পুলিশের সঙ্গে ‘এনকাউন্টারে’ প্রভাস মণ্ডলের মৃত্যুতে বাংলার সমাজে এক উচ্ছ্বাসের ঢেউ দেখা গেল। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, চায়ের দোকান, গণপরিবহণে যাত্রীদের আলোচনায়— সর্বত্র। যে ১১ বছরের কিশোরীকে ধর্ষণ করে খুন করতে পারে, তার বিচারের জন্য অপেক্ষা করতে হয়নি, এর থেকে ভাল আর কী হতে পারে? যা হয়েছে, বেশ হয়েছে, বলছেন তাঁরা।
প্রভাস ছিলেন বারুইপুরে নাবালিকার গণধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় অন্যতম অভিযুক্ত। তাঁর মৃত্যুর পর অবশ্য বিভিন্ন পুলিশ সূত্রে দাবি করা হয়, তিনিই ছিলেন মূল অভিযুক্ত। পুলিশের দাবি, তারা গুলি চালাতে বাধ্য হয়েছিল।
পুলিশ বলছে, বার বার বিভ্রান্তিকর বয়ান দিচ্ছিলেন প্রভাস। নিজেকে বাঁচিয়ে অন্যদের ফাঁসানোর চেষ্টা করছিলেন। সেই জন্যই তাঁকে নিয়ে ঘটনার পুনর্নির্মাণ করতে যাওয়া হয়। তখন হঠাৎ পুলিশের সার্ভিস রিভলভার ছিনিয়ে পালানোর চেষ্টা করেন। পালানোর সময় পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলিও ছোড়েন। আত্মরক্ষার্থে প্রভাসকে পাল্টা গুলি করা হয়। তাতেই মৃত্যু।
পুলিশের বয়ানে নানা ফাঁক দেখছেন রাজনৈতিক বিরোধী ও মানবাধিকার কর্মীরা। প্রশ্ন করছেন, গভীর রাতের এই সংঘর্ষ আদতে সাজানো নয় তো?
জনগণের একটা বড় অংশ বিরোধীদের প্রশ্নকে পাত্তা দিতে রাজি নন। হয়তো, এক ধাক্কায় বেড়েও গিয়ে থাকতে পারে শুভেন্দু অধিকারীর সরকারের জনপ্রিয়তা। বিচার হয়? প্রশ্ন করছেন তাঁরা। ক’জন ধর্ষক সাজা পায়? কী বিচার পেলেন কামদুনির নির্যাতিতা? প্রশ্ন তাঁদের। কেউ কেউ এমনও বলছেন, প্রভাস মণ্ডলের মৃত্যু যদি ভুয়ো সংঘর্ষেও হয়ে থাকে, সেটাও ঠিক। আদালতে কবে, কী প্রমাণ হবে, কে জানে? তা ছাড়া, এদের জন্য কোনও মানবাধিকার প্রযোজ্য হতে পারে না। সকালে ‘জমা’ করে বিকেলে ‘খরচ’ করো।
বারুইপুরের এনকাউন্টারের ঘটনাস্থল। ছবি: আনন্দবাজার আর্কাইভ।
এই প্রবণতা নতুন নয়। কলকাতায় নকশাল আমল থেকে হালের উত্তরপ্রদেশে বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের ‘এনকাউন্টার রাজ’ মডেল—‘বিচারবহির্ভূত হত্যা’র সমালোচনা কোনও কোনও মহল থেকে এলেও, এ সব চলেছে জনসমর্থন পাশে নিয়েই। ২০১৯ সালের হায়দরাবাদের দিশা ধর্ষণ-হত্যা মামলায় চার অভিযুক্তের ‘এনকাউন্টারে’ মৃত্যুর পরেও পুলিশের পক্ষে ব্যাপক সমর্থন দেখা গিয়েছিল।
এনকাউন্টারের নামে ‘তাৎক্ষণিক বিচার’ প্রক্রিয়ার যে অনেক ক্ষেত্রেই বিপুল জনপ্রিয়তা থাকছে, তা লক্ষ্য করেছেন সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি অশোক গঙ্গোপাধ্যায়ও। তিনি উদ্বিগ্ন।
তাঁর মতে, বিচার আদালতে হয়, নানা সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে, পুলিশের বক্তব্যকে পরীক্ষা করার মধ্যে দিয়ে। তবে, আদালতের বাইরেই ‘বিচার’ সেরে নেওয়া নিয়ে মানুষের মধ্যে যে ক্রমবর্ধমান উৎসাহ দেখা যাচ্ছে, তাঁর জন্য আমজনতাকেই দায়ী করছেন না তিনি। “বিচারে দীর্ঘসূত্রতার কারণে বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষ আস্থা হারাচ্ছে। যাঁরা আইনের শাসনে বিশ্বাস করেন, তাঁদের জন্য পরিস্থিতি উদ্বেগের,” তিনি বলেন।
এর দায় বিচারব্যবস্থার একার বলেও তিনি মনে করেন না। বিচারপ্রক্রিয়া রাষ্ট্রপক্ষের ওপরও নির্ভরশীল। শুধু বিচারবিভাগীয় পরিকাঠামো নয়, পুলিশ ও সরকারি আইনজীবীর ভূমিকাও। পুলিশ-প্রশাসন পক্ষপাতমুক্ত না-হলে সেখান থেকেও বিচারে প্রতিবন্ধকতা আসে। তাঁর প্রশ্ন, “কামদুনি গণধর্ষণ মামলার ক্ষেত্রে ১৪ বার সরকারি আইনজীবী বদল হয়েছে। এ ভাবে বিচার আসবে কী করে?” পুলিশের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব কমানো ও বিচারপ্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা নিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
২০১৩ সালে উত্তর ২৪ পরগনার কামদুনিতে কলেজছাত্রীকে গণধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় বারাসতের ফাস্ট-ট্র্যাক আদালত তিন জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং তিন জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়। কিন্তু ২০২৩ সালে কলকাতা হাই কোর্ট চার জনকে বেকসুর খালাস করে দেয়। মৃত্যুদণ্ড পাওয়া দু’জনের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। সেই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল মামলা আপাতত রয়েছে সুপ্রিম কোর্টে।
কামদুনির ঘটনাস্থল। ছবি: আনন্দবাজার আর্কাইভ।
সরকারি তথ্য বলছে, দেশে গত দুই দশকে হত্যামামলায় শাস্তির হার ৪০-৪৫ শতাংশ, ধর্ষণের ক্ষেত্রে মাত্র ২০-২৫ শতাংশ। যেখানে খুন-ধর্ষণের মতো গুরুতর অভিযোগেই বিচারের এই হাল, সেখানে চুরি-ছিনতাই-এর মতো অপরাধে সাফল্য যে আরও কম, বলার অপেক্ষা রাখে না; তথ্যও তাই বলে। দেওয়ানি মামলার তো কথাই নেই। সামান্য বাড়িওয়ালা-ভাড়াটে বিবাদ মামলারই সমাধান হয় না বছরের পর বছর।
‘ন্যাশনাল জুডিশিয়াল ডেটা গ্রিড’-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-এর মার্চ পর্যন্ত হাইকোর্টগুলোতে ৬৪ লক্ষ ও নিম্ন আদালতগুলোতে প্রায় ৫ কোটি মামলা বিচারাধীন ছিল। গোটা দেশে বিভিন্ন রাজ্যে ৫২ লক্ষের বেশি মামলা ১০ বছরেরও বেশি সময় ঝুলে আছে, আমাদের রাজ্যে এই সংখ্যা সাড়ে সাত লক্ষের ওপর।
মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে তৈরি হয়েছিল ফাস্ট ট্র্যাক কোর্ট এবং পারিবারিক আদালতের মতো বিভিন্ন ট্রাইবুনাল এবং বিশেষ আদালত। সেখানেও বিপুল সংখ্যক মামলা ঝুলে থাকার এবং বিচারক বা সদস্যের পদ শূন্য থাকার মতো সমস্যা দেখা যাচ্ছে। মোদ্দা কথা, মামলার ভার বাড়ছে বই কমছে না। সময়ে বিচার পাওয়ার আশা মানুষ ক্রমশই ছেড়ে দিচ্ছে। এমনিতেই নানা আর্থ-সামাজিক কারণে গোটা পৃথিবীতেই মানুষের ধৈর্য কমছে বলে নানা গবেষণায় প্রকাশ। গোদের ওপর এই বিচার-বিলম্বের বিষফোঁড়া তাৎক্ষণিক বিচারের ঝোঁক বাড়ানোয় সহায়ক হয়ে উঠছে।
জনমত আছে বলেই একাংশের রাজনীতিবিদও এনকাউন্টারের সমর্থনে কথা বলেন, মনে করেন অনেক সমাজতাত্ত্বিকই। কিন্তু জনমতের চাপে বিচার বিপজ্জনক বলেও তাঁরা মনে করেন। হাতে গরম উদাহরণ আছে অভিনেত্রী রিয়া চক্রবর্তী। অভিনেতা সুশান্ত সিং রাজপুত মৃত্যু মামলায় গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম মিলে তাঁকেই খলনায়িকা বানাল। তাঁকে জেল খাটতে হল। বিচারে কিন্তু তাঁর কোনও অপরাধই পাওয়া গেল না। অথচ, সরব জনতার চাপে তাঁর জীবনের কতগুলো বছর নষ্ট হয়ে গেল।
ন্যায়বিচার সংক্রান্ত আরেকটা বিতর্কও আছে। উন্নত দেশগুলিতে সাধারণত খুন, সন্ত্রাস, মাদক পাচারের মতো গুরুতর অভিযোগ ছাড়া গ্রেফতারির সঙ্গে সঙ্গে জামিন হয়ে যায়। জেল হয় আদালতে সাজা হলে। ধর্ষণের অভিযোগেও অনেক সময় শর্তসাপেক্ষে জামিন হয়। আমেরিকা, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ফ্রান্সের মতো দেশে জেলে বিচারাধীন বন্দির সংখ্যা ১৫-৩০ শতাংশের মধ্যে থাকে। কিন্তু এখানে ছোটখাটো অভিযোগেও জেলে ঢোকানো দস্তুর হয়ে গিয়েছে—৭৫–৭৭ শতাংশ বন্দিই বিচারাধীন।
বিনা বিচারে আটকে রাখার সুযোগ থাকায় রাজনৈতিক দলগুলিও বারবার প্রতিপক্ষকে শায়েস্তা করতে পুলিশকে ব্যবহার করে। বিচার যবে হবে, হবে, তার আগেই রাজনৈতিক ফায়দা উঠে যাবে। এ সব কারণেও পুলিশ-প্রশাসনের ওপর আস্থার অভাব ঘটে।
যেখানে বিচারব্যবস্থাকে আরও ন্যায়সঙ্গত করতে বিচারাধীন বন্দি কমানো প্রয়োজন, সেখানে তাৎক্ষণিক, বিচারালয়-বহির্ভূত বিচারের দাবি আসলে ন্যায়ের চাকা উল্টো পথে ঘুরিয়ে দেয়, মনে করেন মানবাধিকার কর্মী সুজাত ভদ্র।
তাঁর মতে, তাৎক্ষণিক বিচারের পক্ষে জনপ্রিয়তা আগেও ছিল। বিহারের ভাগলপুর জেলে যখন ডাকাতির অভিযোগে বন্দিদের অনেকের চোখ অন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে, তখন তার বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলে মানবাধিকার কর্মীদের অনেক কটূক্তি শুনতে হয়েছিল, তাঁর মনে আছে। জেল কর্তৃপক্ষের সমর্থনে মিছিল বেরিয়েছিল।
“জনমতের সঙ্গে ন্যায়বিচারের সংঘাত নতুন নয়, কিন্তু জনমানসে একটা ধারণার জনপ্রিয়তা কখনও বিচারের মাপকাঠি হতে পারে না,” তিনি বলেন। “জনরোষ বা জনমতের নামে তাৎক্ষণিক বিচারে আইনের শাসনের অবসান ঘটে, দায়বদ্ধতাহীন ক্ষমতা নিরঙ্কুশ হয়ে উঠে।”
তাঁর যুক্তি, সভ্যতা যত এগোয়, তার রীতিনীতি তত মার্জিত হয়। বিচার-বিলম্বে মানুষের ধৈর্যচ্যুতি ঘটছে, কিন্তু তাৎক্ষণিক বিচারের নামে যা হয়, তাতে বিচারের নামে অবিচার হওয়ার সম্ভাবনা ষোলো আনা। প্রকৃত অপরাধীকে ধরা মুশকিল মনে হলে জনরোষ বা জনমতের চাপ সামলাতে পুলিশ এই ভাবে একটা কাউকে বলির পাঁঠা বানাতে পারে। তা ছাড়া, কোনও কারণে পুলিশ প্রকৃত অপরাধীকে আড়াল করতে চাইলেও নিরীহ কাউকে অপরাধী সাজিয়ে এনকাউন্টার করে দিতে পারে।
এনকাউন্টারকে মহিমান্বিত করার প্রবণতা বিপজ্জনক; আইনি প্রক্রিয়ার বদলে বিচারবহির্ভূত পদ্ধতিকে গুরুত্ব দিলে এক দায়হীনতার সংস্কৃতি তৈরি হয়, এ কথা ২০২৫-এ বলেছিল শীর্ষ আদালতও। তবে সব এনকাউন্টারই সঠিক বা ভুয়ো, এ রকম কোনও সাধারণ সিদ্ধান্তে আসেনি আদালত। অনেক সময়, বিশেষত নিষিদ্ধ সংগঠন বা দাগি অপরাধীদের ক্ষেত্রে, সত্যিই পুলিশকে সশস্ত্র লড়াইয়ের সামনে পড়তে হয়। তাই আদালত কিছু গাইডলাইন তৈরি করে দেয়। বলে, প্রত্যেকটি ঘটনাই পৃথক ভাবে তদন্ত করে দেখতে হবে।
প্রভাসের ক্ষেত্রে এই সব নির্দেশিকা মানা হয়েছিল কি না, তা এখন নিশ্চয়ই খতিয়ে দেখা হবে। বিচারবিভাগীয় তদন্ত শুরু হয়েছে। রাজ্য পুলিশের সিআইডি-কেও তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তাতে অবশ্য এনকাউন্টারের পক্ষে প্রকাশ্য আলোচনা কমেনি।
প্রভাসের মৃত্যুর পরে বারুইপুরের নির্যাতিতার মা সংবাদমাধ্যমকে বলেন, তাঁরা ফাঁসি চেয়েছিলেন, যাতে একটা দৃষ্টান্ত তৈরি হয়। এখানে কী হল তাঁদের কাছে স্পষ্ট নয়। “বিচার দেওয়ার আগে তো এই সব করছে চাপা দেওয়ার জন্য,” তাঁর বক্তব্য।
নির্যাতিতার কাকিমার প্রশ্ন, পুলিশের হাত থেকে কী ভাবে আসামি পালাবে? “ও তো আসামিদের নাম বলছিল, কে কে ছিল এর সঙ্গে যুক্ত, সবার নাম বলছিল! ও আসামিদের নাম বলছিল বলেই ওকে মেরে দেওয়া হয়েছে,” তাঁর অভিযোগ। “আমরা এই ঘটনায় খুশি নই। আমাদের ভুল বোঝালে আমরা ভুল বুঝে যাব?”
প্রভাসের এনকাউন্টারকে প্রশাসন ভুয়ো বলেনি। তারা আত্মরক্ষার্থে গুলি চালানোর কথাই বলছে। কিন্তু রাস্তাঘাটে, কর্মক্ষেত্রে, সামাজিক মাধ্যমে এই এনকাউন্টারকে ভুয়ো মনে করে এখনও অনেকেই সেই ভুয়োত্বের প্রশংসায় ভরপুর। ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে মর্জিমাফিক কাউকে শাস্তি দেওয়ার স্বাভাবিকীকরণ সামাজিক সুস্থতার পরিচয় নয়, সেটা বুঝতে সমাজকে নিশ্চয়ই আয়নায় নিজের মুখ দেখতে হবে। তাৎক্ষণিক বিচার আর বিলম্বিত বিচার, দুটোতেই যে ভারী হয়ে যায় অবিচারের পাল্লা, সেই উদাহরণ অজস্র।
কিন্তু ব্যবস্থা যদি একটা নির্দিষ্ট সময়ে বিচার দিতে না-পারে, তা হলে তা মানুষের আস্থা পাবে কী করে?
দীর্ঘসূত্রতার সমাধানে নানা প্রস্তাব অনেক বছর ধরেই আলোচনা ও প্রয়োগ হচ্ছে, কিন্তু কার্যক্ষেত্রে জমতে থাকা মামলার ভার বেড়েই চলেছে। ‘তারিখ পে তারিখ’ আজ ঘরে ঘরে জনপ্রিয় প্রবচন। বাড়ছে হতাশা। শুধু পরিকাঠামোগত উন্নয়নে সম্ভবত এ রোগ সারার নয়। এ ক্ষেত্রে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো বড় জনসংখ্যার দেশ কোন কোন পদ্ধতিগত কারণে মামলার ভার কম রাখতে ও অপেক্ষাকৃত দ্রুত বিচার দিতে সক্ষম হয়, সেটাও সম্ভবত বিশেষজ্ঞেরা বিবেচনা করে দেখতে পারেন।