Advertisement
E-Paper

এ বার নিউ মার্কেটের হোটেলে আগুন, মৃত ৯! দমকলের সদর দফতরের পাশেই অনিয়মের বন্যা, প্রাপ্তি শুধু রাজনীতির চাপানউতর

একটা বাড়িতেই একাধিক হোটেল ও গেস্ট হাউস। তিনতলায় এগারোশো বর্গফুট জায়গা নিয়ে ‘শিখা ইন’। দু’কামরা ফ্ল্যাটের সমান জায়গায় খুপরি পাঁচটা ঘর। ঘরগুলোর ভেতরটা যতটা সাজানো-গোছানো—বাইরেটা ততটা নয়।

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ২০ অগস্ট ২০২৬ ০০:০৭
নিউ মার্কেটের মির্জা গালিব স্ট্রিটের ঘিঞ্জি বিল্ডিংয়ে আগুন লাগে মঙ্গলবার গভীর রাতে।

নিউ মার্কেটের মির্জা গালিব স্ট্রিটের ঘিঞ্জি বিল্ডিংয়ে আগুন লাগে মঙ্গলবার গভীর রাতে। ছবি: পিটিআই।

রবিবার ভোররাতে তারাপীঠ। মঙ্গলবার শেষরাতে নিউ মার্কেট। ৪৫ ঘণ্টার ব্যবধানে দুই হোটেলের অগ্নিকাণ্ডে মোট ১৮টি প্রাণ চলে গেল। তারাপীঠের ‘বিদেশিনী’ হোটেলে আগুন লাগার পরে তৃণমূল জমানার গাফিলতিকে দুষেছিল সদ্য ক্ষমতায় আসা বিজেপি। নিউ মার্কেটের ‘শিখা ইন’-এর ঘটনার পরে অভিযোগের তির আরও তীক্ষ্ণ হয়েছে। দু’জায়গাতেই দেখা গিয়েছে, গলদ এবং গাফিলতি বিস্তর। বস্তুত, সব অগ্নিকাণ্ডের পরেই এমন সব ফাঁকফোকর ধরা পড়ে। ছিদ্রগুলি এতই বড় যে, আগে প্রশাসনের নজরে না-আসাটা বিস্ময়ের। কিন্তু সেই দায় প্রায় কেউই কখনও নেন না। রাজনীতির চাপানউতরে দু’দিন বাদে চাপা পড়ে যায় সব। আবার একটা বিপর্যয়ের অপেক্ষায় থাকি আমরা।

মঙ্গলবার রাত দেড়টা থেকে দু’টোর মধ্যে মির্জ়া গালিব স্ট্রিটের হোটেলটিতে আগুন লাগে। হোটেল বলতে সাধারণ ভাবে আমরা যা বুঝি, ‘শিখা ইন’ আদৌ তা নয়। চারতলা ঘিঞ্জি একটা বাড়ি। একটা বাড়িতেই একাধিক হোটেল ও গেস্ট হাউস। তিনতলায় এগারোশো বর্গফুট জায়গা নিয়ে ‘শিখা ইন’। দু’কামরা ফ্ল্যাটের সমান জায়গায় খুপরি পাঁচটা ঘর। ঘরগুলোর ভেতরটা যতটা সাজানো-গোছানো—কোনও কোনও ক্ষেত্রে শীততাপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র লাগানো, লাগোয়া স্নানঘর—বাইরেটা ততটা নয়। একচিলতে সরু সিঁড়ি। ঢোকা-বেরোনোর একটাই দরজা, তা-ও তেমন প্রশস্ত নয়। নিউ মার্কেট লাগোয়া এলাকায় এমন হোটেল অজস্র। শহরে চিকিৎসার জন্য আসা রোগী ও তাঁদের আত্মীয়রাই মূলত এই সব হোটেলে ওঠেন। বেশির ভাগই বাংলাদেশ থেকে আসা।

নিউ মার্কেট এলাকায় দমকলের ইঞ্জিন। বুধবার।

নিউ মার্কেট এলাকায় দমকলের ইঞ্জিন। বুধবার। ছবি: পিটিআই।

মঙ্গলবারের আগুনে যে ৯ জন মারা গিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে অন্তত পাঁচ জন বাংলাদেশি। ‘শিখা ইন’-এ আবাসিক ছিলেন মোট দশ জন। তাঁদেরই আট জন মারা গিয়েছেন। নবম জন ওই হোটেলের কর্মী। শিশুপুত্র এবং শ্বশুরের চিকিৎসা করাতে কুষ্টিয়া থেকে এসেছিলেন ‘আজকের পত্রিকা’র সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত। তিনি, তাঁর স্ত্রী, পুত্র এবং শ্বশুর—কেউ বাঁচেননি। পঞ্চম ব্যক্তি ঢাকার বাসিন্দা। তিন মাস আগে এই হোটেলে কাজ নিয়ে ঝাড়খণ্ড থেকে আসা ১৯ বছরের সন্দীপ পাসোয়ানের দেহ মিলেছে রিসেপশন থেকে। ৬৮ বছরের যোগনারায়ণ অগ্রবাল এসেছিলেন শিলিগুড়ি থেকে। বাকি দুই মৃতের পরিচয় এখনও জানা যায়নি। সকলেই মারা গিয়েছেন ধোঁয়ায় দমবন্ধ হয়ে।

জানলা ভেঙে কার্নিশে দাঁড়িয়ে প্রাণ বাঁচিয়েছেন এক দম্পতি। কোনওমতে বেঁচেছেন বাড়ির অন্য বাসিন্দারাও। মঙ্গলবার রাতে রামপুরহাট থেকে এসে চারতলার একটি গেস্ট হাউসে উঠেছিলেন দুই বন্ধু। তাঁদের এক জন, ইজাজ আহমেদ জানান, খাওয়াদাওয়া সেরে রাত সাড়ে বারোটা নাগাদ তাঁরা ঘুমোতে যান। রাত সওয়া দু’টো নাগাদ দুই মহিলার চিৎকারে ঘুম ভাঙে। দরজা খুলতেই গোটা ঘর ধোঁয়ায় ভরে যায়। ‘‘ঘরের সামনে খুব সরু একটা বারান্দা। সেটা ধোঁয়ায় ঢেকে গিয়েছিল’’, বলেন তিনি। একই অভিজ্ঞতা বাড়ির অন্য এক আবাসিকের। তাঁর কথায়, ‘‘ধোঁয়ায় দম বন্ধ হয়ে আসছিল। কোন দিক দিয়ে বেরোব, তা-ও বুঝতে পারছিলাম না ধোঁয়ার জন্যই। দমকলকর্মীরা না-এলে আমরাও হয়তো মারা যেতাম।’’

শহরের প্রাণকেন্দ্রে এমন জতুগৃহ-সদৃশ একের পর এক ‘হোটেল’ কী ভাবে গড়ে উঠল, সেই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। প্রশাসনের নজরদারি কোথায় ছিল, সেই প্রশ্নও উঠছে। ‘শিখা ইন’ থেকে কলকাতা পুরসভার সদর দফতরের দূরত্ব বড়জোর এক কিলোমিটার। নিউ মার্কেট থানা আরও কাছে। আর দমকলের সদর দফতর তো একটা বাড়ি পরে। দমকল কর্তারা এই রাস্তা দিয়েই যাতায়াত করেন। এক বাড়িতে একগুচ্ছ হোটেল, সঙ্কীর্ণ প্রবেশপথ কি তাঁদের কারও চোখে কখনও পড়েনি? বিধানসভা ভোটের আগে কংগ্রেস ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেওয়া সন্তোষ পাঠকের অভিযোগ, ‘‘এগুলো মূলত আবাসিক ভবন, বেআইনি ভাবে বাণিজ্যিক করা হয়েছে।’’

মির্জা গালিব স্ট্রিটের সেই বাড়ি, যার ভিতরে অজস্র ঘুপচি হোটেল।

মির্জা গালিব স্ট্রিটের সেই বাড়ি, যার ভিতরে অজস্র ঘুপচি হোটেল। ছবি: পিটিআই।

বসতবাড়িকে ব্যবসার কাজে ব্যবহার করতে হলে কলকাতা পুরসভার থেকে ‘চেঞ্জ অফ ইউজ়’ ছাড়পত্র নিতে হয়। এ ছাড়া, পুরসভার লাইসেন্স বিভাগ থেকে ট্রেড লাইসেন্স এবং দমকল দফতরের আলাদা ছাড়পত্র লাগে। দরকার হয় স্বাস্থ্য এবং দূষণ সংক্রান্ত ছাড়পত্রও। হোটেলে কতগুলি ঘর আছে, ক’জন সেখানে থাকতে পারেন, ভবন বেআইনি ভাবে তৈরি হয়েছে কি না, সবই দেখার দায়িত্ব পুরসভার। সকালে ঘটনাস্থলে গিয়ে দমকল প্রতিমন্ত্রী কৌশিক চৌধুরী অভিযোগ করেন, “পূর্বতন সরকারের আমলের কলকাতা পুরসভার অভিশাপ আমাদের বহন করতে হচ্ছে। তারা কী করে এখানে ট্রেড লাইসেন্স, হোটেল করার অনুমতি দিয়েছে, তা নিয়ে তদন্ত হবে। প্রত্যেকের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করা হবে।”

পুরমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পালের আক্রমণ আরও সুনির্দিষ্ট। তৃণমূল জমানার পুরমন্ত্রী, ‘যিনি আবার মেয়রও ছিলেন’, এ ভাবে হোটেল চালানোর অনুমতি কী করে দিলেন, সেই প্রশ্ন তোলেন তিনি। তাঁর কথায়, “আমার জায়গায় আগে যিনি ছিলেন, উনি কী করেছেন? ট্রেড লাইসেন্স দিল কে? সিইএসসি কী করে অনুমতি দিল?” অগ্নিমিত্রার আক্রমণের লক্ষ্য যিনি, সেই ফিরহাদ হাকিমের জবাব, ট্রেড লাইসেন্স ছিল কি না, তা মেয়রের পক্ষে দেখা কখনওই সম্ভব নয়। কিন্তু ফিরহাদ যতই বলুন, একে অপরকে আক্রমণ করে কোনও লাভ হবে না। মেয়র তদুপরি পুরমন্ত্রী থাকার কারণে দায় যে এড়াতে পারেন না, সে কথা বলছেন অনেকেই।

শাসকের তরফে আক্রমণের ঝাঁঝ দুপুরে আরও বাড়ান খোদ মুখ্যমন্ত্রী। সমাজমাধ্যমে তিনি লেখেন, “বছরের পর বছর ধরে কোনও নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই কলকাতা তথা রাজ্যে পরিকাঠামো গড়ে উঠেছে। অগ্নিসুরক্ষা সংক্রান্ত নিয়মবিধি উপেক্ষা করেই বিভিন্ন ভবন গড়ে তোলা হয়েছে। সেগুলিকে হোটেল এবং অন্য বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।” ফিরহাদের বক্তব্য, “অগ্নিসুরক্ষাবিধি সংক্রান্ত কোনও লাইসেন্স ছিল কি না, অডিট হয়েছিল না হয়নি— সেটা দেখার দায়িত্ব দমকল দফতরের। তারা বলতে পারবে।” ঘটনাচক্রে তৃণমূল সরকারের দমকলমন্ত্রী সুজিত বসু নিয়োগ দুর্নীতিতে অভিযুক্ত হয়ে এখন জেলবন্দি।

নিউ মার্কেটের ঘটনাস্থলে পুরমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল। বুধবার।

নিউ মার্কেটের ঘটনাস্থলে পুরমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল। বুধবার। ছবি: পিটিআই।

আগুন-লাগা বাড়িটির সর্বোচ্চ তলায় বাস করত একটি পরিবার। তাঁরা সকলেই অক্ষত আছেন। পরিবারের এক মহিলার অভিযোগ, অগ্নিনির্বাপণের ব্যবস্থা করার জন্য হোটেলগুলির মালিকদের বার বার বলা সত্ত্বেও কাজ হয়নি। লাভ হয়নি প্রশাসনকে জানিয়েও।

প্রশাসনের উদাসীনতা, অন্তত দমকল-পরিকাঠামোর ক্ষেত্রে, স্পষ্ট হয় একটা পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে। ক্যাগ রিপোর্ট বলছে, ২০১৯ সালে পশ্চিমবঙ্গে ৫৯১টি অগ্নিকাণ্ডে মোট ৫২৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। আগুনের সংখ্যার নিরিখে গোটা দেশের মধ্যে রাজ্যের অবস্থান নবমে। অথচ, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের অধীনস্থ অগ্নি সংক্রান্ত স্থায়ী উপদেষ্টা পর্ষদ রাজ্যে ৪৩৫টি দমকলকেন্দ্র প্রয়োজন বলে জানালেও আছে মাত্র ১৩৮টি। ৬৮ শতাংশ কম। কর্মিসংখ্যার ঘাটতিও এর সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার মতোই।

মঙ্গলবারের ঘটনাস্থল ১৫জি, মির্জ়া গালিব স্ট্রিটের অদূরে মার্কুইস স্ট্রিট, রফি আহমেদ কিদওয়াই রোড, রিপন স্ট্রিট, সদর স্ট্রিট জুড়ে একাধিক ঘিঞ্জি হোটেল। সেখানে গিয়ে দেখা গেল, আগুন নেবানোর নামমাত্র ব্যবস্থাও নেই। কোথাও স্প্রিঙ্কলার আছে, হোসপাইপ নেই। কোথাও পাইপ আছে বটে, জলের সংযোগ নেই। ফরেনসিক আধিকারিকেরা বুধবার এলাকা ঘুরে দেখেন কোথাও ফায়ার অ্যালার্ম অকেজো, কোথাও জলের পাম্পের ঘরে তালা। প্রায় সব হোটেলেই অনিয়মের ছবি স্পষ্ট। আগুন লাগল কী ভাবে? ফরেন্সিক দলের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ, শর্ট সার্কিট থেকে রিসেপশনে আগুন লাগে প্রথমে। কয়েক ফুট চওড়া রিসেপশনে টেবিল, সোফা এবং টিভি ছিল। প্রত্যেক ঘরের জন্য একটানা একটিই ফল্‌স সিলিং ছিল, যা কাঠের তৈরি। এমনকি, প্রতি ঘরে নীচ থেকে ছাদ পর্যন্ত টানা দেওয়ালও ছিল না। ফল্‌স সিলিং পর্যন্ত দেওয়াল তুলে ঘরগুলি আলাদা করা হয়। ঘর এতটাই ছোট ছিল যে, আলাদা করে দরজা তৈরি করার সুযোগ পাওয়া যায়নি। ‘স্লাইডিং ডোর’ করে দেওয়া হয়েছিল। এই ফল্‌স সিলিংয়ের ভিতর দিয়েই ধোঁয়া ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়ে। ঘরগুলির কোনওটিতে বিছানার উপর, কোনওটিতে মেঝের উপর, কোনওটিতে আবার শৌচালয়ে পড়ে ছিল নিথর দেহ। টিভি, পোড়া তার-সহ বেশ কিছু নমুনা ফরেন্সিক দল সংগ্রহ করেছে।

কোনও ঘটনা ঘটার পরে প্রশাসন যেমন জাগে, এ দিনও তেমনই জেগেছে। নিউ মার্কেটের ওই বাড়িটির ট্রেড লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। গোটা পুরসভা এলাকাতে ‘ইনস্পেকশন অডিট’ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। ২৫ তারিখের মধ্যে তার রিপোর্ট জমা দিতে বলা হয়েছে। কলকাতার পুরপ্রশাসক স্মিতা পাণ্ডে বলেছেন, ‘‘এমন ঘটনা বার বার ঘটা ঠিক নয়। এটা বন্ধ হওয়া দরকার। যেখানে যেখানে গলদ পাওয়া যাবে, আমরা সেগুলি বন্ধ করে দেব।’’ নজরদারির দায়িত্ব যে প্রশাসনের, সে কথা মেনে নিয়েছেন স্মিতা। আশ্বাস দিয়েছেন, ‘‘আইন এ বার কঠোর ভাবে প্রয়োগ করা হবে।’’

পাশাপাশি, নাগরিকদের দায়িত্ববোধ এবং সচেতনতার পাঠও দিয়েছেন পুরকমিশনার। বলেছেন, ‘‘আইন মানাটা ওঁদেরও দায়িত্ব।’’ কিন্তু আমজনতা হোক বা প্রশাসন, শেষপর্যন্ত টনক যে কারওরই নড়ে না, গত দু’দশকে কলকাতার বুকে ঘটে যাওয়া আটটা বড় মাপের অগ্নিকাণ্ডে দু’শোর বেশি প্রাণহানি তারই প্রমাণ।

New Market Kolkata fire Fire Brigade Kolkata Police

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy