Advertisement
E-Paper

রান্নাঘরেই স্নান, মশলার পাত্র খোলা পড়ে! খাদ্যবিধি নিয়ে শহর জুড়ে অভিযানের মাঝে কী ছবি সরকারি হাসপাতালের

ইদানীং গোটা রাজ্যে হোটেল-রেস্তরাঁর ‘স্বাস্থ্য পরীক্ষায়’ নেমেছে সরকার। চলতি মাসের গোড়ায় সাত দিনের অভিযানে ‘রোগ’ ধরা পড়েছে বিস্তর। বিরিয়ানি, পিৎজ়া থেকে মিষ্টি, রাস্তার ছোট দোকান থেকে শুরু করে অভিজাত এলাকার নামী বিপণি— অনেকেই ‘অসুস্থ’।

সৌরভ দত্ত

শেষ আপডেট: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৯:৪৪

গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

আরজি কর মেডিক্যাল কলেজের রান্নাঘর। প্রশাসনিক কার্যালয় থেকে ঢিল ছোড়া দূরত্বে। প্রতিদিন সকাল-বিকেল প্রায় দু’হাজার রোগীর জন্য রান্না হয় এখানে। রান্নঘরে ঢোকার অপরিচ্ছন্ন গলিপথে পড়ে রয়েছে রান্নার বাসন, আলুর বস্তা। ভিতরের অবস্থাও তথৈবচ! রান্নাঘরের ভিতরের কলেই স্নান করছেন রাঁধুনিরা। দড়িতে শুকোচ্ছে তাঁদের জামাকাপড়। মরচে পড়া, তেলের চিটে ধরা র‌্যাকে মুখখোলা প্যাকেটে রাখা গুঁড়ো মশলা। ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে ঘুরে খাবার দেওয়া ট্রলি হরেক ব্যাকটেরিয়া গায়ে মেখে সরাসরি ঢুকে যাচ্ছে রান্নাঘরে। ঘরের অন্য দিকের সরু গলিপথে আবার চলছে নির্মাণকাজ। উড়ছে সিমেন্ট-বালির ধুলো। শিকেয় স্বাস্থ্যবিধি।

ইদানীং গোটা রাজ্যে হোটেল-রেস্তরাঁর ‘স্বাস্থ্য পরীক্ষায়’ নেমেছে সরকার। চলতি মাসের গোড়ায় সাত দিনের অভিযানে ‘রোগ’ ধরা পড়েছে বিস্তর। বিরিয়ানি, পিৎজ়া থেকে মিষ্টি, রাস্তার ছোট দোকান থেকে শুরু করে অভিজাত এলাকার নামী বিপণি— অনেকেই ‘অসুস্থ’। তাদের কারও কারও দরজা পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কাউকে কাউকে পক্ষকালের মধ্যে অসুখ সারানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। হোটেল-রেস্তরাঁর বিরুদ্ধে এহেন কড়া ব্যবস্থায় ক্রেতারা খুশি। আরও কড়া শাস্তি দেওয়া হল না কেন, প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। আরজি কর হাসপাতালের ছবিটা আরও জরুরি একটা প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে। সরকারি হাসপাতালের রান্নাঘরেও একই রকম কড়া নজরদারি নেই কেন?

ইতিমধ্যে কলকাতা শহরের ৪০টি খাদ্যবিপণির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে কলকাতা পুরসভা। গত বুধবার প্রকাশিত সেই তালিকায় চোখ বোলালে দেখা যাচ্ছে, এদের মধ্যে ৩৫টির বিরুদ্ধেই অভিযোগ স্বাস্থ্যবিধি না মানা এবং যথাযথ পরিচ্ছন্নতা বজায় না রাখা। অপরিষ্কার ভাবে রান্নার বাসনপত্র এবং খোলা জায়গায় মশলা ইত্যাদি উপকরণ রাখার জন্য সরকারি পরিদর্শকের ধমক খাচ্ছেন রেস্তরাঁর কর্মীরা, এমন ছবি দেখা গিয়েছে সংবাদমাধ্যমের পর্দায়। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খাবার তৈরির সময় পরিচ্ছন্নতার দিকে এমন কড়া নজরই রাখা উচিত। কিন্তু সরকারি হাসপাতালের ক্ষেত্রে এক যাত্রায় পৃথক ফল কেন?

আরজি করে রোগীদের রান্নাঘর‌ই রাঁধুনিদের স্নানঘর।

আরজি করে রোগীদের রান্নাঘর‌ই রাঁধুনিদের স্নানঘর। —নিজস্ব চিত্র।

আরজি কর ব্যতিক্রম নয়। একই ছবি নীলরতন সরকার মেডিক্যাল কলেজে। এই হাসপাতালের রান্নাঘরে মোট সাতটি গ্যাসস্টোভ রয়েছে। ভাত, ডাল, সব্জি, মাছ, মাংস, চায়ের জন্য আলাদা আলাদা। সারি দেওয়া স্টোভগুলির শেষটির পাশেই রান্নাঘরের নিকাশিনালা। বৃহস্পতিবার বিকেলে গিয়ে দেখা গেল, আবর্জনার স্তূপ পড়ে সেই নালা কার্যত খোলা ড্রেনের চেহারা নিয়েছে। ‘‘পরিষ্কার হবে,’’ বলছেন রান্নাঘরের ম্যানেজার প্রসেনজিৎ ঘোষ। এত নোংরায় ইঁদুর, আরশোলার উপদ্রবের ভয় আছে তো? ‘‘না, না। নালায় জাল দেওয়া আছে। আমাদের রান্নাঘরে আরশোলা, ইঁদুর পাবেন না।’’ তেলচিটে ময়লা জমেছে রান্নাঘরের মেঝেতে। তার উপরেই পড়ে শিলনোড়া। প্রসেনজিৎ বলেন, ‘‘আমরা শিলনোড়ায় মশলা বাটি না। ওটা এমনি পড়ে রয়েছে।’’

রাতের খাবারের রুটি তৈরির জন্য আটা মাখছিলেন যিনি, তাঁর মাথায় ক্যাপ নেই। গায়ে জামাও নেই। ‘‘এই তো ড্রেস পরে নিচ্ছে!’’ তড়িঘড়ি বললেন ম্যানেজার। এখানেও আরজি করের মতোই খোলা পড়ে রয়েছে গুঁড়ো হলুদ। শহরের হোটেল-রেস্তরাঁয় গিয়ে হলুদের প্যাকেটে মেয়াদ ফুরোনোর তারিখ লেখা নেই কেন, প্রশ্ন তুলেছিলেন পুরসভার আধিকারিকেরা। সরকারি হাসপাতালে এই নজরদারি কে করবে?

প্রসেনজিতের দাবি, কলকাতা পুরসভা এবং স্বাস্থ্য দফতরের লোক এসে তাঁদের রান্নাঘরের স্বাস্থ্যপরীক্ষা করে গিয়েছেন। একই দাবি আরজি করে রান্নাঘরের দায়িত্বে থাকা কর্মীরও। স্বাস্থ্য দফতরের রিপোর্টে অবশ্য সেই পরিদর্শনের উল্লেখ নেই।

এন‌আর‌এসে স্বাস্থ্যবিধি শিকেয় তুলে রোগীদের জন্য রুটি বানানো হচ্ছে।

এন‌আর‌এসে স্বাস্থ্যবিধি শিকেয় তুলে রোগীদের জন্য রুটি বানানো হচ্ছে। —নিজস্ব চিত্র।

ক্যালকাটা ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজের রান্নাঘরের স্বাস্থ্য তুলনায় ভাল। রান্নাঘরের মেঝে মোটের উপর পরিষ্কার। রান্নার বাসন, মশলা রাখার পাত্রে চিটচিটে কালো আস্তরণ নেই। রান্নাঘরের ম্যানেজার গোলাম বারিক বললেন, ‘‘সপ্তাহ দুয়েক আগে সাত নম্বর বোরো থেকে এসে রান্নার সামগ্রীর নমুনা সংগ্রহ করে নিয়ে গিয়েছে।’’ সেই রিপোর্ট এখনও আসেনি।

নতুন সরকার আসার পরে সরকারি হাসপাতালের রোগীদের খাবারের জন্য বরাদ্দ অনেকটাই বেড়েছে। ২০১৭ সাল থেকে বরাদ্দ ছিল ৫৬ টাকা ৪০ পয়সা। গত বাজেটে সেটা ১১০ টাকা করার কথা বলা হয়েছে। সেই মতো রোগীদের খাবার দেওয়া হচ্ছে কি না, তা দেখতে একাধিক হাসপাতাল পরিদর্শন করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায়। খাবার খেয়ে অসন্তোষও প্রকাশ করেছেন কোথাও কোথাও। শহরের দুই নামজাদা হাসপাতালের রান্নাঘরের দুর্দশা রোগীর খাবারের গুণমান নিয়ে দুশ্চিন্তা বাড়াচ্ছে।

খাদ্যের গুণমান সুনিশ্চিত করার প্রশ্নে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ, বলছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ কাজলকৃষ্ণ বণিক। তাঁর মতে, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, খাদ্য প্রস্তুত, খাদ্য সরবরাহের সঙ্গে যাঁরা যুক্ত তাঁদের পরিষ্কার, পরিচ্ছন্ন থাকা জরুরি। দ্বিতীয়ত, কোথায়, কী ভাবে খাবার তৈরি হচ্ছে, শাকসব্জি, মাছ, মাংস, ডিম, চাল, ইত্যাদি নিয়ম মেনে সংরক্ষণ করা হয়েছে কি না তা দেখতে হবে। এর পর যিনি খাবার দিচ্ছেন তিনি পরিচ্ছন্নতা রক্ষা করছেন কি না, যে পাত্রে খাবার দিচ্ছেন, সেগুলি জীবাণুমুক্ত রয়েছে কি না, সেই বিষয়গুলিও গুরুত্বপূর্ণ। ‘‘হাসপাতালের ক্ষেত্রে এই সব মাপকাঠি মেনে চলার প্রশ্নে আরও সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন। হাসপাতালে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাবার তৈরি হলে রোগীদের জন্য তা বিপজ্জনক। তাঁদের আরও বেশি ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা,’’ বলেন কাজলবাবু।

ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজের রান্নাঘর।

ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজের রান্নাঘর। —নিজস্ব চিত্র।

রান্নাঘরের পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়েই দেখা হচ্ছে বলে দাবি করছেন আরজি কর হাসপাতালের এমএসভিপি সপ্তর্ষি চট্টোপাধ্যায়। তিনি বলেন, ‘‘স্বাস্থ্য দফতরের তরফে এ নিয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশও এসেছে। আমরা সেই সকল নির্দেশ মেনে চলছি। তবে এত দিনের অভ্যাস বদলাতে একটু সময় লাগবে।’’

বেসরকারি হোটেল-রেস্তরাঁর রান্নাঘরের রোগ সারাতে পনেরো দিন সময় দিয়েছে কলকাতা পুরসভা। সরকারি হাসপাতাল সুস্থ হবে কত দিনে?

Government hospitals Kolkata Hospitals Hand Hygiene

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy