ্ছে তারা। সেই পার্টি কংগ্রেসে কারাট একই সঙ্গে বলেছিলেন, রাজ্যে তাদের বিরোধীদের উপরে আক্রমণ চালিয়েও তৃণমূল যদি বিজেপি-বিরোধিতা করতে চায়, করতেই পারে। তবে বামেরা তাদের সঙ্গে সংস্রব রেখে নয়, নিজেদের মতো করে বিজেপির বিরোধিতা করবে।
তবে দলের অন্দরে এই টানাপড়েনের মধ্যেও সিপিএমের রাজ্য নেতৃত্ব বোঝানোর চেষ্টা করছেন, ক্ষমতা হারানোর ৬ মাসের মধ্যেই তৃণমূল কংগ্রেসকে কোনও ‘ক্লিন চিট’ তাঁরা দিচ্ছেন না। নির্বাচনী আঁতাঁতেও যাচ্ছেন না। বরং, রাজ্যে কোণঠাসা হয়ে মমতাই দিল্লি গিয়ে সর্বভারতীয় স্তরে কংগ্রেস ও বামেদের কাছে চলে যাচ্ছেন।
জ্ঞানেশ-প্রশ্নেই এর আগে সিপিএমের সাধারণ সম্পাদক এম এ বেবি এবং মমতা-তৃণমূলের নেত্রীর মধ্যে পত্রালাপ ও ফোনালাপ হয়েছিল। তার পরে দিল্লিতে ‘ইন্ডিয়া’ মঞ্চের বৈঠকে এবং রামলীলা ময়দানের সমাবেশে বেবি-মমতার ‘উষ্ণ সমীকরণে’র ছবি বাম শিবিরের ঘরে-বাইরেই নজর কেড়েছে। মমতাকে কেন্দ্র করে সিপিএমের নতুন মনোভাবকে রাজনৈতিক শিবিরের একাংশ হাল্কা চালে ‘বেবি স্টেপ্স’ আখ্যা দিচ্ছে! আর রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী দুই বিরোধী দলের নেতা-নেত্রীর রসায়নকে ‘বেবি আর আন্টির চা-বিস্কুট খাওয়া’ বলে কটাক্ষ করছেন। কলকাতায় ‘গণতন্ত্র বাঁচাও, অরাজকতা হটাও’ ডাক দিয়ে মিছিল করতে এসে বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি নিতিন নবীন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীকে নিশানা করে বলে গিয়েছেন, বিধানসভা ভোটের আগে যে মমতাকে পশ্চিমবঙ্গে দুর্নীতি, অপশাসন এবং গণতন্ত্র হত্যার কারিগর বলে আক্রমণ করা হল, ভোটে হেরে যাওয়ার পরে সেই তৃণমূল নেত্রীকেই সঙ্গে নিয়ে গণতন্ত্র বিপন্ন বলে দিল্লিতে কান্নাকাটি করতে হচ্ছে! নিতিনের নিশানায় কংগ্রেস থাকলেও এই প্রশ্ন যে তাঁদের দিকেও আছে, বুঝতে পারছেন সিপিএম নেতৃত্ব।
সিপিএমের রাজ্য কমিটির এক সদস্যের মতে, পুজোর আগে এবং পরে পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ফারাক আছে। বামেদের প্রতি বিজেপির আক্রমণের তীব্রতা যে ভাবে বাড়ছে, তাতে ঐক্যবদ্ধ বিরোধিতার ক্ষেত্র প্রস্তুত হচ্ছে। ওই নেতার কথায়, ‘‘তৃণমূলের হাত থেকে নিস্তার পেতে বিজেপিকে সমর্থন করেছিলেন বাংলার মানুষের বড় অংশ। বিজেপি যে কত বিপজ্জনক হতে পারে, এখন থেকেই টের পাওয়া যাচ্ছে। বামপন্থীদের একাংশের মধ্যেও ধারণার পরিবর্তন হচ্ছে। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে তৃণমূল-বিরোধী যে অংশের ভোট বিজেপির দিকে গিয়েছিল, তার খানিকটা হলেও ফিরে আসার সুযোগ আছে।’’ একই ভাবে দলের এক সংখ্যালঘু নেতা বলছেন, ‘‘পুজোর সময়ে বইয়ের স্টলে যে ভাবে লাগাতার হামলা হয়েছে, মুখ্যমন্ত্রী যে ভাবে প্রতিদিন আক্রমণ করছেন, তাতে বোঝাই যাচ্ছে বামপন্থীরা এখন বিজেপির মূল লক্ষ্য। বিজেপি আক্রমণ ধারালো করছে বলেই ভবিষ্যতে তাদের বিরুদ্ধে একের বিরুদ্ধে এক সূত্রে লড়াই করার একটা ভাবনা তৈরি হচ্ছে। বিশেযত, সংখ্যালঘু মানুষের মধ্যে।’’ একই সঙ্গে তিনি মনে করাচ্ছেন, ‘‘তবে এত তাড়াতাড়ি তৃণমূলকে সঙ্গে নিয়ে গণতন্ত্র বাঁচানোর ডাক দিলে প্রশ্ন উঠবেই। সাম্প্রতিক হামলা না-হলে হয়তো আরও ধীরে চলা হত।’’
আবার সিপিএমেরই এক জেলার নেতার বক্তব্য, ‘‘এত দিন যে দুই দলের মধ্যে ‘সেটিং’-এর কথা বললাম, তাদের এক পক্ষের সাহায্য নিয়ে অন্য পক্ষের সঙ্গে লড়তে চাইব কেন?’’ এমতাবস্থায় দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুজন চক্রবর্তীর ব্যাখ্যা, ‘বাংলার মানুষ তৃণমূলের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়েছেন, তার সুযোগ নিয়ে বিজেপি ক্ষমতায় এসেছে। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী এখন বাংলায় কিছু করতে পারছেন না, কোথাও যেতে পারছেন না। স্বভাবতই বাইরে কেউ ডাকলেই চলে যাচ্ছেন! তার মানে বাংলায় কোনও জোট আছে, এমন নয়। সেটা কিন্তু দিবালোকের মতো স্পষ্ট।’’
ব্যাখ্যা চলছে, প্রশ্নও থাকছে!