‘সর্বশক্তিময় তৈল নানা রূপে সমস্ত পৃথিবী ব্যাপ্ত করিয়া আছেন।’ তাঁর ‘তৈল’ প্রবন্ধে লিখেছিলেন হরপ্রসাদ শাস্ত্রী। বিশ্ব জুড়ে তেলের এই সর্বশক্তিমান রূপই এ বার ফুটিয়ে তুলছে বেহালা ক্লাবের দুর্গাপুজো। তেল শুধু একটি উপকরণ নয়, পুজোর প্রদীপ থেকে রান্না, বাজারের পণ্য থেকে মানুষের দৈনন্দিন জীবন— তেলের প্রবাহের সঙ্গে মিশে থাকে আধ্যাত্মিকতা, বিশ্বাস, শ্রম এবং অর্থনীতি। তেলের এই সব গুরুত্বের পাশাপাশি, বেহালা ক্লাবের মণ্ডপে দেখা যাবে, তেলের ‘দখল’ নেওয়ার জন্য রাষ্ট্রনেতাদের সঙ্গে সাধারণ মানুষের দড়ি টানাটানি খেলার ছবি!
বিশ্বের বাজার অর্থনীতি ও রাজনীতিরও নিয়ন্ত্রক তেল। গোটা বিশ্বে জ্বালানি তেল-গ্যাস সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ় প্রণালী। পশ্চিম এশিয়ায় ইরানের সঙ্গে আমেরিকা-ইজ়রায়েলের যুদ্ধ, এবং তার ফলে হরমুজ় প্রণালী নিয়ে টানাপড়েনের জেরে ব্যাহত হয়েছে জ্বালানি তেল-গ্যাসের বাণিজ্য। যার ধাক্কা এসে পড়েছে মধ্যবিত্তের দৈনন্দিন জীবনে, হেঁশেলে। বর্তমানে যুদ্ধের ঝাঁঝ কমলেও যুদ্ধ এখনও বন্ধ হয়নি। তবে, পশ্চিম এশিয়ায় এই যুদ্ধের কারণে কয়েক মাস আগেও তেল-গ্যাসের অভাব টের পাওয়া গিয়েছিল দেশ জুড়ে।
অর্থাৎ, রাষ্ট্রনেতারা যুদ্ধ করেন, কিন্তু তার ফল ভুগতে হয় সাধারণ মানুষকে। তেলকে কেন্দ্র করে এই সত্যটি প্রতীকী ছবির মাধ্যমে দেখাচ্ছে বেহালা ক্লাবের পুজো মণ্ডপ। ছবিতে দেখা যাবে, তেলের বোতল নিয়ে জনগণের সঙ্গে দড়ি টানাটানির খেলা খেলছেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ইজ়রায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের মতো রাষ্ট্রনায়কেরা! তৈলাক্ত এই ভাবনা শিল্পী প্রদীপ দাসের। থিমের নাম ‘তেল: দ্য মার্কেট অব ফেথ।’ প্রদীপের কথায়, ‘‘ভোজ্য এবং জ্বালানি— দু’রকম তেলই আমাদের জীবনে প্রয়োজন। তেল মন্দির, বাজার, বাড়ির মধ্যে প্রবাহিত এক অদৃশ্য সেতু।’’ তাই এই পুজো মণ্ডপে প্রবেশের পরে দর্শনার্থীরা দেখতে পাবেন ধর্মস্থান। যেখানে প্রদীপ জ্বালাতে তেলের প্রয়োজন। ধর্মস্থান পেরিয়ে দর্শনার্থীরা চলে আসবেন রান্নাঘরে। যেখানে তেল ছাড়া সব অচল। সব শেষে তৈরি করা হচ্ছে বাজার। সেখানেই সপরিবার থাকবেন দুর্গা। বাঁশ, কাঠ, ত্রিপল, লোহা, গুঁড়ো রং ইত্যাদি উপাদান দিয়ে মণ্ডপ তৈরির কাজ চলছে বলে জানান প্রদীপ।
বাজারের খেটে খাওয়া মহিলা, অর্থাৎ মহিলা বিক্রেতা, মাছ কাটার কাজ করেন যে মহিলারা, দুর্গা প্রতিমার মধ্যে তাঁদের প্রতিফলন দেখা যাবে। তাই দুর্গা বাজারে বসে থাকবেন। দুর্গার চার হাত। হাতে থাকবে বঁটি, মাছ। প্রতিমা শিল্পী পিন্টু শিকদার বলেন, ‘‘মাটির এই দুর্গা প্রতিমার সঙ্গে আর একটি ছাঁচ গড়ে তোলা হবে। সেখানে বাজারে রোজকার মহিলা মাছ বিক্রেতা বা মাছ কাটার সঙ্গে যুক্ত মহিলার ফাইবারের অবয়ব তৈরি করা হবে। তাঁর ছ’টি বা দশটি হাত থাকতে পারে। তা দিয়ে বোঝানো হবে যে, এই সব মহিলার মধ্যেও দুর্গার বাস।’’ পুজোর এক কর্মকর্তা ঋতম বন্দ্যোপাধ্যায় জানালেন, তৃতীয়া থেকে মণ্ডপ খুলে দেওয়া হবে দর্শকদের জন্য। এ বার এই পুজো পা দিচ্ছে ৮২ বছরে।
তেল সম্পর্কে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী আরও লিখেছিলেন, ‘তৈলের মহিমা অতি অপরূপ, তৈল নহিলে জগতের কোনও কার্য সিদ্ধ হয় না। তৈল নহিলে কল চলে না, প্রদীপ জ্বলে না, ব্যঞ্জন সুস্বাদু হয় না, চেহারা খোলে না, হাজার গুণ থাকুক, তাহার পরিচয় পাওয়া যায় না। তৈল থাকিলে তাহার কিছুরই অভাব থাকে না।’ বেহালা ক্লাবের পুজোয় বহুরূপী তেলের এমন নানা গুণ এ বার চাক্ষুষ করার পালা।