আদতে বাজি বোঝেন কারা? বাজি বাজারের উদ্যোক্তা কারা হলে বাজির বিপদ এড়ানো সম্ভব? কালীপুজোর আগে সেটা ঠিক করাই এখন বড় মাথাব্যথার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে পুলিশের কাছে। কারণ, এত দিন শহরে পুলিশের সঙ্গে বাজি বাজার করতেন যাঁরা, তাঁদের পিছনে ফেলে এগিয়ে এসেছেন অন্য একাধিক পক্ষ। অভিযোগ, দুর্গাপুজোর মতো বাজি বাজারেরও দখল নেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। অনভিজ্ঞ কেউ বাজির বাজার বসালে বিপদের আশঙ্কা যে তৈরি হতে পারে, সে সম্পর্কে পুলিশের দৃষ্টি আকর্ষণ করে অভিযোগকারীদের কেউ কেউ বলছেন, ‘‘চোরবাগানে পদপিষ্ট হয়ে দর্শনার্থীদের মৃত্যুর ঘটনায় অনেকেই রাতারাতি পুজোর দখল হয়ে যাওয়াকে দায়ী করেছেন। বাজির বিপদ আরও বেশি। সেখানে দখলদারির জন্য কোনও ব্যবস্থাপনায় গন্ডগোল লেগে গেলে কী হবে? বিপদ ঘটে গেলে সেই দায়ই বা নেবে কে?’’
আগামী ৩০ অক্টোবর টালা পার্কে সবুজ বাজির পরীক্ষা হতে চলেছে বলে নির্দেশিকা প্রকাশ করেছে পুলিশ। তার আগে পুলিশ ট্রেনিং স্কুলে সব পক্ষকে নিয়ে বাজি ও কালীপুজো সংক্রান্ত সমন্বয় বৈঠক হওয়ার কথা। প্রতি বারই পুলিশ কালীপুজোর আগে সমস্ত বাজি পরীক্ষা করে ছাড়পত্র দেয়। যে সমস্ত বাজি পরীক্ষায় পাশ করে, শুধুমাত্র সেগুলিই বৈধ বাজি বাজারে বিক্রি হওয়ার কথা। নিষিদ্ধ বাজি যেখানে-সেখানে বিক্রি হওয়া আটকাতে সমস্ত বাজি ব্যবসায়ীদের একত্রিত করে বাজি বাজার বসায় পুলিশ। গত বেশ কয়েক বছর ধরে টালা, বেহালা, কালীকাপুর এবং ময়দানে বাজি বাজার বসছে। এ বারও সেই মতোই পরিকল্পনা শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই একাধিক পক্ষ বাজারের কর্তৃত্ব হাতে নিতে চেয়ে পুলিশের কাছে দরবার শুরু করেছে বলে খবর।
জানা যাচ্ছে, উত্তর কলকাতার টালায় বাজি বাজার তাঁরাই বসাবেন বলে ইতিমধ্যে পুলিশের দ্বারস্থ হন এক পক্ষ। অন্য পক্ষ আবার পুলিশের কাছে গিয়ে তাঁরাই প্রতি বার বাজার বসান এবং বাজির অভিজ্ঞতা রয়েছে বলে দাবি করেছেন। সূত্রের দাবি, এর পরে ওই দলের সদস্যেরা পুরনো কর্তাদের থেকে ১০টি স্টল আলাদা করে চেয়েছেন। যদিও ওই বাজারের এক কর্তার মন্তব্য, ‘‘৪৪টি স্টল হয় আমাদের। নিরাপত্তার কারণে স্টলের সংখ্যা বাড়ানো হয় না। বিস্ফোরকের দোকান দেওয়া হয়, তাই যাতে কোনও ভাবে বিপদ না ঘটে তাই কিছুটা জায়গা ছেড়ে ছেড়ে স্টল হয়। সেখানে আলাদা করে ১০টা স্টল কোথায় করা হবে! এটা করতে গিয়ে বিপদ ঘটে গেলে, দায় কে নেবে?’’
এই পরিস্থিতিতে টালা বাজি বাজারের পুরনো কর্তারা স্টল দিতে পুলিশের থেকে অনুমতি নিতে বলেছেন বাজি ব্যবসায়ীদের। পুলিশ ঠিক করেছে, সর্বত্র সমস্তটা খতিয়ে দেখে তবেই স্টল করার অনুমতি দেবে তারা। ময়দান বাজিবাজারের এক উদ্যোক্তা আবার এই পরিস্থিতিতে বলছেন, ‘‘আমাদের বাজারও দখল নেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। এক দল যাঁরা বাজির কিছুই জানেন না, বোঝেন না, তাঁরা গিয়ে বাজারকরতে চান বলে পুলিশে দরখাস্ত করেছেন।’’
এই পরিস্থিতিতে বাজারের পুরনো অভিজ্ঞতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন বাজি ব্যবসায়ীদের অনেকেই। ফি বছর পুলিশ বাজি পরীক্ষার আয়োজন করলেও আসলে ‘ধোঁকাবাজি’ চলে বলে তাঁদের দাবি। গত বছরই যেমন বাজি পরীক্ষার সময় টালা পার্কে ‘ন্যাশনাল এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট’ বা নিরি-র কোনও প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন না। অথচ তাঁদের দেওয়া ছাড়পত্র দেখেই চূড়ান্ত পরীক্ষায় বাজির পাশ করার কথা। পরীক্ষা করতে উপস্থিত দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের প্রতিনিধিরা সে কথা উল্লেখ করে জানিয়ে দেন, নিরি-র অ্যাপে এক একটি বাজির বাক্সের গায়ে লাগানো কিউআর কোড স্ক্যান করতে হবে। যে শংসাপত্র বেরোবে, তা যথাযথ কিনা, তা দেখে সই করে ছাড়পত্র দেওয়ার অধিকারী একমাত্র নিরি-র আধিকারিকেরাই। কিন্তু নিরি-র তরফে কেউই উপস্থিত না থাকায় গত বছর তা করাই যায়নি।
সেই সঙ্গে শব্দ মাপার যন্ত্র দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের প্রতিনিধিরা নিয়ে এলেও ধোঁয়া পরীক্ষা করার কোনও বন্দোবস্ত দেখা যায়নি। চলতি বছরে তেমনটা যাতে আর না হয়, সেই দাবিও তুলেছেন বাজি ব্যবসায়ীদের অনেকেই। জল্পনা চলছে, শুধুমাত্র সবুজ বাজিতে ছাড় থাকলেও আদতে কতটা নিয়ম মানা হবে, তা নিয়েও। পরিবেশকর্মীদের দাবি, ‘‘সবুজ বাজিতে ছাড় দেওয়া হয়েছে শুধু। অথচ, এখন থেকেই ১২৫ ডেসিবেল পর্যন্ত বাজি ফাটানোর ছাড় দিয়ে দেওয়া হয়েছে। বায়ু দূষণ কমানোর কথা ভাবা হচ্ছে, কিন্তু শব্দদূষণের কী হবে?’’ এমন পরিস্থিতিতে এ বছর বাজির তাণ্ডব লাগামছাড়া পর্যায়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অনেকে।