পরিবর্তনের আগে ও পরের পরিস্থিতি নিয়ে তাঁর মতামত জানতে চাই, শুনেই বাড়িতে আমন্ত্রণ করলেন। পৌঁছোতেই আগে অত্যুৎসাহী আপ্যায়ন করল তাঁর আদুরে পোষ্য কুকুরটি। অগোছালো বৈঠকখানা। বসার চেয়ার-টেবিল ছড়ানো-ছেটানো কাগজপত্রে ভরা। কুকুরটি ব্যস্ত আমাকে তার খেলার সাথী বানানোর চেষ্টায়। এরই ফাঁকে দু’কাপ চা নিয়ে এলেন কবি। তার পর ঘণ্টা দুয়েক নানান কথা হল। নীচে তার সংক্ষিপ্তসার:
মমতার প্রতি আপনার কৃতজ্ঞতা অনেক বার প্রকাশ করেছেন।
এখনও করছি। আমার ১০ বার বড় রকম চিকিৎসা হয়েছে। পাঁচ বার পাশে দাঁড়িয়েছিল আনন্দবাজার, পাঁচ বার মমতা। এই কারণেই আমি এখনও বেঁচে আছি। এঁরা যেখান থেকে আমার চিকিৎসা করিয়েছেন, আমি নিজে কিছুতেই পারতাম না। বিশেষ পরিস্থিতিতে মমতা আমায় অর্থসাহায্যও করেছেন। আজ তাঁর দল ভেঙে গিয়েছে, প্রতীকও হাতছাড়া। তাঁর নামে ভাল ভাল কথা বলে আমার আর কী-ই বা পাওয়ার আছে? কিন্তু যা দেখেছি, তা তো বলব।
২০১৭ সালে রবীন্দ্রজয়ন্তীর অনুষ্ঠানে। ছবি: আনন্দবাজার আর্কাইভ।
মমতার প্রতি আপনার দরদ বা দুর্বলতা কোথা থেকে এল?
মমতা খুব ছোট জায়গা থেকে উঠেছেন। প্রথম দেখি কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের বাড়িতে। তখনও তৃণমূলের জন্ম হয়নি। পরে আলাপ সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম আন্দোলনের সময়, এক ঘরোয়া জমায়েতে। মহাশ্বেতা দেবীর ডাকে আমি যাই। মমতা এলেন কিছুক্ষণের জন্য। সেখান থেকে সোজা নন্দীগ্রাম যাবেন। ঘরে বসে উনি মুড়ি-চানাচুর খাচ্ছিলেন। তখন রাত সাড়ে ১১টা। জিজ্ঞেস করলাম, এই সময়ে নন্দীগ্রাম যাচ্ছেন, শুধু মুড়ি খেয়ে? আর কিছু খাবেন না? ওখানে তো আপনার অনেক কাজ। উনি আনমনেই বললেন, ‘‘কাজ করা ছাড়া আর কী কাজ আছে আমাদের, জয়দা?’’
কথাটা আমার শুধু কানেই বাজেনি, মনেও থেকে গিয়েছে। তাই প্রতিদিন সকালে আমার কাজ, অর্থাৎ কবিতা লেখা শেখার চেষ্টা করে যাই।
এ ছাড়া, দরিদ্র মানুষের প্রতি তাঁর এক স্বাভাবিক মমত্ববোধ দেখেছি। উনি যে ভাবে সরাসরি মানুষের কাছে চলে যেতে পারতেন, মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরেও, তার উদাহরণ তো সত্যিই কম। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলন হোক বা আরজি করের ঘটনা, উনি নিজেই আন্দোলনের স্থানে গিয়েছিলেন। আনাজের দাম বৃদ্ধি খতিয়ে দেখতে বাজারে গিয়েছেন।
আজ তিনি ক্ষমতায় নেই বলে তাঁর দলেরই অনেকে তাঁকে খারাপ কথা বলছেন। তাঁরাই খারাপ কথা বলছেন, যাঁদের প্রায় সবাইকে তিনিই হাতে করে তৈরি করেছেন। এ সব দেখে তাঁর প্রবল একাকিত্ব বুঝতে পারি। একা কিন্তু তিনি আগেও ছিলেন। কেবল নিজে বুঝতে পারেননি।
মমতা ক্ষমতায় আসার পরের বছর বঙ্গবিভূষণে সম্মানিত জয়। ছবি: আনন্দবাজার আর্কাইভ।
তাঁর দোষ বা খামতি কোথায়?
দীর্ঘদিন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকলে মাটির সঙ্গে যে-কারওর যোগাযোগ ছিন্ন হয়ে যায়। সত্যিকারের শুভানুধ্যায়ীদের সঙ্গেও যোগাযোগ ক্ষীণ হয়ে আসে। মমতারও সেটাই হল। এত দেরিতে বুঝলেন যে, আর করার কিছু রইল না।
২০০৯ সালে মহাশ্বেতাদি মমতাকে আমার সামনে পরামর্শ দিয়েছিলেন, শিল্পী-সাহিত্যিকদের সঙ্গে যেন তিন-চার মাস অন্তর একটা করে পর্যালোচনা বৈঠক হয়। কিন্তু ২০১১-র পর সে সব বন্ধ হয়ে যায়। ক্রমে তাঁর আশেপাশের বৃত্তও পাল্টাতে থাকে। শিক্ষাবিদ সুনন্দ সান্যাল, কবি তরুণ সান্যালেরা সরে গেলেন। যাঁরা রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করে সাহিত্য, চলচ্চিত্র, চিকিৎসা এই সব জগৎ নিয়ন্ত্রণে আগ্রহী, তাঁরা এলেন।
২০১৪-র পর দ্বার পুরোপুরি খুলে দেওয়া হল। যাঁরা সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম পর্বে মমতা তথা আমাদের তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন, তাঁরা এসে মমতার উচ্চ প্রশংসা দ্বারা বড় বড় পদে বসে পড়লেন। এ দিকে ক্রমশ দ্বার বন্ধ হয়ে গেল আমাদের মতো পুরনোদের। শুধু সৌজন্যমূলক যোগাযোগটুকু রইল। নেত্রী নিশ্চিন্ত রইলেন যে, সব ঠিক আছে। কিন্তু ঠিক তো সব ছিল না।
আরও পড়ুন:
গোলমালটা তা হলে কোথায়?
মানুষকে দেখার যে দৃষ্টি তাঁকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় করে তুলেছিল, সেই দৃষ্টি স্বার্থান্বেষীদের দ্বারা ক্রমশ প্রভাবিত হল। এমনকি, এঁরাই কখনও তাঁর চোখ হয়ে উঠলেন। এর থেকে বড় ট্র্যাজেডি আর কী হতে পারে?
মানুষ ভুল করে। আমিও করেছি। আরজি করের সময় চুপ ছিলাম। তখন সদ্য প্রকাশনা থেকে অবসর ঘোষণা করেছি। ২৭টি কবিতা লিখেছিলাম। কিন্তু অবসর ভেঙে প্রকাশ করিনি। আজ যদি সেগুলো প্রকাশ করি, মনে হবে বিজেপির সঙ্গে যোগাযোগ করতে চাইছি। তাই ও সব কোনও দিনই প্রকাশ হবে না। আমার সঙ্গেই চিতায় যাবে। তবে, সব বড় মানুষই ভুল থেকে শিক্ষা নেন। তাঁর ক্ষেত্রেও আশা আমি ছাড়িনি। কারণ, বড় পদে থাকাই মানবসেবার একমাত্র পথ নয়।
২০১১ সালের ডিসেম্বরে দক্ষিণ ২৪ পরগনার সংগ্রামপুরে বিষমদে মৃত্যু হয় শতাধিক মানুষের। পরের মাসে সচেতনতা-মিছিলে মমতার সঙ্গে পা মিলিয়েছিলেন জয়ও। ছবি: আনন্দবাজার আর্কাইভ।
দুর্নীতি নিয়ে কিছু বলবেন না?
সে তো চারদিকে ছড়িয়ে গেলই। নেত্রীর জীবন সাধাসিধে, কিন্তু পার্শ্বচরদের জীবন বিলাসবহুল। কারা তাঁকে ঘিরে ধরল! যত দিন গেল, এদেরই প্রভাব বাড়ল। আজ যখন তাঁকে চোর বলা হয়, আমার চোখে জল আসে। তবে আমি মনে করি, উনি কোনও দিনই নিজে চোর ছিলেন না, নিজে চোর হবেন না।
রাজ্যের স্বাস্থ্য বা চলচ্চিত্র ক্ষেত্রে ‘থ্রেট কালচার’ ছিল এক বিতর্কিত বিষয়। সম্প্রতি এক জায়গায় আপনি বলেন যে, সাহিত্যজগতেও ‘থ্রেট কালচার’ চলত। আপনি যে লেখা প্রকাশ করা বন্ধ করে দিলেন, তার পিছনে সেই হুমকি সংস্কৃতিরও একটা ভূমিকা ছিল। এর স্বরূপ কী ছিল, বলবেন? সরকার-বিরোধী কিছু লেখা যাবে না?
শুধু তৃণমূল শাসনে রাজ্যে সাহিত্যজগতে থ্রেট কালচার চলত, তা তো নয়। আমি বলেছি, বাংলা সাহিত্যজগতে থ্রেট কালচার চলত, এখনও চলছে। কলকাতা থেকে তসলিমা-বিতাড়ন (২০০৭ সালে) এই থ্রেট কালচারকে রাজনৈতিক পদ্ধতিতে প্রয়োগ করার এক দৃষ্টান্ত। তখন তৃণমূল সরকার আসেনি। তৃণমূল সরকার আসার ঠিক তিন বছরের মাথায়, যাঁরা থ্রেট কালচার চালিয়ে তরুণ কবিদের নিজেদের কথা অনুযায়ী চলতে বাধ্য করতেন, তাঁরা তৃণমূলে ঢুকে পড়ে বড় বড় পদে বসে পড়লেন। থ্রেট কালচার চলতে লাগল আগের মতোই।
এ সবে রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকা কী ছিল?
রাজনৈতিক নেতারা কতটা জানতেন, জানি না। কিন্তু তাঁরা তোষামোদেই খুশি থাকতেন। সাহিত্য অকাদেমি তো দিল্লিতে। তা তৃণমূল পরিচালিত নয়। কিন্তু যে কবিরা কলকাতার কাব্যজগতকে শাসন করতেন, তাঁরাই সাহিত্য অকাদেমিতে নিজের যোগ্যতায় পাওয়া কোনও কবির চাকরি রদ করে দিলেন। থ্রেট কালচারের দ্বিতীয় দৃষ্টান্ত। শুধু তাঁদের পক্ষে থাকলে হবে না, তাঁদের যাঁরা অপছন্দ, তাঁদের বিরুদ্ধেও থাকতে হবে। এই হচ্ছে অবস্থা।
তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রীকে জানিয়েছিলেন এ সব?
তাঁর সঙ্গে আমার কখনওই নিয়মিত যোগাযোগ ছিল না। একজন ব্যস্ত মানুষকে বিরক্ত করার কোনও অভিপ্রায়ও আমার ছিল না। তা ছাড়া, বললে সেটা নালিশ করা টাইপের ঠেকত।
এই হুমকি সংস্কৃতি দ্বারা আপনি কতটা প্রভাবিত হয়েছিলেন?
এই সংস্কৃতি আমার কেশাগ্র স্পর্শ করতে পারেনি। কারণ, গত প্রায় ৪০ বছর ধরে আনন্দবাজার পত্রিকা আমাকে অবাধ সমর্থন দিয়েছে। কিন্তু অনেক তরুণ কবির সঙ্গে আমার পরিচিতি ছিল। তাঁদের নিপীড়ন আমি দেখতাম এবং কোনও প্রতিকার করতে পারতাম না। তা ছাড়া, দেখলাম, এই পরিবেশে থাকলে নিজের রচনাকর্মের উন্নতিসাধন করতে পারব না। তাই নিজেকে সরিয়ে নিলাম মুদ্রণজগৎ থেকে।
তৃণমূল ক্ষমতায় আসার কয়েক মাস আগে। মমতার দলীয় মুখপত্রের পুজোসংখ্যা উদ্বোধনে জয়। ছবি: আনন্দবাজার আর্কাইভ।
কোনও লেখার জন্য কখনও শাসক দলের কেউ কিছু বলেছে?
২০২২ সালে বীরভূমের বগটুই গ্রামে শাসকদলের গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে ৯ জন মহিলা-সহ মোট ১০ জনের দগ্ধ হয়ে মৃত্যুর পর আমি খুব বিচলিত হয়ে কিছু কবিতা লিখি। সেই সময় নদিয়ার হাঁসখালিতেও এক কিশোরীকে ধর্ষণের ঘটনায় শাসকদলের পঞ্চায়েত নেতৃত্বের যোগ পাওয়া যায়। সেই সব লেখা নিয়ে ‘দগ্ধ’ ও ‘নিজের বিরুদ্ধে’ নামে দু’টি কবিতা পুস্তিকা প্রকাশ পায়। তার পর রাজ্যের এক মন্ত্রী, যিনি নিজে সাহিত্যিক নন, আমায় ফোন করে বলেন, ‘কী জয়দা, শুনলাম বগটুই-হাঁসখালি নিয়ে কবিতা লিখে দিদির বদনাম করছেন?’
এর পর আমি মমতাকে মেসেজ করে ঘটনাটি জানাই। উনি উত্তরে লেখেন, ‘‘জয়দা, আপনি স্বাধীন শিল্পী। আপনার যা মনে হয় লিখবেন। বিরুদ্ধে লিখতে ইচ্ছে হলে বিরুদ্ধে লিখবেন।’’ এর পর মমতা বগটুই যান এবং সেখানে গিয়ে বলেন যে বগটুই ও হাঁসখালি কাণ্ডে ‘আমাদের মুখ পুড়েছে’।
বর্তমান শাসকদল কি আপনাকে কোনও রকম চাপ দিয়েছে?
থ্রেট কালচার চলছে তো। একটি অনুষ্ঠানে আমার রবীন্দ্রনাথের কিছু কবিতা পড়ার কথা ছিল। কিছু উপার্জন করতাম। আমার তো অন্য রোজগার নেই। ইদানীং লেখাও প্রকাশ করি না। কিন্তু ওই অনুষ্ঠানের আগে হঠাৎ আমাকে জানানো হল, আমি কবিতা পড়লে সেই অনুষ্ঠান হতে দেওয়া হবে না, এমন চাপ এসেছে। তার পর আরও দু’টি একই রকম ঘটনা ঘটল। এক জায়গায় রবীন্দ্রনাথ নিয়ে বক্তৃতা, আরেক জায়গায় রবীন্দ্র কবিতার পাঠ ছিল। কিন্তু বলে দেওয়া হল, আমার বদলে অন্য যে কাউকে দিয়ে করাতে।
সেটা কি বর্তমান শাসকদলের চাপ?
উদ্যোক্তারা আমাকে তা-ই বলেছেন। তবে তাঁদের নাম পরিচয় প্রকাশ না-করতেও অনুরোধ করেছেন। সাহিত্যজগতেরই এক জন তাঁর রাজনৈতিক ক্ষমতাকে ব্যবহার করে এ সব করছেন। তিনি তসলিমাকে সংবর্ধনা দেওয়ার মঞ্চেও ছিলেন। এ সব ব্যক্তিগত স্বার্থের ব্যাপার। আমার সঙ্গে বর্তমান শাসক দলের কারও আজ অবধি একটাও কথা হয়নি। আমি তো একাধিক ইন্টারভিউতে বলেইছি যে, আমি তাঁদের ভোট দিইনি। তবে এটাও বলেছি যে, হুমকি-সংস্কৃতির কুপ্রভাব সম্পর্কে তাঁদেরও সতর্ক হওয়া উচিত, যাতে তাঁদের আমলেও নবীন কবিরা বিপন্ন না-হন। মানবেন কি না, তাঁদের ব্যাপার।
বর্তমান শাসকদল সম্পর্কে কী অভিজ্ঞতা?
তসলিমার পুনরাগমনের ব্যবস্থাপনা নিশ্চয়ই সাধুবাদযোগ্য। এর বাইরে এখনও কিছু বলার সময় আসেনি।
আজ তাঁর এই বিপর্যয়ের সময়ে মমতাকে কিছু পরামর্শ দেবেন?
না। রাজনীতি আমার জায়গা নয়। রাজনীতি নিয়ে তাঁকে আমি কোনও পরামর্শ বা উপদেশ দেব না। সে ধৃষ্টতা আমার নেই।
মমতার সঙ্গে দেখা করতে যাবেন?
আগেও তো কোনও দিন তাঁর বাড়ি যাইনি। এখনও যাওয়ার প্রশ্ন আসছে না। ব্যক্তিগত ভাবে মমতার প্রতি ভালবাসা আমার অটুট। আসলে, এই নারীর একা লড়াই, সর্বোচ্চ পদে উত্থান, মানুষের ভালবাসা পাওয়া, এবং তা থেকে এমন সর্বাঙ্গীন পতন, এ আমি আর কোথাও দেখিনি। তাঁর দুর্দশায় আমি দুঃখ পাই। ভুল লোককে ভরসা করা তাঁর সবচেয়ে বড় ভুল। তা বলে আমি তাঁকে সহানুভূতি জানাতে যাব না। তা হলে তাঁকে অসম্মান করা হয়। বিরলে দুঃখ পাই। বিরলেই পাব।
(শেষ)