এ যেন লড়াইয়ের উত্তরাধিকার। বাঘা যতীন স্টেশনে বছর দশেকের কুলজিৎ হালদার যেন তারই প্রতিচ্ছবি।
রাজ্যে পালাবদলের পরে বুলডোজ়ার দিয়ে হকার উচ্ছেদের পালা চলছেই। গত ১ জুন রেলের তরফে সরে যাওয়ার নোটিস পেয়েছিলেন বাঘা যতীন স্টেশন চত্বরে থাকা দোকানদার ও হকারেরা। তখন থেকেই রাতপাহারা দিচ্ছেন হকারেরা ও তাঁদের পরিবার। তাঁদেরই এক জন কুলজিতের মা-বাবা। বাঘা যতীন স্টেশন চত্বরে পোশাকের দোকান রয়েছে তাঁদের। আর সেই যুদ্ধে তাঁদের সঙ্গী খুদে কুলজিৎও। স্থানীয় একটি স্কুলে পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র সে। যদিও এত লড়াই বোঝে না সে। শুধু বোঝে, কঠিন সময়ে সে একা থাকতে চায় না। তাই মায়ের সঙ্গে প্রতি রাত স্টেশনেই বসে কাটছে তার। ছেলের কথা বলতে কান্নাভেজা চোখে-মুখেও একরাশ আলো মা সোনালি হালদারের। বললেন, ‘‘রোজ বাড়ি চলে যেতে বলি। ও শোনে না।’’
রবিবার রাতে যাদবপুর রেল স্টেশন সংলগ্ন এলাকায় উচ্ছেদের ২৪ ঘণ্টা কাটতে না কাটতেই আতঙ্ক জাঁকিয়ে বসেছিল বাঘা যতীন স্টেশনেও। কারণ, সোমবার রাত থেকেই সেখানে এনে রাখা হতে থাকে পুলিশের একাধিক গার্ডরেল। যা দেখে আতঙ্ক ছড়ায় স্থানীয় হকারদের মধ্যে। সোমবার রাতে সেখানে পৌঁছে দেখা যায়, কেউ স্টল থেকে জিনিসপত্র সরাচ্ছেন। কাউকে আবার দেখা যায় অস্থায়ী গুমটি ঠেলতে ঠেলতে স্টেশনের বাইরে
নিয়ে যাচ্ছেন। তখনই স্টেশন চত্বরে মায়ের পাশে দেখা মেলে খুদে কুলজিতের।
উন্নয়নের নামে বিভিন্ন স্টেশনে এই উচ্ছেদ অভিযানের পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তি রয়েছে। সে সব মাথায় ঢোকে না ওই বালকের। সে শুধু বলে, ‘‘দোকান ভাঙা পড়বে। তাই মা রোজ রাতে পাহারা দেয়। আমিও মায়ের পাশে থাকি।’’ আর কুলজিৎকে দেখেই লড়াই করার শক্তি পান বাকি রাতজাগা দোকানদারেরাও। তাঁদের মতো দশা যেন আগামী দিনে কুলজিৎদের না হয়,
তাই এই লড়াই— এ কথা ভেবেই নিজেদের মনোবল বাড়াচ্ছেন তাঁরা। ছোট্ট কুলজিৎ যেন নিজের অজানতেই হয়ে উঠেছে তাঁদের শক্তি, তাঁদের প্রেরণা।
রেলযাত্রী হকার সমন্বয় কমিটির নেত্রী কল্পনা দত্তও মনে করছেন, আশা-আশঙ্কার মধ্যেই বাঘা যতীন স্টেশনে রাতজাগা খুদে কুলজিৎ যেন এক টুকরো আলো। তিনি বলেন, ‘‘এই বয়সেই ও জেনে গিয়েছে, মানুষের পাশে থাকতে হয়। একা বাঁচা যায় না। এই কঠিন সময়ে সকলে এ ভাবেই এগিয়ে আসুক, সেটাই কাম্য।’’