কারও জ্বর তীব্রতর। কারও আবার ঘুসঘুসে। দু’-তিন দিনে তা সারলেও কাশির দমক কমতে অন্তত কয়েক সপ্তাহ পার হয়ে যাচ্ছে। সঙ্গে দোসর প্রবল ক্লান্তি। বেশ কয়েক দিন ধরে ঘরে ঘরে অনেকেই এ হেন সমস্যায় আক্রান্ত। নেপথ্যে কি নতুন ভাইরাসের প্রকোপ? চিকিৎসকেরা জানাচ্ছেন, নতুন কিছু নয়। বরং পুরনো ও পরিচিত ভাইরাসের বাড়বাড়ন্তেই কাবু অনেকে। হাঁচি বা কাশির ড্রপলেটের মাধ্যমেও তা ব্যাপক হারে ছড়াচ্ছে।
শহরের সরকারি থেকে বেসরকারি হাসপাতালের বহির্বিভাগে প্রতিনিয়ত বাড়ছে জ্বর, কাশিতে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। সংক্রামক রোগের চিকিৎসকেরা জানাচ্ছেন, এই ভাইরাসের প্রকোপ পুরোপুরি শ্বাসবাহিত। উপসর্গও একেবারেই ফ্লু-এর মতোই। তবে, অধিকাংশের ক্ষেত্রে বাড়িতেই চিকিৎসা করা সম্ভব হচ্ছে। যাঁদের রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা কিছুটা কমছে এবং শ্বাসকষ্ট থাকছে, তাঁদেরই হাসপাতালে ভর্তি করাতে হচ্ছে। কোমর্বিডিটিতে আক্রান্তদের ক্ষেত্রেও বাড়তি সতর্কতার প্রয়োজন হচ্ছে। চিকিৎসকেরা জানাচ্ছেন, হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের ভাইরাল প্যানেল পরীক্ষায় বেশির ভাগেরই ইনফ্লুয়েঞ্জা পজ়িটিভ আসছে। কিছু ক্ষেত্রে করোনাভাইরাসের উপস্থিতিও মিলছে।
চিকিৎসকেরা জানান, কারও তীব্র জ্বর আসছে। কারও তাপমাত্রা তেমন থাকছে না। বদলে গা-হাত-পা ব্যথা। জ্বর দু’-তিন দিনে কমলেও কাশি ও প্রবল ক্লান্তি কমতে অন্তত দু’সপ্তাহ লাগছে। পাশাপাশি, কারও ক্ষেত্রে পেটের সমস্যা, বমি ভাব, গলা ব্যথাও হচ্ছে। ইন্টারনাল মেডিসিনের চিকিৎসক নারায়ণ বন্দ্যোপাধ্যায় জানাচ্ছেন, মারাত্মক গরমে দরদর করে ঘাম হচ্ছে। কিছু পরেই বৃষ্টিতে ভিজে বা তাপমাত্রা কমে ঠান্ডা লেগে বিপত্তি হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘‘জ্বরের ওষুধ ও অ্যান্টি-অ্যালার্জিক ছাড়া অন্য ওষুধ সে ভাবে কাজে লাগছে না। কিছু ক্ষেত্রে স্টেরয়েড ইনহেলার দিতে হচ্ছে। তবে, পুরোটাই চিকিৎসকের পরামর্শে করতে হবে।’’
জনস্বাস্থ্য চিকিৎসকেরা জানাচ্ছেন, বেশ কয়েক দিন ধরে বার বার গরম ও বৃষ্টির কারণে আর্দ্রতার মারাত্মক তারতম্য ঘটছে। এটাই ভাইরাসের বংশবৃদ্ধির উপযুক্ত সময়। সেই কারণেই বাতাসে ভাইরাসের বাড়বাড়ন্ত হচ্ছে। আবার, রাজ্য প্রাণী ও মৎস্য বিজ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজির বিভাগীয় প্রধান তথা ভাইরাস বিষয়ক গবেষক সিদ্ধার্থ জোয়ারদারের ব্যাখ্যা, তাপমাত্রার চূড়ান্ত তারতম্য এবং স্যাঁতসেঁতে জোলো আবহাওয়া মানুষের স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় কার্যকলাপের উপরে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এর জেরে শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়। তাতে শরীরের প্রতিরোধী কোষ (নিউট্রোফিল, ম্যাক্রোফেজ় ও লিম্ফোসাইট) এবং অ্যান্টিবডির উৎপাদন ও কার্যক্ষমতা কমে যায়। সেই সুযোগে সহজেই বাতাসে থাকা ভাইরাস শরীরকে আক্রমণ করে।
শুধু বয়স্কেরাই নন, অনেক বাচ্চাও ভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছে বলে জানাচ্ছেন ইনস্টিটিউট অব চাইল্ড হেল্থের অধ্যক্ষ-চিকিৎসক জয়দেব রায়। তিনি বলেন, ‘‘বড়দের জ্বর কমলেও বাচ্চাদের ক্ষেত্রে ওষুধ দিয়েও তাপমাত্রা সহজে কমছে না। বাড়ির বয়স্কেরা আক্রান্ত হওয়ার পরে বাচ্চারাও সংক্রমিত হচ্ছে।’’ তিনি জানাচ্ছেন, ইনফ্লুয়েঞ্জা বেশি সংখ্যক পাওয়া গেলেও মিশ্র ভাইরাসের প্রকোপ রয়েছে। তবে, চার-পাঁচ দিন কেটে যাওয়ার পরেও জ্বরের প্রকোপ না কমলে নেপথ্যে ডেঙ্গি লুকিয়ে রয়েছে কিনা, তা পরীক্ষা করে দেখা প্রয়োজন বলেও জানাচ্ছেন জয়দেব। তাঁর কথায়, ‘‘তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই উপসর্গ দেখে প্রথম থেকেই ফ্লুয়ের চিকিৎসা শুরু করা হচ্ছে। তাতে কাজও হচ্ছে।’’