পুজো এসেছে। চার দিকে উৎসবের আলো। কিন্তু বেলেঘাটার ৯৫ বস্তির দাস পরিবারে আনন্দ নেই। ছ’মাস কেটে গিয়েছে। এখনও বাড়ি ফেরেনি ১৫ বছরের প্রীতম। গত ২১ এপ্রিল বাড়ি থেকে বেরোনোর সময়ে মাকে বলেছিল, ‘‘পড়তে যাচ্ছি।’’ তার পরে আর খোঁজ নেই। ছেলের ফিরে আসার অপেক্ষায় দিন গুনছেন তাঁরা। ছেলেকে কাছে না পেয়ে উৎসবের আনন্দে মনই বসছে না কারও।
প্রীতম বেলেঘাটার দেশবন্ধু উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র। সে দিন পড়তে যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল সে। তার পরে আর ফেরেনি। খোঁজখবর শুরু করেন পরিবারের লোকজন। বেলেঘাটা থানায় নিখোঁজ ডায়েরি করা হয়। পরে অপহরণের মামলা রুজু করে তদন্ত শুরু করে পুলিশ। কিন্তু ছ’মাস পরেও ওই কিশোরের সন্ধান মেলেনি।
মা বুলা দাসের কাছে এখন প্রতিটি দিনই অপেক্ষার। পুজোর সময়ে ছেলে বাড়ি না থাকায় এ বার সব কিছুই যেন অর্থহীন। বুলার কথায়, ‘‘ছ’মাস হয়ে গেল, ছেলেটার কোনও খোঁজ পেলাম না। ওর জন্মদিন গেল, পুজো এসেছে, কিন্তু আমার ছেলে কোথায়?” তিনি জানান, গত ষষ্ঠীতে সন্তানের মঙ্গল কামনায় পুজো করতে পারেননি। কারণ, ওই দিন সিমুই খেতে পছন্দ করে প্রীতম। কিন্তু ছেলের জন্য প্রিয় খাবার রান্না করা, তার সঙ্গে গল্প করা— সবই যেন হারিয়ে গিয়েছে বুলার জীবন থেকে।
প্রীতমের দিদিও ভাইয়ের ফেরার অপেক্ষায়। তাঁর কথায়, ‘‘ভাইয়ের সঙ্গে প্রত্যেক বছর ঠাকুর দেখতে যেতাম। খুব মনে পড়ছে সেই দিনগুলো। এ বার নতুন জামাও কেনা হয়নি। শুধু চাই, ও ফিরে আসুক।’’ পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে গত মাসে বেলেঘাটা থানায় গিয়েছিলেন পাড়ার লোকেরাও। কিন্তু তাঁদের অভিযোগ, থানা থেকে আশ্বাস ছাড়া আর কিছুই মেলেনি। ছ’মাস ধরে ছেলের খোঁজ না মেলায় পরিবারের উৎকণ্ঠা ক্রমশ বাড়ছে। পাড়ার লোকেদেরও প্রশ্ন, কবে মিলবে প্রীতমের সন্ধান?
এ দিকে, প্রীতমের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনার তদন্তভার নিয়েছে লালবাজারের মানব পাচার-বিরোধী শাখা। লালবাজার সূত্রের খবর, তদন্ত চলছে। প্রীতমের খোঁজ পেতে সমস্ত হোমে চিঠি পাঠানো হয়েছে। পুলিশের বক্তব্য, ওই কিশোরকে খুঁজে পেতে চেষ্টায় কোনও ত্রুটি রাখছে না তারা। যদিও পরিবারের অভিযোগ, প্রথমে নির্বাচন, তার পরে পুজো— বিভিন্ন অজুহাতে দিনের পর দিন পুলিশ নিষ্ক্রিয় থেকেছে। যার ফলে ছ’মাস কেটে গেলেও প্রীতমের খোঁজ মেলেনি। বুলা বলেন, ‘‘আরও কতগুলো উৎসব ওকে ছাড়া কাটাতে হবে, তা আমরা জানি না। ছেলেটা ফিরবে তো? সেটাই জানতে চাই ।’’
গোটা শহর যখন পুজোর আনন্দে মেতে উঠেছে, প্রীতমের পরিবারের দিন কাটছে একটাই আশায়— কোনও এক দিন ফিরে আসবে সে। সে দিনই বাড়িতে উৎসব হবে। তার আগে নয়!