মেট্রোয় দৈনিক যাত্রী বেড়েছে গড়ে দু’লক্ষ। এত দিন পুজোর কেনাকাটার যে ভিড় হচ্ছিল, তার সঙ্গেই এ বার যুক্ত হয়েছে মণ্ডপে মণ্ডপে ঘোরার পুজো-জনতা। আর বহু অফিস শুক্রবার পর্যন্ত খোলা থাকায় মেট্রোর নিত্যযাত্রীরা তো ছিলেনই। এই ত্রিমুখী চাপে মেট্রো রেলে কার্যত তিল ধারণের জায়গা থাকছে না দুপুর থেকেই। পরিষেবা স্বাভাবিক রাখতে গিয়ে কার্যত নাভিশ্বাস উঠছে মেট্রো রেল কর্তৃপক্ষের। প্রবল ভিড়ের কারণে যে স্টেশনে ৩০ সেকেন্ড দাঁড়ানোর কথা, সেখানেও দেড় থেকে দু’মিনিট দাঁড়াতে হচ্ছে বলে ভুক্তভোগীদের দাবি। কোথাও ভিড় ঠেলে ওঠা যাত্রীর কনুই সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে, কোথাও ঠেলেও কামরার ভিতরে ঢোকানো যাচ্ছে না যাত্রীর কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ।
এই ভিড়ই এর পরে বিভিন্ন মেট্রো স্টেশনে নেমে বিভিন্ন মণ্ডপে ছড়িয়ে পড়ছে বিকেলের পর থেকে। দুপুর থেকে যে পুজো-জনতার ঢল দেখা যাচ্ছে, রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই তাদের সংখ্যা বাড়ছে। পুজোর উদ্যোক্তাদের দাবি, এ বার বহু পুজোর উদ্বোধন গত বারের তুলনায় দেরিতে হয়েছে। তাই গত বছর যে ভিড় দ্বিতীয়া বা তৃতীয়া থেকে চোখে পড়ছিল, এ বছর সেটাই দেখা যাচ্ছে পঞ্চমী থেকে। পঞ্চমী এবং ষষ্ঠীর ভিড়ের বেশির ভাগই কম বয়সি। ‘ফোরাম ফর দুর্গোৎসব’-এর সম্পাদক তথা বালিগঞ্জ কালচারালের পুজো উদ্যোক্তা অঞ্জন উকিল বললেন, ‘‘মানুষের ঢলই আমাদের ভাল লাগে। এতগুলো মাসের খাটাখাটনির পরে ভিড় না হলে চলে! তবে, এখনও পর্যন্ত তরুণ-তরুণীদের ভিড়ই বেশি।’’
এ বারও জনতার ঢল সন্তোষ মিত্র স্কোয়্যারে। ওই পুজোর উদ্যোক্তা সজল ঘোষের দাবি, ‘‘অনেকে আমাদের পুজোয় যাতায়াতের সুবিধার কথা বলেন। সেই কারণেই নাকি ভিড় হয়। কিন্তু আমাদের থিমও ভাল হয়। তবে, রাস্তার হাল দেখে মনে হচ্ছে, যাতায়াত এ বার আর একটু ভাল হওয়া দরকার।’’ এ দিন দুপুর থেকেই বিভিন্ন পুরস্কারের ঘোষণা শুরু হয়েছে। পুরস্কার পাওয়া মণ্ডপেও সেই কারণে ভিড় বাড়তে শুরু করেছে সন্ধ্যার পরে।
একই ভাবে ‘আড্ডা জ়োন’ হিসাবে পরিচিত ম্যাডক্স স্কোয়্যার এবং বাগবাজার সর্বজনীন দুর্গোৎসব ও প্রদর্শনীর মণ্ডপ চত্বরেও উপচে পড়া ভিড়। সেখানে মেলার আকর্ষণে পৌঁছেছেন অনেকেই। এমনই মেলার ভিড় কুমোরটুলি পার্ক সর্বজনীন পুজো মণ্ডপ চত্বরেও। হাতিবাগান সর্বজনীনের পুজো উদ্যোক্তা শাশ্বত বসু বলছেন, ‘‘সপ্তমী থেকে আসল পুজো দেখা শুরু। তার আগে রাস্তার অবস্থা আর একটু ভাল হোক।’’ এর মধ্যেই পুলিশ বিশৃঙ্খলার অভিযোগে গ্রেফতার করেছে ২৮ জনকে। উদ্ধার হয়েছে প্রায় চার লিটার মদ। ট্র্যাফিক পুলিশ পদক্ষেপ করেছে প্রায় ৩৩৪টি ক্ষেত্রে।
পুজো দেখার লাইনেও চলছে পথের ভোগান্তির চর্চা। সেখানে অনেকেরই দাবি, রাস্তা কার্যত বেহাল। চতুর্থী থেকে বাড়তি পুলিশকর্মী নামানোর ঘোষণা লালবাজার করে রাখলেও কার্যক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, এক ঘণ্টার রাস্তা পেরোতে কোথাও চার ঘণ্টা সময় কেটে যাচ্ছে। কোথাও ৩০ মিনিটের পথ ঘুরপথে যেতে লাগছে দেড় ঘণ্টা। এর মধ্যে ধাক্কা খেয়ে হলেও সহজে কোথাও পৌঁছনোর জন্য প্রধান ভরসা মেট্রো। মেট্রো রেল সূত্রের খবর, পঞ্চমী এবং ষষ্ঠীতে সকাল ৬টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত ট্রেন চালানো হয়েছে। সপ্তমী থেকে নবমী পর্যন্ত দুপুর ১টা থেকে পরের দিন ভোর ৪টে পর্যন্ত চলবে মেট্রো। তাতেও এত সংখ্যক যাত্রী মেট্রোয় উঠছেন যে, সামাল দেওয়া কঠিন হচ্ছে। গিরিশ পার্কে মেট্রোয় ঢোকার লাইনে দাঁড়ানো এক ব্যক্তি যেমন বললেন, ‘‘মেট্রোয় কর্মীর অভাব স্পষ্ট। স্টেশনগুলিতে পর্যাপ্ত সংখ্যক রেল পুলিশও দেখা যাচ্ছে না। অনেকেই রয়েছেন, যাঁরা মেট্রো রেলে চড়ার ব্যাপারে সড়গড় নন। টিকিট স্ক্যান করে ঢোকা বা বেরোনোর জায়গায় তাঁদের সাহায্য করার মতোও কেউ নেই।’’
এই নিয়েই পার্ক স্ট্রিট স্টেশনে নামার মুখে এক তরুণীর মন্তব্য, ‘‘পার্ক স্ট্রিটে দুর্গা দেখতে আসা এই প্রথম। ধাক্কা খেয়ে হলেও যে পথ যত কম সময়ে এলাম, মেট্রো ছাড়া সম্ভবই হত না। পুজোয় ভিড় হোক, পথের চেহারাও একটু ফিরুক।’’