বিসর্জনে না শোনা গেল ঢাকের বোল, না বাজল ব্যান্ড। প্রতিমা নিয়ে শোভাযাত্রা হল, তবে সম্পূর্ণ অনাড়ম্বর ভাবে। এলাকার কয়েকশো পুরুষ-মহিলা-পড়ুয়া সেই শোভাযাত্রায় হাঁটলেন নীরবে। তাঁদের হাতে ধরা থাকল শুধু একটি করে জ্বলন্ত মোমবাতি।
বুধবার, দশমীর রাতে এমনই ব্যতিক্রমী ছবি দেখা গেল হাওড়ার দাশনগর এলাকার একটি বারোয়ারি পুজোয়। উদ্যোক্তাদের বক্তব্য, গত ১৭ অক্টোবর কলকাতার চোরবাগান সর্বজনীনে ঠাকুর দেখতে গিয়ে পদপিষ্ট হয়ে যে ১৯ জনের প্রাণ চলে গিয়েছে, তাঁদের আর ফেরানো যাবে না ঠিকই। কিন্তু তাঁদের শোকার্ত পরিবারের পাশে থাকার বার্তা তো দেওয়া যাবে। সেই ভাবনা থেকেই তাঁরা জাঁকজমক বন্ধ রেখে বিসর্জনে মৌন শোভাযাত্রা করেছেন।
কাশীপুর তরুণ দল নামে ওই পুজোর সভাপতি নীলু রায় বলেন, ‘‘মণ্ডপ থেকে মোমবাতি নিয়ে কাশীপুর স্নানের ঘাট পর্যন্ত নিরঞ্জনের শোভাযাত্রায় কেউ পরস্পরের সঙ্গে কথা বলেননি। চোরবাগানে যে ভাবে ১৯ জন মারা গেলেন, তাঁদের শ্রদ্ধা জানাতেই আমাদের এমন উদ্যোগ।’’
জানা গিয়েছে, প্রথম সপ্তমীর রাতে ঘটে যাওয়া ওই মর্মান্তিক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে এ বার হাওড়ার অধিকাংশ মণ্ডপে মাইক বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। কয়েকটি মণ্ডপে মাইক বাজলেও তা বেজেছে মৃদু স্বরে। দশমীতে বিসর্জনেও দেখা গিয়েছে অভূতপূর্ব শৃঙ্খলা। জেলা প্রশাসনের নির্দেশ মেনে ডিজে যেমন বাজেনি, তেমনই বিসর্জনের দিন অন্য বছর যে উচ্ছৃঙ্খলতার ছবি দেখা যায়, এ বার তা-ও চোখে পড়েনি। হাওড়ায় বিসর্জনের মূল দু’টি ঘাট— রামকৃষ্ণপুর ও শিবপুর ঘাটের অনেক আগেই ফোরশোর রোডে শোভাযাত্রা থামিয়ে দেওয়া হয়েছে। সেখান থেকে একে একে প্রতিমা ঘাটে এনে স্বেচ্ছাসেবকদের সহায়তায় ট্রলিতে বসিয়ে বিসর্জন দেওয়া হয়েছে। বিসর্জনের পরে পুরসভার কর্মীরা গঙ্গা থেকে প্রতিমার কাঠামো তুলে লরিতে অন্যত্র পাঠানোর ব্যবস্থা করেছেন।
পুলিশের দাবি, এই ব্যবস্থাপনায় বিসর্জনে কোনও যানজট হয়নি। হয়নি গোলমালও। বুধবার বিসর্জন-পর্ব নির্বিঘ্নে মেটাতে সারা রাত গঙ্গার ঘাটে ছিলেন রাজ্যের পুর প্রতিমন্ত্রী উমেশ রাই, পুর কমিশনার তেজস্বী রানা-সহ হাওড়া সিটি পুলিশের উপ-নগরপাল ও সহকারী নগরপাল পদমর্যাদার অফিসারেরা এবং প্রায় ৭০০ পুলিশকর্মী।
হাওড়া পুরসভা সূত্রে জানা গিয়েছে, বুধবার রামকৃষ্ণপুর ও শিবপুর ঘাট মিলিয়ে প্রায় সাড়ে তিনশো প্রতিমা বিসর্জন হয়েছে। এখনও বাকি এক হাজারের কাছাকাছি প্রতিমা। সেগুলি কাল, শনিবারের মধ্যে বিসর্জন দেওয়া হবে। হাওড়া সিটি পুলিশের ডিসি (সদর) চন্দন ঘোষ বলেন, ‘‘পুরো প্রক্রিয়া সুষ্ঠু ভাবে মেটাতে ঘাটগুলিতে পর্যাপ্ত আলো লাগানো হয়েছে। গঙ্গায় জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীর ৪০ জন কর্মী-সহ চারটি স্পিডবোট টহল দিচ্ছে। তাঁদের সঙ্গে রয়েছেন অসামরিক প্রতিরক্ষা দফতরের কর্মীরা এবং সাড়ে সাতশো অস্থায়ী হোমগার্ড।’’