Advertisement
E-Paper

বিজেপির ‘ন্যাচারাল অ্যালাই’ থেকে ‘নিয়ো কমিউনিজ়মের জননী’! সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম পর্বে বামবৃত্তে মমতার প্রবেশ-কথা

সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম পর্ব থেকে একাংশের বামমনস্ক সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব মমতার ঘনিষ্ঠ বৃত্তে চলে আসেন। কী ভাবে মিলেছিল মমতা ও অ-সিপিএম বাম?

স্নিগ্ধেন্দু ভট্টাচার্য

শেষ আপডেট: ১৫ অগস্ট ২০২৬ ০৯:০১
How Mamata Banerjee the ‘natural ally of BJP’ transformed herself with the left stance to break the CPM rule

মমতার পরিবর্তনে ঐতিহাসিক প্রেক্ষিত ও তাৎক্ষণিক লাভ-লোকসানের অঙ্ক, দুই-ই ছিল। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

২০০৭-এর প্রথমার্ধ। মঞ্চে বাজছে বামেদের কৃষক আন্দোলনের গান। ‘হেই সামালো ধান হো’, ইত্যাদি। মাঝে মাঝে ঘোষক জানাচ্ছেন, তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং শিল্প-সংস্কৃতি জগতের নানান ব্যক্তিত্ব এসে পড়বেন কিছু ক্ষণের মধ্যেই।

টাটার ন্যানো গাড়ির কারখানার জন্য জমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে কৃষিজমি রক্ষা কমিটির জমায়েত সিঙ্গুরের এক গ্রামের ভিতরে। তৃণমূলের অনুষ্ঠান মানেই চলত জাতীয়তাবাদী গান। মূলত স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গীত। এই মঞ্চ খাতায়কলমে তৃণমূলের নয়, কিন্তু তারাই মূল সংগঠক। মাইকে তবু সলিল চৌধুরী, হেমাঙ্গ বিশ্বাস, ক্যালকাটা ইউথ ক্যয়ার।

যখন মমতা এলেন, ডাঁয়ে-বাঁয়ে মহাশ্বেতা দেবী, বিভাস চক্রবর্তী, শাঁওলি মিত্র, কবীর সুমন, প্রতুল মুখোপাধ্যায়, ব্রাত্য বসুর মতো পরিচিত বামমনস্ক সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। সঙ্গে এসইউসি এবং সিপিআই(এমএল) লিবারেশন-এর স্থানীয় নেতৃত্ব, প্রাক্তন নকশাল নেতা পূর্ণেন্দু বসু, দোলা সেন, প্রদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ।

মমতার মুখে সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতা: “বলতে পারো, বড় মানুষ মোটর কেন চড়বে, সেই মোটরের তলায় কেন গরীব চাপা পড়বে?” বললেন, তিনি প্রকৃত বামেদের শ্রদ্ধা করেন। আগেকার বাম নেতারা অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছেন। একটা বিড়ি তিন বার নিবিয়ে, জ্বালিয়ে খেতেন। বর্তমান সিপিএম শুধু ভোগ আর অত্যাচার করে। কিং-সাইজ সিগারেট খায়।

মমতার মুখে বাম-বন্দনা শুনতে অদ্ভুত লাগলেও আশ্চর্য অবশ্য করেনি। চিরকাল করেছেন এজেন্ডার রাজনীতি। যখন বুঝলেন, জাতীয় স্তরে বিজেপির উত্থান রুখতে কংগ্রেস বাংলায় বামেদের বিশেষ উত্ত্যক্ত করবে না, তখন কংগ্রেস ভেঙে নিজের দল গড়লেন। সরাসরি বলেছিলেন, বিজেপি তাঁর ‘ন্যাচারাল অ্যালাই’, কারণ বিজেপির বাম-বিরোধিতায় কোনও খাদ নেই।

২০০৬-পরবর্তী সময়ে বুঝলেন, সিঙ্গুর, নন্দীগ্রামের মতো জমির অধিকারভিত্তিক আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে বামের অস্ত্রেই বামফ্রন্টকে ঘায়েল করতে হবে। তাতে বিজেপি নয়, বরং সিপিএমের থেকে ‘চড়া বাম’দের পাশে প্রয়োজন। বিশেষত, বামমনস্ক সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের।

তা ছাড়া, ২০০৬-এর শেষে রাজিন্দর সচার কমিটির রিপোর্ট বলে যে, বাম আমলে রাজ্যে মুসলিমদের অবস্থার বিশেষ উন্নতি হয়নি। এর ফলে মুসলিম সমাজের মধ্যে এক অসন্তোষ জন্মায়। আগে মমতা দেখেছিলেন, ২০০৪ ও ২০০৬-তে তিনি বিজেপির সঙ্গে নির্বাচনে গিয়ে বিপাকে পড়েছিলেন; গোধরা-পরবর্তী প্রেক্ষিতে মুসলিমদের ভোট অনেকটাই বামেদের দিকে একজোট হয়ে গিয়েছিল।

২০০৭ নাগাদ সিপিএমের মুসলিম ও কৃষক ভোট ব্যাঙ্কে ভাঙন ধরাতে বিজেপি-কে ফেলে দিয়ে মমতাও বাম পথ ধরলেন। যে মেধা পটকরেরা জাতীয় ক্ষেত্রে সিপিএমের সংগঠনগুলির সঙ্গে অনেক যৌথ কর্মসূচিতে অংশ নিতেন, তাঁরা এখানে মমতার পাশে।

এসআইআরের প্রতিবাদে ধর্মতলার ধর্নামঞ্চে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে জয় গোস্বামী এবং কবীর সুমন।

এসআইআরের প্রতিবাদে ধর্মতলার ধর্নামঞ্চে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে জয় গোস্বামী এবং কবীর সুমন। ছবি: আনন্দবাজার আর্কাইভ।

এই যে এক অ-বাম, ব্যক্তিত্বকেন্দ্রিক রাজনৈতিক নেতা বাম-বৃত্তে ঢুকে পড়লেন— রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দুই পরিসরেই— এ এক বিরল অর্জন।

কে বেশি খাঁটি, এই তর্ক-লড়াইতে বামেরা লোকজনকে বাদ দিতে যতটা উৎসাহী থেকেছেন, সেই উৎসাহ কমই দেখিয়েছেন দল ভারী করায়। কাউকে বিচ্যুতির অভিযোগে পার্টি বহিষ্কার করেছে, কেউ পাল্টা অভিযোগে পার্টি-সঙ্গ ছেড়েছেন। শুধু পার্টি নয়, এ কথা প্রযোজ্য বিভিন্ন শিল্পী-সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী সম্পর্কেও। শুধু আদর্শগত অবস্থান নয়, সৃষ্ট শিল্পের মান নিয়েও যথেষ্ট খুঁতখুঁতে ছিলেন এঁরা। সহজে এঁদের বৃত্তে ঢোকা যেত না। তুমি ভাই, ‘বুর্জোয়া’ বা ‘পপুলিস্ট’, এ-সব নানা সময়ে নানা জনকে শুনতে হয়েছে।

কিন্তু এত এত বাম রাজনৈতিক কর্মী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের মাঝে প্রায় অবাধ প্রবেশ পেলেন মমতা, যিনি আদ্যন্ত জনপ্রিয়তাবাদী, নাটুকে এবং সাংস্কৃতিক জগতের থেকে বিনোদন জগতের বেশি কাছাকাছি। কেন?

এ ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক প্রেক্ষিত ও তাৎক্ষণিক লাভ-লোকসানের অঙ্ক, দুই-ই আছে।

নকশালপন্থীরা আগেই সিপিএম-কে ‘প্রকৃত বাম’ মনে করতেন না। এ সময় মহাশ্বেতা দেবী, বিভাস চক্রবর্তী, শাঁওলি মিত্র, কবীর সুমন, অপর্ণা সেন, প্রতুল মুখোপাধ্যায়দের মতো বাম ঘরানার সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরাও বললেন, সিপিএম আর বাম নেই। একদা ‘জমি যার লাঙল তার’ বলা দল আজ বেসরকারি শিল্পের জন্য জোর করে চাষির জমি কেড়ে নিচ্ছে। গুলি চালাচ্ছে।

ঐতিহ্যগত ভাবে, বাম রাজনীতির মূল ভিত্তি ছিল রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প, রাষ্ট্রের মাধ্যমে সম্পদের পুনর্বণ্টন, শ্রমিক-কৃষকের স্বার্থরক্ষা এবং সামাজিক বৈষম্য হ্রাস। কিন্তু ১৯৭৬-এ মাওয়ের মৃত্যুর পর থেকেই চিনে ক্রমশ জনপ্রিয় হয় দেং জিয়াওপিং-এর বিখ্যাত উক্তি, “বিড়ালটা কালো না সাদা, তাতে কিছু যায়-আসে না, যত ক্ষণ সে ইঁদুর ধরতে পারে।” অর্থাৎ, দরকার হল পুঁজির বিনিয়োগ, সেটা বুর্জোয়া পুঁজি না সমাজতান্ত্রিক পুঁজি, সেটা পরের কথা।

নয়ের দশকের গোড়াতেই ভেঙে পড়ল সোভিয়েত ইউনিয়ন। ভারত সরকারও নতুন অর্থনৈতিক নীতি নিল—উদারীকরণ, বেসরকারিকরণ ও বিশ্বায়ন। রাজ্যে জ্যোতি বসুর সরকারের নয়া অর্থনৈতিক নীতিতেও বিদেশি বিনিয়োগ ও বেসরকারি পুঁজিকে স্বাগত জানানো হয়।

বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য শিল্পায়নের প্রক্রিয়ায় যে গতি আনতে চান, তাঁর পিছনে চিন ও রাশিয়ার পথ পরিবর্তন বা জাতীয় ক্ষেত্রে নরসিংহ রাও-মনমোহন সিংহদের উদার অর্থনীতির প্রভাব নিশ্চয়ই ছিল, কিন্তু আরও বড় কারণ সম্ভবত ছিল বাংলার নিজস্ব বাস্তবতা। কৃষিতে বৃদ্ধির ক্ষেত্রে স্থবিরতা আসে। পুরনো শিল্প ক্রমশ রুগ্‌ণ হতে থাকে। কাজের খোঁজে শহর, মফস্‌সল, গ্রাম সর্বত্রই রাজ্যের বাইরে চলে যাওয়ার প্রবণতা বাড়তে থাকে। এই প্রেক্ষিতেই সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামে সিপিএম বলল, বেসরকারি শিল্পের জন্য চাষিকে জমি ছেড়ে দিতে হবে।

শুভাপ্রসন্ন, যোগেন চৌধুরীদের সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

শুভাপ্রসন্ন, যোগেন চৌধুরীদের সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবি: আনন্দবাজার আর্কাইভ।

মমতার সঙ্গে বামেদের একাংশের যোগাযোগ আগেই ছিল। যেমন, কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়। আদ্যন্ত বাম, শেষ জীবনে মমতা-ঘনিষ্ঠ। ৯০-এর দশকে কানোরিয়া জুট মিলের শ্রমিক আন্দোলন, ভিক্টোরিয়া জুট মিলের কর্মী ভিখারি পাসোয়ানের নিখোঁজ হয়ে যাওয়া, এই সব ইস্যু নিয়ে মমতা আন্দোলনে নামায় একাংশের নকশালপন্থী ও মানবাধিকার কর্মীর সঙ্গে তাঁর একটা যোগসূত্র তৈরি হয়। ১৯৯৮-২০০৬-এর সময়ের বিজেপি ঘনিষ্ঠতা এই সম্পর্কগুলো ক্ষীণ করে দিয়েছিল। তিনি বিজেপি-সঙ্গ ত্যাগ করে জমি আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়তেই জেগে উঠলো পুরনো যোগাযোগ।

এই পর্যায়ে প্রথমে ‘আমি আসল বামেদের শ্রদ্ধা করি’ দিয়ে শুরু করে ‘জল-জঙ্গল-জমি’ স্লোগান গ্রহণ করে ‘আমি সিপিএমের থেকে বেশি বাম’ বলে দাবি করা—দ্রুত পাল্টেছে মমতার রাজনীতি। ২০০৮ সালেই তৃণমূলের ২১ জুলাই-এর মঞ্চে উঠে পড়েন কবীর সুমন, ব্রাত্য বসু। প্রথম জন পরের বছর যাদবপুর থেকে তৃণমূলের সাংসদ হন। দ্বিতীয় জন ২০১১ থেকে মন্ত্রী। পূর্ণেন্দু-দোলা-প্রদীপরা সরাসরি তৃণমূলে যুক্ত হয়ে যান। কেউ মন্ত্রী, কেউ সাংসদ, কেউ শ্রমিক সংগঠনের দায়িত্বে।

সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম পর্বে সিপিএমের বিরোধিতা করা অনেকেই সচেতন ভাবে তৃণমূলের জগতে ঢোকেননি। যেমন অভিনেতা কৌশিক সেন বা পরিচালক সুমন মুখোপাধ্যায়, কবি তরুণ সান্যাল, শিক্ষাবিদ সুনন্দ সান্যালেরা। কিন্তু শাঁওলি, শুভাপ্রসন্ন, জয়, যোগেন, প্রতুলদের পাশাপাশি তত দিনে সরকার ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন পরিবর্তনের আগে কট্টর সিপিএম ইন্দ্রনীল সেন, সুবোধ সরকার, অরিন্দম শীলেরা।

ব্রাত্য আগেই মমতাকে ‘নয়া বাম’ তকমা দিয়ে দিয়েছিলেন, সুবোধ এক ধাপ এগিয়ে মমতাকে ‘নিয়ো-কমিউনিজ়মের জননী’ আখ্যা দেন। সিপিএম থেকে বহিষ্কৃত যে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় আজ মমতার দল কেড়ে নেওয়ার মুখ্য কান্ডারি, তৃণমূলে যোগ দেওয়ার পর রাশিয়ার লেনিনকে না-দেখার আক্ষেপ তাঁর মিটে গিয়েছিল মমতাকে দেখতে পেয়ে।

ক্রমে সাংস্কৃতিক জগতে জাঁকিয়ে বসে তৃণমূলী আধিপত্যবাদ। অধিকাংশেরই মুখে বাম বুলি। সাম্রাজ্যবাদ, হেজেমনি, প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা, সাবঅলটার্ন, এ সব শোনা যেত অহরহ।

সিপিএম থেকে যে নেতা-কর্মীরা বিজেপিতে যান, তাঁরা বাম মতাদর্শকেই প্রত্যাখ্যান করে যান। উদাহরণ, খগেন মুর্মু, শঙ্কর ঘোষ। কিন্তু সিপিএম থেকে যাঁরা তৃণমূলে যান, তাঁরা সিপিএম-কে ‘মেকি-বাম’ আখ্যা দিয়ে তৃণমূলকে ‘সহি-বাম’ বলেন। যথা, রেজ্জাক মোল্লা, তাপস চট্টোপাধ্যায় বা প্রতীক উর রহমান। এর কারণ, মমতা বাম ব্র্যান্ডিং পছন্দ করতেন; মনে করতেন যে, এর সঙ্গে এক রকম প্রগতিশীলতা জড়িয়ে আছে, যার প্রতি বাংলার মধ্যবিত্ত শ্রেণির একাংশের একটা আকর্ষণ আছে। এমনটাই ব্যাখ্যা মমতাকে দীর্ঘদিন কাছ থেকে দেখা এক তৃণমূল নেতার।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক শুভময় মৈত্র মনে করেন, এই রসায়নের ক্ষেত্রে বিদ্বেষের একটা বড় ভূমিকা আছে। বাম শিবিরে একাংশ অনেক সময়ই আরেকাংশকে দক্ষিণপন্থীদের থেকেও ক্ষতিকর মনে করেন। ১৯২০-র জার্মানিতেও কমিউনিস্ট বনাম সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট সংঘাতের সৌজন্যে উত্থান হয় নাজ়ি পার্টির। এখানেও, অতিবাম শিবির তাদের সিপিএম-বিদ্বেষ থেকে মমতার দিকে ঝুঁকে পড়ে।

কেন এই বিদ্বেষ? শুভময় মনে করেন, নকশাল আমলের পার্টি ভাগাভাগি সংক্রান্ত অতীত তিক্ততা তো ছিলই, ১৯৯০-এর দশক থেকে সিপিএমে মধ্যমেধার জয়জয়কার শুরু হয়। শিক্ষাক্ষেত্রে বিপুল প্রভাব বিস্তারের মধ্যে দিয়ে এই পরিবর্তনটি আসে, বিরোধীদের কথায় যা অনিলায়ন নামে পরিচিত। ফলে, বাম ঘরানার প্রতিভাবান বুদ্ধিজীবীদের একাংশ সিপিএমের থেকে ক্রমশ দূরে সরতে শুরু করেন। মূলত, এই অংশটিই সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম পর্যায়ে মমতার কাছাকাছি চলে আসেন।

“এঁদের অনেকের, তথা নকশালপন্থী অতীত থেকে তৃণমূল বৃত্তে আসা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদেরও, সিপিএম-বিদ্বেষ এতটাই প্রবল ছিল যে, তৃণমূলের নানান স্তরে লুম্পেনরাজ, অভূতপুর্ব দুর্নীতি ও ধর্মকেন্দ্রিক রাজনীতিও তাঁদের বিচলিত করতে পারেনি,” তিনি বলেন। পাশাপাশি, সিপিএম থেকেও একাংশ যান। তাঁদের ক্ষেত্রে বিদ্বেষ নয়, সম্ভবত ক্ষমতার প্রত্যাশাই ছিল মূল, শুভময়ের অভিমত।

১৯৫০, ’৬০ ও ’৭০ এর দশক জুড়ে বামেদের রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের একটা বড় ভূমিকা ছিল। প্রভাবশালী লেখক-শিল্পীরা ছিলেন বামেদের দিকে। কিন্তু আশির দশক থেকেই বামফ্রন্ট সরকারকে রক্ষা করার দায় এঁদের অনেকের ওপরই এসে পড়ে। স্বাভাবিক ভাবেই, প্রশ্ন তোলার অনভ্যাসে চিন্তার ঝাঁঝও মরে যায়। বস্তুত, গণসঙ্গীত ঘরানার যে সব গান আজও এ দিক-ও দিক শোনা যায়, তার বৃহদাংশই ১৯৮০-র দশকের আগের।

নব্বই-এর দশকে সাংস্কৃতিক জগতের কারও কারও সঙ্গে সংঘাতও তৈরি হয়। ২০০২-তে ব্রাত্যর লেখা, দেবেশ চট্টোপাধ্যায়ের পরিচালনায় বাম-অবক্ষয় নিয়ে নাটক ‘উইঙ্কল টুইঙ্কল’ যথেষ্ট জনপ্রিয় হয়; সিপিএমের একাংশের উষ্মারও কারণ হয়। সেখানে দেখানো হয়, সত্তর দশকের বাম আর নতুন শতকের বাম এতটাই আলাদা যে, বাম ঘরের ছেলে তৃণমূল কেন, বিজেপি-ও হয়ে যেতে পারে; আদর্শ নয়, ব্যক্তিগত জাগতিক লাভই মুখ্য হয়ে উঠেছে। এই অবক্ষয় নানা ভাবে উঠে আসে নবারুণ ভট্টাচার্যের লেখাতেও। যথা, ‘বাগানে শোভিছে যত সিপিএম ফুল, তলায় ঘাপটি মেরে বাড়ে তৃণমূল’।

২০০৬-’১১ পর্যায়ে সিপিএম-বিরোধী বাম-সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের বড় অংশের একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে বামফ্রন্ট সরকার বিরোধী জনমত গঠন করায়। ফলে, ক্ষমতায় আসার পর এঁদের তুষ্ট রাখার জন্য প্রথম থেকেই বিশেষ নজর দিয়েছিলেন মমতা।

তার ফল কী হল? সে গল্প দ্বিতীয় কিস্তিতে।

Mamata Banerjee Tmc Leader Former Chief Minister West Bengal Politics BJP CPM

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy