চুলটা তাঁর প্রিয়তম ফুটবলার কুকুরেয়ার মতো কোঁকড়া-কোঁকড়া ঝাঁকড়া-ঝাঁকড়া করতে চান প্রিয়া ঘোষ। সেমিফাইনালে জয়ের পরেই উত্তর স্পেনের গালিসিয়ায় হামলে পড়ে পার্লারে নাম লিখিয়েছেন। আজ, রবিবার দিনভর হুল্লোড়-আমোদের আগে ৭২ ইউরো খসিয়ে কেশসজ্জার আয়োজন। এ ছাড়া জীবনটাই বৃথা!
কলকাতার বেহালার বৌমা, অধুনা হায়দরাবাদবাসী রোক্সানা আকোস্তা সোসা অবশ্য ফাইনালের আগে এত পরীক্ষা-নিরীক্ষা ভাবতেই পারেন না! আর্জেন্টিনার কোরিয়েন্তেসের মেয়ের কঠিন নিয়ম! প্রতিটা জয়ের ম্যাচেই যা যা করেছিলেন, পুজোর নিয়মের মতো হুবহু সেটা করা চাই! আইটি পেশাদার বর চিরঞ্জীব ঠাকুর কাজের চাপে আর্জেন্টিনার সব খেলা দেখতে পাননি। নিজের দেশ, প্রিয়জন থেকে বহু দূরে অন্য গোলার্ধে তাই ল্যাপটপে একদম একা খেলা দেখবেন রোক্সানা। মিশর ম্যাচে সঙ্কটের মুহূর্তে চিরঞ্জীব একবার ঘরে ঢুকে ‘এ কী হল’ করে ওঠায় রোক্সানার মুখ গম্ভীর। ‘যাও তো অন্য ঘরে খেলা দেখো, ম্যাচের সময়ে ওদের নিন্দেমন্দ করবে না’, বরকে তেড়ে বকেছেন।
গালিসিয়ায় শান্তিনিকেতনের মেয়ে প্রিয়া আট বছর আর তাঁর বর, শান্তিনিকেতনেরই তোতন কুণ্ডু ১৬ বছর রয়েছেন। তোতনের নিজস্ব পর্যটন সংস্থা ‘বিয়াখেস কুণ্ডু’! স্পেনের খেলা থাকলে শহরের প্রাণকেন্দ্র প্লাসা মায়োরে বসতে তাঁদের প্রাণ হাঁকপাঁক করে। তোতনের মনে পড়ছে, স্পেনের প্রথম বিশ্বজয়ের ঠিক আগে ও-দেশে এসেছিলেন। প্রিয়া মুগ্ধ, স্পেনকে এখন নিজের দেশই মনে হয়! কত সহজে ওরা আপন করে নিয়েছে। কলকাতার ইন্দো-হিস্পানিক ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যাকাডেমির কর্ণধার স্প্যানিশ শিক্ষক দিব্যজ্যোতি মুখোপাধ্যায় বলছিলেন, “স্প্যানিশ দুনিয়ার দুটো দেশ ফাইনালে ওঠায় সারা পৃথিবী থেকে আমাদের বন্ধু বা ছাত্রদের মেসেজে ফোন ভর্তি।” কলকাতায় প্রথম সফরে মেসির দোভাষী ছিলেন দিব্যজ্যোতি। ফাইনালে সমর্থন নিয়ে দোটানায়। কিন্তু স্পেন, আর্জেন্টিনার সঙ্গে জুড়ে থাকা ভারতীয়েরা নিজস্ব শিবির খুঁজে নিয়েছেন। আর্জেন্টিনায় বাঙালি বলতে বাংলাদেশিরাই বেশি। ভারতীয়রা বেশির ভাগই বুয়েনোস আইরেসের দিকটায়।
চার দশকের বুয়েনোস আইরেসবাসী বস্ত্র ব্যবসায়ী ষাটোর্ধ্ব মনোজ মেঙ্ঘানি বলছিলেন, “আর্জেন্টিনাকে ভাল না-বেসে পারা যায় না! মারাদোনার বিশ্বজয়ের সময়েও আমি মেক্সিকোয় ছিলাম। এ বার সেমিফাইনালে জেতার পরে জনজোয়ারে শহরে গাড়ি, মেট্রো বন্ধ হয়ে গেল। শহরের একটু বাইরে হেঁটে বাড়ি ফিরতে রাত তিনটে!” আর্জেন্টিনার বিকেল ৪টেয় ম্যাচ শুরু। মনোজ, তাঁর আর্জেন্টিনীয় স্ত্রী, গোটা পরিবারসুদ্ধ বার্বিকিউ করতে করতে খেলা দেখবেন।
মোচ্ছবে কম যায় না স্পেনও। প্রিয়া-তোতনরা দুপুর থেকে সাংগ্রিয়া, ভেরমুথের পেয়ালা নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে বসবেন। ম্যাচ স্থানীয় সময় রাত ৯টায়। স্পেন জিতলে সোমবার সকাল পর্যন্ত পার্টি গড়াবে। হাওড়ার মেয়ে পুনম মিশ্র ১৭ বছরের টেনিস খেলুড়ে কন্যা সানভি আর ৭ বছরের খুদে ফুটবলার সনভকে নিয়ে বার্সিলোনায় থাকেন। বর সৌরভও কলকাতার ব্যবসায়ী। ছেলেমেয়েকে খেলোয়াড় তৈরি করতে স্পেনকেই তাঁরা বেছেছেন। সৌরভ মেসিভক্ত। গোটা পরিবার আজ তাঁর প্রতিপক্ষ।
তোতন বললেন, উত্তরসূরি ইয়ামাল জিতলে তো মেসিও জিতবেন। কলকাতার আর্জেন্টিনীয় বধূ রোক্সানা অবশ্য তা ভাবতে গররাজি। তাঁর কাছে আর্জেন্টিনার এক-একটা ম্যাচ যেন তপস্যার নামান্তর। ফুটবলের ভালবাসা, যন্ত্রণায় বন্দি মেয়ের আকূতি, ফাইনালটা কি একটু কম রুদ্ধশ্বাস হতে পারে না?