লক্ষ্মীপুজোর আগের রাতে ঘর থেকে এ ভাবে লক্ষ্মী বিদায় হবে, তা কি কখনও ভেবেছিলেন বৃদ্ধা দিদিমা? আর্থিক অনটনের সংসারে নাতনিকে নিজের কাছে এনে বড় করেছিলেন তিনি। ভেবেছিলেন, অভাবের মধ্যেও পড়াশোনা শিখে এক দিন নিজের পায়ে দাঁড়াবে মেয়েটি। পরিবারের দুঃখ ঘুচবে। কিন্তু সেই স্বপ্ন যে এ ভাবে শেষ হয়ে যাবে, তা কল্পনাও করতে পারেননি কেউ। সতেরো বছরবয়সি সেই কিশোরীর রক্তাক্ত ও ক্ষতবিক্ষত দেহ উদ্ধার হল গ্রামের খালপাড় থেকে। ধর্ষণ করে খুনের অভিযোগ ঘিরে এখন শোক, ক্ষোভ আর আতঙ্কে থমথমে সীমান্তবর্তী এলাকার গ্রাম। লক্ষ্মীপুজোয় যে বাড়িতে আনন্দের আলো জ্বলার কথা ছিল, সেখানে এখন শুধুই কান্না আর শূন্যতা।
রবিবার সাতসকালে খালপাড় থেকে কিশোরীর দেহ উদ্ধারের পর থেকেই এলাকার মানুষের মনে একটাই প্রশ্ন— কী ভাবে এমন ঘটনা ঘটল, কে ঘটাল! যে মেয়েটি শনিবার রাতে পরিচিত পরিবেশে একটি বিচিত্রানুষ্ঠান দেখতে বেরিয়েছিল, সে আর বাড়ি ফিরল না কেন? রাতভর খোঁজাখুঁজির পরেও কেন তার সন্ধান পাওয়া গেল না? একই সঙ্গে সকলের উদ্বেগ, এমন ঘটনা যদি গ্রামের মধ্যেই ঘটে, তা হলে মেয়েদের নিরাপত্তা কোথায়? স্থানীয় বাসিন্দাদের কথায়, ওই কিশোরী ছিল শান্ত ও ভদ্র স্বভাবের। মন দিয়ে পড়াশোনা করত। পরিবারের আর্থিক অনটন থাকলেও পড়াশোনার প্রতি তার আগ্রহ ছিল। ছোটবেলা থেকেই মামার বাড়িতে থেকে বড় হচ্ছিল। চার বোনের মধ্যে ছোট মেয়েটিকে নিয়ে পরিবারের অনেক আশা ছিল।
বাসিন্দাদের একাংশের অভিযোগ, সীমান্তবর্তী এলাকায় অল্পবয়সি ছেলেদের একাংশের হাতে সহজেই নেশার দ্রব্য পৌঁছে যাচ্ছে। সন্ধ্যার পরে বিভিন্ন জায়গায় নেশাগ্রস্ত যুবকদের আনাগোনা দেখা যায় বলেও দাবি স্থানীয়দের। স্থানীয় এক শিক্ষক বলেন, ‘‘সীমান্তের কাছেই আমরা বসবাস করি। আমাদের কাছে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে, অল্পবয়সি ছেলেরা সহজে নেশার দ্রব্য হাতে পেয়ে যাচ্ছে। সন্ধ্যার পরে তারা নেশায় আসক্ত হয়ে পড়ছে। তা থেকে অপরাধমূলক কাজ করার প্রবণতা বাড়তে পারে।’’ এলাকার মানুষের অনেকের দাবি, নেশার দ্রব্য যারা অল্পবয়সিদের হাতে তুলে দিচ্ছে, তাদের চিহ্নিত করে গ্রেফতার করতে হবে। গ্রামীণ এলাকায় রাতের পুলিশি নজরদারি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন বাসিন্দাদের অনেকে। তাঁদের দাবি, সন্ধ্যার পর থেকে রাত পর্যন্ত গ্রামের বিভিন্ন রাস্তায় পুলিশের টহল আরও বাড়াতে হবে। পুলিশ সুপার জানিয়েছেন, মাদক কারবার নিয়ে যে অভিযোগ উঠেছে, তা খতিয়ে দেখা হবে। এই কারবারে কেউ যুক্ত থাকলে তার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করা হবে।
স্থানীয়দের বক্তব্য, শনিবার রাতে এলাকায় বিচিত্রানুষ্ঠান ছিল। সে কারণে রাত পর্যন্ত বহু মানুষ রাস্তায় ছিলেন। অনুষ্ঠান দেখতে এসেছিলেন গ্রামের বাসিন্দারা। দোকানপাট ও বাজার এলাকাতেও মানুষের আনাগোনা ছিল। তা সত্ত্বেও কী ভাবে এক কিশোরীকে ধর্ষণ করে খুন করা হল, আর অভিযুক্ত পালিয়ে গেল—সেই প্রশ্নের উত্তর চাইছেন তাঁরা।
কিশোরীর মৃত্যুতে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন মা ও দিদিমা। পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভাল নয়। তরুণীর বাবা খেতমজুরি করেন। কয়েক দিন আগেই কিশোরীর মায়ের অস্ত্রোপচার হয়েছে। অসুস্থতার কারণে তিনিও বাপের বাড়িতে ছিলেন। সেই পরিস্থিতিতে পরিবারের এই বিপর্যয় যেন তাঁদের সমস্ত শক্তি কেড়ে নিয়েছে। দিদিমার কথায়, ‘‘আর্থিক কারণেই নাতনিকে নিজেদের কাছে এনে রেখেছিলাম। তার এই পরিণতি হবে, মানতে পারছি না।’’
স্থানীয় বিধায়ক বলেন, ‘‘এ ভাবে মেয়েটির জীবন শেষ হয়ে যাবে তা মেনে নেওয়া যায় না। যারা এর সঙ্গে যুক্ত, তারা নৃশংস মানসিকতার পরিচয় দিয়েছে। আমি পরিবারটির পাশে আছি।’’