ব্যস্ত দমদম স্টেশন। একের পর এক ট্রেনের আসা-যাওয়া, মাইকে ঘোষণা, যাত্রীদের ভিড়। আর সেই কোলাহলের মধ্যেই রোজ বই-খাতা খুলে পড়তে বসে পাঁচ বছরের দীপ। পাশে বসে ভিক্ষা করতে করতেই ছেলের পড়াশোনার তদারকি করেন তার মা সোমা দাস। পথচলতি মানুষের দেওয়া সামান্য টাকাতেই চলে সংসার। তবু অভাবকে ছেলের পড়াশোনার পথে বাধা হতে দিতে চান না মা। দীপেরও স্বপ্ন স্পষ্ট। বড় হয়ে সে শিক্ষক হতে চায়।
রিষড়ার বাসিন্দা সোমার জীবনে বিপর্যয় নেমে আসে স্বামী বাপি দাস ব্রেন স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার পরে। একটি মুদিখানার দোকানে কাজ করতেন বাপি। তাঁর আয়েই সংসার চলত। যদিও বাপির অসুস্থতার পরে সেই রোজগার বন্ধ হয়ে যায়। সোমার অভিযোগ, শ্বশুরবাড়ির সম্পত্তিরও কোনও ভাগ পাননি তিনি। তাই বাধ্য হয়েই দমদম স্টেশনে ভিক্ষা করে দুই সন্তানকে মানুষ করার লড়াই শুরু করেন। বড় মেয়ে সুস্মিতা দাস স্থানীয় একটি স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী। পড়াশোনার সুবিধার জন্য সে এখন ছোট মাসির বাড়িতে থাকে। কিন্তু ছোট ছেলে দীপ প্রতিদিন মায়ের সঙ্গেই স্টেশনে আসে। দিনের বেশির ভাগ সময় স্টেশন চত্বরে কাটিয়ে সন্ধ্যায় মায়ের সঙ্গেই বাড়ি ফেরে সে।
বর্তমানে শহরে হকার উচ্ছেদের পাশাপাশি স্টেশন চত্বর থেকে ভিক্ষাজীবীদের সরানো নিয়েও প্রশাসনিক তৎপরতা বেড়েছে। সেই আবহে ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রবল দুশ্চিন্তায় সোমা। তাঁর কথায়, “ভয়ে ভয়ে রোজ বসি এখানে। ছেলেটা সঙ্গে থাকে বলেই এখনও পুলিশ একটু নরম ব্যবহার করে।” অনিশ্চয়তার মাঝেও ছেলের পড়াশোনা যাতে বন্ধ না হয়, সেই চেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
দমদম স্টেশন এলাকায় দীর্ঘ দিন ধরেই দুঃস্থ মেয়েদের পড়ান সমাজকর্মী কান্তা চক্রবর্তী। দীপের কথা বলতে গিয়ে তিনি বললেন, “ভবিষ্যতে যদি পরিকাঠামো তৈরি করতে পারি, তা হলে এমন শিশুদেরও দায়িত্ব নিতে চাই।” দীপের পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ নজর এড়ায় না নিত্যযাত্রীদেরও। অফিস যাওয়ার পথে এক ব্যক্তি নিয়মিত খাতা-কলম দিয়ে যান তাকে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই নিত্যযাত্রীর কথায়, “ওকে এখানে নিয়মিত পড়তে দেখি। বিশেষ কিছু করার সামর্থ্য নেই। এটুকুতে যদি ওর পড়াশোনায় সামান্য সাহায্যও হয়, সেটাই বড় প্রাপ্তি।” স্টেশনের কোলাহল, অনিশ্চিত জীবন আর প্রতিদিনের সংগ্রামের মাঝেও দীপের চোখে ভবিষ্যতের স্বপ্ন অটুট। ছোট্ট গলায় সে বলে, “বড় হয়ে টিচার হব। এখানে আর বসতে হবে না।”