ইতিমধ্যেই ৬০০ পার! ভয় ধরাচ্ছে কলকাতায় লাফিয়ে বাড়তে থাকা ডেঙ্গি আক্রান্তের সংখ্যা। এর মধ্যেই পাড়ায় পাড়ায় চিন্তা বাড়াচ্ছে দুর্গাপুজোর মণ্ডপ তৈরির কাজের ধরন। অভিযোগ, কোথাও মণ্ডপের আশপাশে খোলা মাঠে জল জমে রয়েছে। কোথাও জল জমছে মণ্ডপে প্রতিমা রাখার জায়গার সামনে, পাটাতনের তলায়। একই অবস্থা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখা বাঁশ বা অন্যান্য জিনিসের তৈরি কাঠামোতেও। আলাদা করে আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে মণ্ডপের জন্য লাগানো বাঁশের মাথায় জমা জল নিয়ে। জল জমছে মণ্ডপ ও প্রতিমা শিল্পীদের থাকার জায়গার পাশে পড়ে থাকা খাবারের প্যাকেট, ফয়েল, চায়ের ভাঁড়েও!
কিন্তু ফি-বছর কলকাতা পুরসভা ডেঙ্গি, ম্যালেরিয়া নিয়ে সচেতনতার যে প্রচার চালায়, তার কিছুই এ বার চোখে পড়ছে না বলে অভিযোগ। প্রতি বছরই পুরসভার স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে পুজো কমিটিগুলিকে সরকারি ভাবে চিঠি দিয়ে কী করণীয়, তা জানানো হয়। এ বার তেমন কোনও চিঠিই কোনও পুজো কমিটির কাছে পৌঁছয়নি। অন্যান্য বছর পুরসভার স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে প্রতিনিধিদল মণ্ডপ পরিদর্শন করলেও এ বার এখনও পর্যন্ত তা চোখে পড়েনি। কোনও প্রতিনিধিদলই মণ্ডপ পরিদর্শনে গিয়েছেন বলে জানাতে পারছেন না পুজোর উদ্যোক্তারা। উল্টে তাঁদের দাবি, ‘‘পাড়ায় পাড়ায় কাউন্সিলরেরা যে কাজ করতেন, এ বার সেই কাজ করার লোক নেই। পুর বোর্ড ভেঙে যাওয়ায় পুর পরিষেবা পেতে এক জায়গা থেকে আর এক জায়গায় ছুটে বেড়াতে হচ্ছে। না ডাকলে মশার তেল ছড়ানোর কর্মীও আসছেন না!’’ পুজোকর্তাদের একাংশের আবার অভিযোগ, বহু পুজোর হাতবদল হওয়ায় সেখানে স্থানীয় পুরপ্রতিনিধিদের ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। নতুন কমিটি গঠন করে পুজো হচ্ছে যেখানে, সেখানকার উদ্যোক্তাদের দাবি, তাঁরা নিজেরাই ডেঙ্গি মোকাবিলার ব্যবস্থা করেছেন।
বিপজ্জনক: মণ্ডপ তৈরির জন্য রাখা বাঁশের তলায় জমে আছে জল। মঙ্গলবার, কলকাতা পুরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডে। ছবি: রণজিৎ নন্দী।
যদিও পুরকর্তাদের দাবি, পুরসভা এবং পুজো কমিটিগুলি একযোগে কাজ না করলে ডেঙ্গি পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার নিতে পারে। তাঁরা জানাচ্ছেন, এ বছর এখনও পর্যন্ত কলকাতায় ডেঙ্গি আক্রান্তের সংখ্যা ৬০০ পেরিয়েছে। কলকাতা পুরসভা ১৬টি ওয়ার্ডকে ‘হটস্পট’ বলে ঘোষণা করেছে। তার মধ্যে রয়েছে ৬, ১৬, ৩১, ৩৯, ৪৪, ৫৪, ৫৬, ৬৯, ৮২, ৯৩, ১১১, ১০৯, ১১৬, ১২৪, ১২৮ ও ১৩৩ নম্বর ওয়ার্ড। শুধুমাত্র ৬ নম্বর ওয়ার্ডেই ৫৪ জন ডেঙ্গি আক্রান্তের হদিস মিলেছে। ৯৩ এবং ১১৬ নম্বর ওয়ার্ডে সাত জন করে আক্রান্ত। ৩১ ও ১২৪ নম্বর ওয়ার্ডে ডেঙ্গি আক্রান্তের সংখ্যা ছ’জন করে। অভিযোগ, এর মধ্যে পুরসভার আশাকর্মীরা দীর্ঘ দিন ধরে আয়ুষ্মান ভারত, মুখ্যমন্ত্রী স্বাস্থ্য বিমা প্রকল্পে কাজ করছেন। ফলে, আগের মতো তাঁরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে পরিদর্শন করার সময় পাচ্ছেন না। পুরসভার স্বাস্থ্য বিভাগের চিকিৎসকদের একাংশের পর্যবেক্ষণ, ‘‘সামনের দু’মাস ডেঙ্গি নিয়ে আরও সতর্ক থাকতে হবে। পুর বোর্ড না থাকায় পুজো কমিটিগুলিকে সে ভাবে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়নি। সকলকে নিজের উদ্যোগেই সতর্ক হতে হবে।’’
এই পরিস্থিতিতে বাগবাজার সর্বজনীন দুর্গোৎসব ও প্রদর্শনীর পুজোকর্তা গৌতম নিয়োগী বললেন, ‘‘আমাদের কয়েক জন সদস্যের ম্যালেরিয়া হয়েছে। মাঠে ঘাস বেড়ে গিয়েছে। জলও জমে রয়েছে। আমাদের বরোর এগ্জ়িকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ারকে চিঠি দিয়ে সাহায্য চেয়েছি।’’ টালা প্রত্যয়ের পুজোকর্তা শুভঙ্কর সাহা বললেন, ‘‘আমাদের পুজো এ বার রাস্তায় হওয়ায় মাঠে শ্রমিকদের থাকার ব্যবস্থা হয়েছে। ভয়ে ভয়ে আছি। তবে বিধায়ক আমাদের পুজোয় রয়েছেন বলে পুর পরিষেবা পেতে ততটা সমস্যা হচ্ছে না।’’ টালা বারোয়ারির পুজোকর্তা অভিষেক ভট্টাচার্য বলছেন, ‘‘জ্বর এলেই ওষুধ দিতে বলা হয়েছে। এই সময়ে শ্রমিকেরা অসুস্থ হয়ে পড়লে পুজোরই ক্ষতি।’’ চেতলা অগ্রণীর পুজোকর্তা সমীর ঘোষের মন্তব্য, ‘‘শ্রমিকদের ক্লাবে রেখেছি আমরা। তবে আমাদের পুজোয় প্রাক্তন মেয়র যুক্ত থাকায় ততটা সমস্যা হচ্ছে না।’’ ত্রিধারা সম্মিলনীর পুজোকর্তা দেবাশিস কুমারেরও দাবি, ‘‘পুরসভার কোনও চিঠি এখনও আমরা পাইনি। তবে পুর পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিজ্ঞতা থাকায় যে ভাবে কাজ করতে হয়, সেই ভাবেই ডেঙ্গির প্রস্তুতি নিচ্ছি।’’
‘ফোরাম ফর দুর্গোৎসব’-এর সম্পাদক অঞ্জন উকিল বললেন, ‘‘পুরসভার কোনও উদ্যোগ এখনও চোখে পড়ছে না। তবে ফোরাম থেকে একটা গাইডলাইন দ্রুত প্রকাশ করার ভাবনাচিন্তা করছি। মশার কামড়ে পুজো মাটি হোক, কেউই চাই না।’’