বিধানসভা ভোটের ফল প্রকাশ হয়েছে গত ৪ মে। আর, গত ১৩ মে থেকেই কার্যত ‘অচল’ কলকাতা পুরসভার জন্ম-মৃত্যুর শংসাপত্র সংক্রান্ত পোর্টাল। যার জেরে গত পাঁচ মাস ধরে পুরভবনে জন্ম-মৃত্যুর শংসাপত্র আনতে গিয়ে প্রবল হয়রানির শিকার হয়েছেন দূর-দূরান্ত থেকে আসা বহু মানুষ। অগস্ট থেকে পোর্টাল ফের চালু হলেও নানা জটিলতায় স্লট বুক করার পরেও জন্ম-মৃত্যুর শংসাপত্র হাতে পেতে বেশ দেরি হচ্ছে বলে অভিযোগ। কলকাতা পুরসভার স্বাস্থ্য বিভাগের এক আধিকারিক অভিযোগ স্বীকার করে নিয়ে বলেন, ‘‘দীর্ঘ দিন পোর্টাল বন্ধ থাকায় জন্ম-মৃত্যুর শংসাপত্র পেতে ভিড় হচ্ছে। ফলে, স্লট বুক করার পরেও শংসাপত্র হাতে পেতে এক থেকে দু’মাস লেগে যাচ্ছে। ধীরে ধীরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে।’’
রাজ্যে পালাবদলের পরে কলকাতা পুরসভার মাথায় প্রশাসক বসানো হয়েছে। যদিও গত পাঁচ মাসে নতুন সরকারের আমলে পুরসভার স্বাস্থ্য বিভাগের পরিষেবা নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ উঠেছে। পুরসভার প্রাক্তন বাম পুরপ্রতিনিধি মধুছন্দা দেবের অভিযোগ, ‘‘জন্ম-মৃত্যুর শংসাপত্রের পোর্টালটি দীর্ঘ চার মাস বন্ধ থাকার পরে চালু হলেও তা এখনও কার্যত অচল। কারণ, বহু মানুষ ওয়টস্যাপে স্লট বুক করেও অন্তত এক মাসের আগে তারিখ পাচ্ছেন না। অথচ, জন্ম-মৃত্যুর শংসাপত্র দ্রুত পাওয়া জরুরি। মানুষ চূড়ান্ত হয়রান হচ্ছেন।’’ মধুছন্দার আরও অভিযোগ, ‘‘কেবল জন্ম-মৃত্যুর পোর্টালই নয়, এই সময়টা ডেঙ্গির মরসুম। অথচ, পুরসভার ভেক্টর কন্ট্রোল বিভাগের কর্মীদের ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে সে ভাবে দেখা যায়নি। আশাকর্মীরা এই সময়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে জ্বরের তথ্য নেন। কিন্তু গত ক’মাসে তাঁদের মুখ্যমন্ত্রী স্বাস্থ্য বিমা থেকে শুরু করে অন্নপূর্ণা যোজনার কাজে নিযুক্ত করা হয়েছে।’’
পুর স্বাস্থ্য বিভাগের আধিকারিকদের একাংশ স্বীকার করছেন, বর্তমানে পুরসভা প্রশাসকের নিয়ন্ত্রণে থাকায় নানাবিধ সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। যেমন, বর্তমানে কোনও ওয়ার্ডে পুরপ্রতিনিধি না-থাকায় ওয়ার্ড-ভিত্তিক নজরদারির অভাব থেকে যাচ্ছে। এই প্রসঙ্গে পুরসভার এক স্বাস্থ্য আধিকারিক বলেন, ‘‘কোনও ওয়ার্ডে জ্বর বা ডেঙ্গির সংক্রমণ ঘটলে সেই খবর অনেক ক্ষেত্রেই আমরা সেখানকার পুরপ্রতিনিধির মাধ্যমে পেতাম। তখন ওই এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হত। ভেক্টর কন্ট্রোল বিভাগের কর্মীরা গিয়ে মশার লার্ভা মারার কাজ করতেন। কিন্তু এখন তো পুরপ্রতিনিধিরাই নেই। ফলে, সমস্যা হচ্ছেই।’’
গত পাঁচ মাসে পুর স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে জন্ম-মৃত্যুর শংসাপত্র পেতে গিয়ে মানুষের হয়রানি দেখে মাথায় হাত পুর স্বাস্থ্য আধিকারিকদের। পাসপোর্টের আবেদন, সন্তানকে স্কুলে ভর্তি করানো, ভোটার তালিকায় নাম তোলা থেকে শুরু করে নানা জরুরি প্রয়োজনে জন্মের শংসাপত্রের প্রয়োজন হয়। একই ভাবে মৃত্যুর শংসাপত্রও অনেক জায়গায় লাগে। কিন্তু দীর্ঘ দিন ধরে পোর্টাল বন্ধ থাকায় অসংখ্য আবেদন জমে রয়েছে। জন্মের হারিয়ে যাওয়া শংসাপত্রের প্রতিলিপি পেতে সম্প্রতি কয়েক জন পুরসভার সংশ্লিষ্ট বিভাগে এসেছিলেন। তাঁদেরই এক জন বললেন, ‘‘আমাকে কয়েক দিনের মধ্যেই বিদেশে যেতে হবে। জন্মের সার্টিফিকেটের প্রতিলিপি নিতে এসেছি। কিন্তু এখান থেকে বলা হচ্ছে, পেতে দেরি হবে। কী করব, বুঝে উঠতে পারছি না।’’
পুরসভার প্রাক্তন মেয়র পারিষদ (স্বাস্থ্য) অতীন ঘোষের অভিযোগ, ‘‘জন্ম-মৃত্যুর পোর্টালের সমস্যা তো আছেই। আমরা পুরবোর্ডে থাকাকালীন মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধে বছরভর কর্মসূচি করতাম। পুরসভার বিভিন্ন দফতরের আধিকারিকদের সঙ্গে বরো-ভিত্তিক বৈঠক, ম্যালেরিয়া-ডেঙ্গি দূরীকরণে সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে প্রচারমূলক কর্মসূচি চলত। ডেঙ্গির মরসুমে জুন মাস থেকে স্বাস্থ্যকর্মীদের নিয়ে আমি নিজে বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করতাম। পুর প্রশাসক দায়িত্ব নেওয়ার পরে সেই কাজে খামতি দেখা যাচ্ছে।’’ পুরসভার প্রাক্তন বিজেপি পুরপ্রতিনিধি তথা বরাহনগর বিধানসভা কেন্দ্রের বিধায়ক সজল ঘোষের সাফ কথা, ‘‘বিধানসভা ভোটের আগে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) চলাকালীন নাগরিকদের জন্ম-মৃত্যুর শংসাপত্রের প্রতিলিপি দেওয়ার ক্ষেত্রে বিগত তৃণমূল পরিচালিত সরকার তথা পুরবোর্ড দুর্নীতি করেছে। সেই দুর্নীতির তদন্ত করতেই পোর্টাল বন্ধ ছিল। এখন স্বাভাবিক হয়েছে। বিরোধীরা কেবল রাজনীতি করতেই মিথ্যা অভিযোগ আনছেন।’’
এই প্রসঙ্গে জানতে চেয়ে পুরসভার বর্তমান প্রশাসক তথা পুর কমিশনার স্মিতা পাণ্ডেকে ফোন করা হলে সেটি বেজে গিয়েছে। এসএমএস বা ওয়টস্যাপ করা হলেও উত্তর মেলেনি।