বছর দেড়েক আগের ঘটনা। দার্জিলিঙে একটি বাড়িতে আগুন লেগেছিল। সেই সময়ে স্থানীয় দমকল কেন্দ্রে ইঞ্জিন থাকলেও চালক ছিলেন না। বাধ্য হয়ে শিলিগুড়ি দমকল কেন্দ্র থেকে ইঞ্জিন আনতে হয়। তবে, ততক্ষণে সম্পূর্ণ পুড়ে গিয়েছিল বাড়িটি। চালকের অভাবে রাজ্য দমকল দফতরের দশা যে কতটা করুণ হতে পারে, ওই ঘটনা তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিল।
রাজ্যে তৃণমূল সরকারের আমলে কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ে কেনা হয়েছিল আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন কয়েকশো দমকলের ইঞ্জিন। বর্তমান বিজেপি সরকারের সময়েও সেই ধারা বজায় রয়েছে। বুধবার রেড রোডে আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন ২২৬টি দমকলের ইঞ্জিনের উদ্বোধন করেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। কিন্তু এই আবহেও ঘুরেফিরে এসেছে পুরনো প্রশ্নটা, গাড়ি চালানোর চালক কোথায়?
দমকল দফতর সূত্রের খবর, রাজ্যের ১৬৭টি দমকল কেন্দ্রে যেখানে দেড় হাজার ‘ফায়ার ইঞ্জিন অপারেটর কাম ড্রাইভার’ (এফইওডি) থাকার কথা, সেখানে চালক রয়েছেন ৬৯০ জন। আবার, যাঁরা আগুন নেভানোর কাজ করেন, সেই ফায়ার অপারেটর থাকার কথা ৬১০০ জন। সেখানে স্থায়ী কর্মী রয়েছেন মাত্র ১৮০০ জন। তাঁদের সঙ্গে ২৭০০ কর্মী রয়েছেন অক্সিলিয়ারি ফায়ার অপারেটর হিসেবে, অর্থাৎ অস্থায়ী পদে। তাঁদের বেতনও ভীষণ কম।
দমকল দফতরের অন্দরেই অনেকে বলছেন, লোকবলের অভাবে দফতর ধুঁকছে বললেও কম বলা হয়। ২০১১ সালে তৃণমূল সরকার ক্ষমতায় আসার পরে দফায় দফায় দমকলের ইঞ্জিন কেনা হয়েছিল। কিন্তু অভিযোগ, সেই নিরিখে বিভিন্ন পদে নিয়োগ প্রায় হয়ইনি। এমনও ঘটেছে, কোনও দমকল কেন্দ্রে চালক না থাকায় আধিকারিক পদমর্যাদার কাউকে গাড়ি চালিয়ে দুর্ঘটনাস্থলে যেতে হয়েছে।
এই প্রসঙ্গে দমকলের এক আধিকারিক বলছেন, ‘‘ইঞ্জিনের তুলনায় চালকের সংখ্যা হাতে গোনা। এমন একাধিক পরিস্থিতি হয়েছে, যেখানে চালক না থাকায় কোনও অফিসারকে গাড়ি চালিয়ে আগুন নেভাতে যেতে হয়েছে। মুষ্টিমেয় চালক থাকায় কোনও দুর্ঘটনা ঘটলে সমস্যা তীব্র হচ্ছে। অনেক চালককে অতিরিক্ত সময় কাজ করাতে হচ্ছে।’’
আবার, দমকলের চালকদের একাংশের ক্ষোভ, ‘‘ওভারটাইম কাজ করলেও সময় মতো টাকা পাওয়া যায় না।’’ যদিও দমকল দফতরের সঙ্গিন দশার জন্য বিগত সরকারকেই দায়ী করেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। এ দিন দমকলের নতুন ইঞ্জিনের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে এসে তিনি স্পষ্ট বলেন, ‘‘তৃণমূল সরকার কোনও নিয়ম-নীতি মানেনি। ন্যূনতম প্রশিক্ষণ ছাড়াই দমকল দফতরে অসংখ্য অস্থায়ী কর্মী নিয়োগ করা হয়েছিল। এ ভাবে নিয়োগ হতে পারে না। আমরা অবিলম্বে পুলিশ রিক্রুটমেন্ট বোর্ডের মাধ্যমে দমকলে ১৪০০ কর্মী নিয়োগ করব। এক বছরের মধ্যে আরও এক হাজার কর্মী নিয়োগ করা হবে।’’
এ দিনের অনুষ্ঠান থেকে পুলিশকর্মীদের মতো দমকলকর্মীদেরও ‘জীবন রক্ষা’ মেডেল প্রদান করা হবে বলে ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী। সম্প্রতি বীরভূমের তারাপীঠের একটি লজে এবং কলকাতার নিউ মার্কেট এলাকার হোটেলে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় দমকলকর্মীদের ভূমিকার প্রশংসা করে শুভেন্দু জানান, ওই দু’টি ক্ষেত্রে যাঁরা মারা গিয়েছেন, তাঁদের ধোঁয়ায় দমবন্ধ হয়ে মৃত্যু হয়েছে। দমকলকর্মীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে অত্যন্ত তৎপরতার সঙ্গে আবাসিকদের উদ্ধার করেছেন। তা না হলে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারত। ওই দুই দুর্ঘটনায় দমকলকর্মীরা যথেষ্ট দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন বলেও জানান মুখ্যমন্ত্রী।