কথা বলা ও শোনা, লেখা ও পড়া, ছবি আঁকা ও দেখা— একটা শুরু হলে অন্যটাও নিজে থেকেই এসে পড়ে। কোনটি প্রধান আর কোনটি তার সহযোগী, আলাদা করে চিহ্নিত করা কঠিন। এই মেলবন্ধন ও টানাপড়েন সঙ্গী করেই উনিশ ও বিশ শতকের সন্ধিক্ষণে বাঙালির দৈনন্দিন জীবনে বই পড়া, ছবি দেখা-ও গভীর ছাপ ফেলে।
দিল্লি আর্ট গ্যালারি (ডিএজি) তাদের ‘পয়েন্টস অব ডিপার্চার’ প্রকল্পে অতীতের ইতিহাসকে আজকের ভাবনার সঙ্গে জোড়ার চেষ্টা করছে। এই উদ্যোগের প্রথম নিবেদন হিসেবে প্রকাশ পাবে কলকাতা-শান্তিনিকেতনের ছাপাই-ছবি ও গ্রন্থনির্মাণ শিল্পী অরণ্য সেনগুপ্তের অঙ্কন ও পরিকল্পনায় সাজানো লেটারপ্রেস বই— জলগোধিকা, অর্থাৎ তরলপ্রিয় কুমীরসদৃশ উচ্ছিষ্টভুক সরীসৃপ। সৌম্যদীপ রায়ের লেখা, শিবাজী বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূমিকা সমন্বিত বইটি মূলত এক কাল্পনিক ‘নকশা’। উনিশ শতকের শেষপর্বের বাংলা মুদ্রণ-সংস্কৃতিকে নতুন করে ছুঁয়ে দেখার কেন্দ্রে রয়েছে সে কালের বাঙালি বাবু-সমাজ। ‘জলগোধিকা’ বা গোসাপ, যা পুরো জলচর নয় আবার স্থলচরও না— এখানে স্ববিরোধিতা ও দ্বিচারিতায় দুষ্ট, ইংরেজ-তোষণকারী, নীতিহীন বাঙালি বাবুর রূপক। তাদের ঘিরেই আবর্তিত নানা চরিত্র— কবিরাজ, বাইজি, ভিস্তিওয়ালা, কবিয়াল বা সঙদের নিয়ে গড়ে উঠেছে সেকেলে কলকাতার হারিয়ে যাওয়া আখ্যান।
বিশেষ অসমান ধারের কাগজ আর লেটারপ্রেসে ছাপা এই বইটিতে রাখা হয়েছে মূল লিথোগ্রাফ, কাঠখোদাই এবং জ়িঙ্ক ব্লকে ছাপা ছবি (নমুনা: মাঝের ছবি)। মুদ্রণশিল্পের এই প্রাচীন ঐতিহ্য আমাদের মনে করিয়ে দেয় উনিশ শতকের শেষভাগে গড়ে ওঠা, বাণিজ্যিক শিল্পায়নের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া ‘ফাইন প্রেস’ আন্দোলনের কথা। ডিএজি-র আর্কাইভ ও নিজস্ব সংগ্রহে থাকা পুরনো অমূল্য ছবিগুলিকে ভিত্তি করেই শিল্পী ও তাঁর সহযোগীরা তাঁদের শিল্পভাবনা ছড়িয়ে দিয়েছেন বইটির পাতায় পাতায়। উপরের ছবিতে, ছাপার আগে ফর্মা বা ম্যাট্রিক্সের চূড়ান্ত সজ্জা দেখা যাচ্ছে।
এই উপলক্ষে প্রদর্শনী ও আনুষঙ্গিক একগুচ্ছ আয়োজনের মধ্য দিয়ে বাংলা গ্রন্থ-নির্মাণের ইতিহাস ফিরে দেখার সুযোগ, বিডন স্ট্রিটের রামদুলাল-নিবাস তথা ছাতুবাবু-লাটুবাবুর ঠাকুরবাড়িতে। গতকাল ২৫ সেপ্টেম্বর তার সূচনা হল ‘বই, চিত্র ও বৈচিত্র’ প্রদর্শনী দিয়ে। এতে জলগোধিকা-র পাশাপাশি থাকছে বাংলা বই ছাপার ইতিহাসের দুর্লভ কিছু গ্রন্থ। দর্শনার্থীরা বিশেষ সেট-আপ থেকে বইয়ে ব্যবহৃত মূল কাঠখোদাই ছবির প্রিন্টও সংগ্রহ করতে পারবেন। প্রদর্শনী চলবে আজ ২৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত, সকাল ১১টা-সন্ধ্যা ৭টা। আজ বিকেল সাড়ে ৪টায় ‘কেতাব-ই-আলাপ’ অনুষ্ঠানে বই তৈরির বিবর্তন নিয়ে সচিত্র আলোচনা ও বৈঠকে অভিজিৎ গুপ্ত, তপতী গুহঠাকুরতা ও সুস্নাত চৌধুরী। আগামী কাল, ২৭ সেপ্টেম্বর রবিবার সন্ধ্যা ৭টায় অমিত কুমার দে-র সুরে, পাঁচ শিল্পীর পরিবেশনায় শ্রুতি-নকশা ‘জলগোধিকা’য় জেগে উঠবে বাংলার হারিয়ে যাওয়া গীতি-নকশার ধারা।
সার্ধশতবর্ষে
বক্তৃতা, তথ্যচিত্র প্রদর্শন, চলচ্চিত্র ঘিরে আলোচনা, কুইজ়, কোলাজ। এই সব এবং আরও অনেক কিছুই সেই লেখককে ঘিরে, যাঁর জন্মসার্ধশতবর্ষ উদ্যাপনে মগ্ন মহানগর। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় স্মরণে তিন দিন ব্যাপী অনুষ্ঠানমালা আয়োজন করেছে প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়। গত ২৩ ও ২৪ সেপ্টেম্বর প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ অডিটোরিয়ামে বললেন সসীমকুমার বাড়ৈ মৃত্যুঞ্জয় কুমার সিংহ যশোধরা রায়চৌধুরী প্রচেত গুপ্ত, উপাচার্য ও শিক্ষকবৃন্দও। গবেষণা-নিবন্ধ পড়লেন ছাত্রছাত্রীরা, বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিল্ম সোসাইটির উদ্যোগে সাহিত্য ও সিনেমার আন্তঃসম্পর্ক নিয়ে কথালাপে ছিলেন সৃজিত মুখোপাধ্যায় ও আবীর চট্টোপাধ্যায়। আগামী ২৮ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে ১১টায় ডিরোজিয়ো হল-এ বলবেন রামকুমার মুখোপাধ্যায়, পরে শিক্ষার্থীদের শ্রুতি ও গীতি-আলেখ্য, নাট্য-উপস্থাপনা সব্যসাচী। এতেই শেষ নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্ট্রাল লাইব্রেরিতে এই তিন দিন হচ্ছে শরৎচন্দ্রের জীবন ও সাহিত্য নিয়ে তথ্য ও গ্রন্থ-প্রদর্শনী, ১১টা-৫টা। ছবি, প্রচারপত্র থেকে।
প্রবর্তক
বাংলা টপ্পা গানের জনক রামনিধি গুপ্ত তথা নিধুবাবু, অষ্টাদশ শতকের শেষ ও উনিশ শতকের প্রথম ভাগে বাংলা গানে আনেন নতুন স্রোত। উত্তর ভারতীয় টপ্পা গানের সুররীতিতে বাংলা ভাষার মাধুর্য মিশিয়ে তৈরি হয় স্বতন্ত্র এক সঙ্গীতধারা, প্রেম বিরহ আকুলতা ও মানসিক অনুভূতি প্রাণ পেয়েছিল তাতে। যাদবপুরের ইন্দুমতী সভাগৃহে আগামী ১ অক্টোবর বিকেল ৫টায় নিধুবাবু স্মরণে বিশেষ অনুষ্ঠানের উদ্যোগ করেছে সুরনন্দন ভারতী, প্রকাশিত হবে রা পত্রিকার বিশেষ সংখ্যা, ‘নিধুবাবু: বাংলায় নবযুগের প্রবর্তক’। শিল্পীদের নিবেদনে নিধুবাবুর টপ্পা, টপ্পার সঙ্গে নাচ, গান ও আবৃত্তি, সরোদবাদন, বক্তৃতা।
নতুন ভাবনায়
১৯৫৪ সালে মঞ্চে ‘বহুরূপী’র রক্তকরবী-র যে কিংবদন্তিপ্রতিম প্রযোজনা, তাতে ‘রাজা’ চরিত্রের দাপুটে রাজকীয় মহিমা যে ভাবে বিন্যস্ত হয় শম্ভু মিত্রের নির্দেশনায়; ১৯৯৮ সালে প্রণয়কুমার কুন্ডুর দাক্ষিণ্যে কবিকৃত রক্তকরবী-র দশটি পাণ্ডুলিপির মহার্ঘ উন্মোচনের ফলে তা থেকে সরে এসে ‘যক্ষপুরী’র বাস্তবঘন সত্তা নাটকটির নতুন পাঠ ও নতুন ভাষ্য তৈরি করল— বলছিলেন শমীক বন্দ্যোপাধ্যায়। এর একাধিক প্রয়োগ ঘটেছে ইতিমধ্যে, কলকাতা, দিল্লিতে। দিল্লির নাট্যদল ‘স্বপ্ন এখন’ তাদের প্রযোজনা রক্তকরবী মঞ্চে আনছে আজ সন্ধে সাড়ে ৬টায় অ্যাকাডেমিতে, শমীক রায়ের নির্দেশনায়। “রবীন্দ্রনাথের এই নাটক একশো বছর পেরিয়ে আরও প্রাসঙ্গিক, তা নিয়েই আমাদের নতুন ভাবনার রক্তকরবী,” জানালেন নির্দেশক।
স্মরণে
মদ্যপান-বিরোধী আন্দোলন, শ্রমিকদের দাবিতে সরব হওয়া— অধুনা ছত্তীসগঢ়ের ভিলাই-সহ দেশের শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে ওতপ্রোত শংকর গুহ নিয়োগীর নাম। ১৯৯১-এর ২৮ সেপ্টেম্বর ঘুমন্ত অবস্থায় গুলিতে নিহত হন তিনি। কর্মিষ্ঠ মানুষটির প্রয়াণদিনে, আগামী সোমবার সন্ধ্যা ৬টায় রামমোহন লাইব্রেরি হল-এ স্মরণ-অনুষ্ঠান: প্রকাশ পাবে পুণ্যব্রত গুণের শংকর গুহ নিয়োগীর সঙ্গে কয়েক বছর বইটির পরিমার্জিত সংস্করণ, মধ্যপ্রদেশের শ্রমিক আন্দোলনের অনুপুঙ্খ সেখানে। দেখানো হবে তথ্যচিত্র এক মৌত: কুছ সওয়াল। অসীম চৌধুরী ও শিবানন্দ মুখোপাধ্যায়ের এই ছবিতে দল্লি-রাজহরার শহিদ হাসপাতালের তিন প্রাক্তন চিকিৎসকের কথায় উঠে এসেছে আন্দোলনের পূর্বাপর। জনতার অনুদানে তৈরি ছবিটির নির্মাণপর্ব নিয়েও বেরোবে একটি বই।
বাঁশি শুনে
বাঁশির ভিতরটা ফাঁকা। সে-ই তার সবচেয়ে বড় শক্তি, কারণ সেই শূন্যতার মধ্য দিয়েই প্রবাহিত হয় সুর। রবীন্দ্রনাথে এসে সে সুর হয়ে ওঠে নিজের ভিতরের এক দীর্ঘ যাত্রা। বাঁশির সুর তখন প্রেমের ডাক, বিরহের ভাষা, না-বলা কথার আশ্রয়। অসীমের সঙ্গে মানুষের যোগের সুরও। মানুষ যখন নিজের অহঙ্কারের শব্দ থামাতে পারে, তখনই শোনা যায় অসীমের সুর। রবীন্দ্রনাথের বাঁশি তাই বাজতে থাকে ব্যক্তি থেকে বিশ্বে, নীরবতা থেকে সঙ্গীতে। গৌরব মজুমদার ও শান্তিময় ঘোষ পাঠাগারের উদ্যোগে আজ ২৬ সেপ্টেম্বর বিকেল সাড়ে ৫টায় হাতিবাগানের আস্থা কমিউনিটি হল-এ ‘রবীন্দ্রসঙ্গীতে বাঁশি: সুরে সুরে বাঁশি পুরে’ প্রসঙ্গে বলবেন জয়িতা বন্দ্যোপাধ্যায়, সঙ্গে গাইবেন গানও। থাকবেন বিনয় বসু মল্লিক, সীমা চক্রবর্তী প্রমুখ বিশিষ্টজন।
পারম্পরিক
বাংলায় তাঁর বই প্রথম বেরোয় ২০১৫-য় ‘দেবভাষা’ থেকে, সাক্ষাৎকার: কে জি সুব্রহ্মণ্যন। সেখানে শিল্পী বলছেন, বরোদায় পড়াতে এসে মনে হল, শিল্প-ইতিহাস, নন্দনতত্ত্ব নিয়ে তুলনামূলক আলোচনা বড় প্রয়োজন। শুরু হল নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করা আর উত্তর লিখে রাখা। এরই ফল ১৯৮৭-তে প্রকাশিত বই দ্য লিভিং ট্রাডিশন। প্রায় চার দশক পেরিয়ে সেই বই বাংলা ভাষায় বেরোল ‘দেবভাষা’ থেকেই, শমীক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাষান্তরে সেই জিয়ন্ত পরম্পরা। আড়াই বছর ধরে করেছেন এই কাজ, সুব্রহ্মণ্যনের মূল ইংরেজি পাণ্ডুলিপির গ্রন্থজন্মও তাঁরই তত্ত্বাবধানে। গতকাল সন্ধেয় প্রকাশ-অনুষ্ঠানে ছিলেন গুণিজনেরা। সঙ্গে শুরু হল শারদ চিত্রপ্রদর্শনী ‘ড্রয়িংস’: যামিনী রায় অতুল বসু গোপাল ঘোষ সোমনাথ হোর কে জি সুব্রহ্মণ্যন রবীন মণ্ডল সনৎ কর (ছবি) রামানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায় (ছবি) গণেশ হালুই যোগেন চৌধুরীর চিত্রকৃতি। ছুটির দিন বাদে ৭ অক্টোবর অবধি, ২টো-৮টা।
খুশির মেলা
ডিসেম্বরে জন্মদিন পাটুলি উপনগরীর অন্য রকম পাঠশালা, রোকেয়া শিক্ষাকেন্দ্রের। সেই খুশিতে, শারদোৎসবের মুখে চারুকলা প্রদর্শনী ও হস্তশিল্প মেলা আগামী ২-৪ অক্টোবর পাটুলি এম ব্লকে, তাদের চারুকলা ও কারিগরি শিক্ষা বিভাগের উদ্যোগে। ২টো-৯টা শিক্ষাকেন্দ্রের ছাত্রছাত্রীদের চিত্র-ভাস্কর্য প্রদর্শনী, ‘রোকেয়া রঙমশাল’ নাট্যদলের থিয়েটার আর্ট প্রদর্শনীও। অবিভক্ত বাংলার দুই অগ্রণী ছাপাই-শিল্পী, চিত্তপ্রসাদ ও হরেন দাসের কাজের সঙ্গে পরিচয় করাবেন অনন্যা দালাল, ৩ তারিখ বেলা ১২টায়। ছোটদের জন্য হবে ছাপাই-ছবি কর্মশালা। সেদিন সন্ধে ৬টায় সুদেষ্ণা মৈত্র শোনাবেন ‘একসাথে বাঁচার গল্প’। মেলায় থাকবে রোকেয়া কারিগর গোষ্ঠীর পোড়ামাটির ভাস্কর্য (ছবি), নকশিকাঁথা, ব্লক প্রিন্ট কাঁথাস্টিচ কুরুশ বাঁধনী বাটিকের নানান কাজ, মাটি ও পোড়ামাটির গয়না, পটচিত্র-সরাচিত্র, পুনর্ব্যবহৃত কাপড়ের ব্যাগ, ভেষজ সাবান। সঙ্গে নারকেল-নাড়ু তালের বড়া পায়েস ঠেকুয়া কেক কাস্টার্ড— কী নয়!
চোখের বাহিরে
দৃষ্টিহীনতা যে জীবনের স্বপ্নপূরণের পথে বাধা হতে পারে না, দেখিয়ে দিচ্ছেন রামকৃষ্ণ মিশন ব্লাইন্ড বয়েজ় অ্যাকাডেমি নরেন্দ্রপুরের ছাত্ররা। শুধু শস্য ও আনাজ চাষই করেন না তাঁরা, ফলের বাগান, মাশরুম চাষ, হাঁস-মুরগি ছাগল পালনের প্রশিক্ষণও নেন। স্পর্শের মাধ্যমে মাটির আর্দ্রতা বোঝা, পাতার গন্ধ ও গঠন চেনা, পশুপাখির ডাক শুনে তাদের প্রয়োজন বুঝতে পারা— প্রতিদিনের এই কাজই তাঁদের কাছে হয়ে উঠেছে শিক্ষা ও স্বনির্ভরতার দিশা। ছাত্রদের এই সবুজের অভিযান গভীর ভাবে প্রাণিত করেছে জাতীয় পুরস্কারজয়ী তথ্যচিত্রকার জয়দীপ মুখোপাধ্যায়কে। তারই ফসল নতুন তথ্যচিত্র ব্লাইন্ড হারভেস্ট: ফার্মিং বিয়ন্ড সাইট। কৃষিকাজ ও পশুপালন ঘিরে দৃষ্টিহীন ছাত্রদের স্বনির্ভর হয়ে ওঠার লড়াইকে অন্তরে ধরা ছবিটি সম্প্রতি স্লোভাকিয়ার ব্রাতিস্লাভায় আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে সুযোগ পেয়েছে।