E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

‘দখলদারি রুখতে বাধ্য হয়েই মিছিলে নেমেছি’

সন্ধ‍্যায় দেখা গেল, মিছিলে পা মেলানো পড়ুয়া বা সদ‍্য প্রাক্তনীরা রুদ্ধ কণ্ঠে তাঁদের দিকে ছুড়ে দেওয়া ‘দেশবিরোধী’ তকমার মোকাবিলা করছেন।

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ২২ অগস্ট ২০২৬ ০৬:২৪
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে এবিভিপি-র গুন্ডামির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে নাগরিক মিছিল।

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে এবিভিপি-র গুন্ডামির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে নাগরিক মিছিল। শুক্রবার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গোলপার্ক পর্যন্ত। ছবি: সুমন বল্লভ।

আবেগের কল্লোলে কণ্ঠ মিলে যাচ্ছে অর্ধ শতক আগের ছাত্রী তথা শিক্ষক এবং আজকের তরতাজা জেন জ়ি পড়ুয়াদের। শুক্রবার বিকেলে শিক্ষার্থীদের ডাকে যাদবপুরের মহামিছিল তার বুক-চাপা রাগ, জ্বালা, কান্নায় অনেকগুলো প্রজন্মের মধ‍্যে ফের সেতু বাঁধল।

দুপুরে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির অবস্থান কর্মসূচিতে এসে দাঁড়িয়েছিলেন ১৯৬৩-৬৪ সালে যাদবপুরের ইংরেজি স্নাতকোত্তরের ছাত্রী, পরে কয়েক দশকের শিক্ষিকা মালিনী ভট্টাচার্য। তাঁর কথায়, “এক দিকে যাদবপুরকে কেন্দ্র এবং রাজ্য সরকার অনেক বছর ধরে আর্থিক ভাবে বঞ্চিত করছে, আবার তারাই এখন নানা রকম বদনামে কলঙ্কিত করার চেষ্টা চালাচ্ছে! এ যেন সেই প্রবাদবাক‍্যে কুকুরকে অপবাদ দিয়ে তার পর ফাঁসিতে ঝোলানোর মতো। এ দেশে সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা যাদবপুরের মতো রাজ‍্য বিশ্ববিদ‍্যালয়ের প্রতি মানুষের আস্থা নড়বড়ে করার চেষ্টা চলছে। এ বার যা ঘটেছে, সেটা সেই কদর্য চেষ্টারই চূড়ান্ত প্রকাশ।”

১৯৮২ সালে ভূতত্ত্ববিদ‍্যায় স্নাতকোত্তর, যাদবপুরের সমুদ্রবিজ্ঞানচর্চা কেন্দ্রের অধ‍্যাপক সুগত হাজরাও বলছিলেন, “এমন গুন্ডামি কোনও রকম রাজনৈতিক অজুহাতে মানা যায় না। যাদবপুরের গণতান্ত্রিক পরিসর বাঁচাতে নির্বাচিত ছাত্র সংসদ তৈরি হোক। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় ছাত্রশাসন তন্ত্রের পুনরুজ্জীবন দরকার, যা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও সরকারের সঙ্গে হাত মিলিয়ে করবে।”

সন্ধ‍্যায় দেখা গেল, মিছিলে পা মেলানো পড়ুয়া বা সদ‍্য প্রাক্তনীরা রুদ্ধ কণ্ঠে তাঁদের দিকে ছুড়ে দেওয়া ‘দেশবিরোধী’ তকমার মোকাবিলা করছেন। তুলনামূলক সাহিত‍্যের এক ছাত্রী বলছিলেন, “আমরা কেউ সাধ করে মিছিল করতে নামিনি! এত ভাল ক্লাস হয় যাদবপুরে। মনে হয়, শুধু পড়াশোনা নিয়েই থাকি। কিন্তু সেই শান্তিতে আমাদের আর থাকতে দিল কই এই সরকার!” মিছিলে এক ছাত্রী অনুষ্ণা দাসের অভিযোগ, “ক্যাম্পাসে গুন্ডাবাহিনী ঢুকে আগুন জ্বালাচ্ছে, স্লোগান দিচ্ছে। তাই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাব্যবস্থাকে রক্ষা করতেই আমাদের এই আন্দোলন।” এসএফআই নেত্রী এষণা সেন হাঁটতে হাঁটতে বললেন, “দেশপ্রেম বিজেপি বা আরএসএসের কাছে শিখব না। স্বাধীনতা সংগ্রামে তাদের কোনও ভূমিকা ছিল না। শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংস করা হচ্ছে। যাদবপুরের পরে প্রেসিডেন্সিকেও নিশানা করা হতে পারে।” বিশ্ববিদ্যালয়ের আর এক ছাত্র মহম্মদ হাবিব হুসেন বলেন, “সন্ত্রাস এবং গুন্ডামির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতেই এ পথে নামা।”

বাস্তবিক এ দিনও বিজেপির টালিগঞ্জের বিধায়ক পাপিয়া অধিকারী (যিনি আবার যাদবপুরের তুলনামুলক সাহিত্য বিভাগের প্রাক্তনী) যাদবপুরের পড়ুয়াদের নিশানা করেই বলেন, “আমরা দেশকে মা ভাবি! ওরা দেশবিরোধী স্লোগান দিচ্ছে। জোর করে ইউনিয়ন করছে। অনর্থক মারধর করছে, এটা ঠিক নয়!” যাদবপুরের মিছিলে ঘুরেফিরে তাঁদের নামে অপবাদের চেষ্টা নিয়ে সরব হয়েছেন। মিছিলে নব‍্য প্রজন্মের প্রিয় আজাদি-র স্লোগান ওঠে। জনৈক শিক্ষক বলছিলেন, বিধায়ক থেকে শুরু করে প্রভাবশালীরা যাদবপুরের ছাত্রদের নামে ‘ভারত টুকরো করার স্লোগান’ দিচ্ছে বলে অপবাদ ছড়াচ্ছেন। কিন্তু একটা রেকর্ডিং কি কেউ দেখাতে পারবেন?”

বৃষ্টি মাথায় নিয়েই যাদবপুর ছাড়িয়ে গোলপার্কের দিকে এগোচ্ছিল মিছিল। মাঝে বেসরকারি হাসপাতালের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময়ে মিছিলকারীরা নিজেরাই ইশারায় পরস্পরকে স্লোগান বন্ধ রাখতে বললেন। এক যুগ আগে ‘হোক কলরব’ আন্দোলনের সময়ে যাদবপুরের মিছিলের স্মৃতি এখনও অনেকের কাছে টাটকা। ২০১৯-এ তৎকালীন বিজেপি সাংসদ বাবুল সুপ্রিয়ের সঙ্গে সংঘাতের ঘটনার পরে বর্ণময় প্রতিবাদ মিছিল ঐতিহাসিক প্রতিবাদ-গীতি ‘বেলা চাও’-এর প‍্যারোডি গেয়ে ক‍্যাম্পাসে দখলদারিতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে। এ দিনের মিছিলও সেই ধারাবাহিকতা অটুট রাখল।

শিক্ষক, প্রাক্তনীদের একাংশের ক্ষোভ, দখলদারিতন্ত্রের প্রতিবাদ জারি রাখলেও দখলদারির চেষ্টার চেহারাটা আরও উগ্র হচ্ছে।

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Students Protest

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy