E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

লক্ষ্মীলাভের লড়াইয়ে স্টেশন থেকে উচ্ছেদ হওয়া বাস্তবের লক্ষ্মীরা

মে মাসে সরকার বদলের পরে শহরের একাধিক স্টেশনে হয়েছে হকার উচ্ছেদ। স্থায়ী দোকান হারিয়েছেন অনেক মহিলা হকারও। কী ভাবে দিন চলছে তাঁদের? জবাবে পুতুল জানালেন, ছোট ছেলে মাধ্যমিক দিয়েছিল এ বছর।

হিন্দোল ভট্টাচার্য

শেষ আপডেট: ২৫ অক্টোবর ২০২৬ ০৭:৫৬
শিয়ালদহ স্টেশনের মহিলা হকারেরা ব্যাগে গুছিয়ে নিচ্ছেন বিকিকিনির জিনিস। দোকান হারিয়ে এ ভাবেই চলছে ব্যবসা।

শিয়ালদহ স্টেশনের মহিলা হকারেরা ব্যাগে গুছিয়ে নিচ্ছেন বিকিকিনির জিনিস। দোকান হারিয়ে এ ভাবেই চলছে ব্যবসা। ছবি: বিশ্বনাথ বণিক।

‘‘মা লক্ষ্মী এ বছর মুখ ফিরিয়েছেন।’’ পেঁয়াজ কাটতে কাটতেই কথাটা বলে উঠলেন বছর পঁয়তাল্লিশের পুতুল সাহা। আগরপাড়ার পুতুলের হাত চলছে, চোখ রাখতে হচ্ছে চারপাশেও। ঘুগনি-পাউরুটি বিক্রির জন্য যতটুকু প্রস্তুতি, তা সেরেই উঠতে হবে ট্রেনে।

মে মাসে সরকার বদলের পরে শহরের একাধিক স্টেশনে হয়েছে হকার উচ্ছেদ। স্থায়ী দোকান হারিয়েছেন অনেক মহিলা হকারও। কী ভাবে দিন চলছে তাঁদের? জবাবে পুতুল জানালেন, ছোট ছেলে মাধ্যমিক দিয়েছিল এ বছর। বড় ছেলে সম্প্রতি একটি শাড়ি কারখানায় কাজে ঢুকেছেন। সংসারের মূল দায়িত্বই পুতুলের কাঁধে।

কাঁচরাপাড়া থেকে আসা হকার ছায়া আইচের সংসারেও টানাপড়েনের চিত্র। স্বামী অসুস্থ হয়ে পড়ায় তাঁর ব্যবসার হাল ধরেছেন ছায়া। দোকান না থাকায় ঘুরে ঘুরে জল বিক্রি করছেন তিনি। ছায়া বলেন, “ছেলের পড়াশোনা থেকে শুরু করে ছোট মেয়েকে দেখাশোনা, সবই একা হাতে সামলাচ্ছি। এত সহজে হাল ছাড়ব না।”

শিয়ালদহের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে এমন মহিলা হকার রয়েছেন অন্তত ১০-১৫ জন। কারও ব্যবসা ৪০ বছরের, কারও ৫০ বছর। কিন্তু ব্যবসার অবস্থা কি সত্যিই ভাল? তাঁরা জানাচ্ছেন, দিনে ৬০০-৭০০ টাকার বেশি রোজগার হচ্ছে না। পাশাপাশি, রেল পুলিশ ধরলে গুনতে হচ্ছে দু’হাজার টাকার ফাইন। তবুও লড়াই থামাচ্ছেন না পুতুল-ছায়া-সবিতা-মিঠুরা।

তিন নম্বর প্ল্যাটফর্মে ছোলামাখা বিক্রি করতেন ৬৫ বছরের সবিতা সাহা। শ্যামনগর থেকে প্রতিদিন স্টেশনে এসে দোকান চালাতেন তিনি। দোকান হারালেও এখন রোজ স্টেশনে ঘুরেই ব্যবসা চালাচ্ছেন তিনি। ছোলা মাখতে মাখতে সবিতা জানালেন, মেয়েদের বিয়ে হয়ে গিয়েছে। ছেলেরও নিজের সংসার আছে। নিজের রোজগারে চলতে অভ্যস্ত সবিতা কারও উপরে নির্ভরশীল করতে চান না। তাঁর কথায়, “পুজোয় এ বার আনন্দ ছিল না। বাড়িতে লক্ষ্মীপুজো হত, টাকার অভাবে এ বার হচ্ছে না।”

একই চিত্র দমদম স্টেশনেও। এক নম্বর প্ল্যাটফর্মে চা বিক্রি করতেন বছর ষাটেকের কৌশল্যা শিকদার। দোকান উঠে যাওয়ার পরে স্টেশনে জল বিক্রি করছেন। কৌশল্যা বললেন, “স্বামী পক্ষাঘাতগ্রস্ত। ভাড়া বাড়িতে থাকি। দোকানটাই সম্বল ছিল। যে ভাবে হোক উপার্জনের চেষ্টা চালাচ্ছি।”

কষ্টের পাশাপাশি ক্ষোভও উগরে দিচ্ছেন তাঁরা। পুনর্বাসন না দিয়ে বিনা নোটিসে এক রাতে দোকান গুঁড়িয়ে তুলে দেওয়া অনৈতিক বলে মনে করছেন তাঁরা। দমদম স্টেশনের আর এক হকার, রুটি বিক্রেতা সুমিত্রা শিকদার বলেন, “মানুষ মন্দির-মসজিদে এত দান করেন। আমাদের মতো অসহায়ের জন্য কেউ ভাবেন না।”

আজ, লক্ষ্মীপুজোয় এক দিকে ঘরে ঘরে দেবীর আরাধনা চলবে। অন্য দিকে পুতুল, ছায়া, সবিতাদের মতো বাস্তবের লক্ষ্মীরা তাঁদের লক্ষ্মীলাভের লড়াই চালিয়ে যাবেন। হকার দিদিদের মতে, এ বছরের উৎসবের জৌলুস তাঁদের কাছে ফিকে। আগে পুজোয় ক’দিন কাজ করতে না হলেও, এ বছর ঘুরে ঘুরে ব্যবসা করতে হয়েছে। তবে বয়সজনিত কারণে অনেকেই ট্রেনে ঘোরাঘুরি করতে পারছেন না। স্টেশনেরই কোথাও অস্থায়ী ভাবে বসছেন। পুলিশ এলেই উঠে যাচ্ছেন। কত দিন এই লুকোচুরি চলবে? পুনর্বাসন কি আদৌ মিলবে? এই প্রশ্নই এখন ঘুরছে স্টেশনগুলির তল্লাটে।

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Hawker Eviction Lakshmi Puja West Bengal government Indian Railways Eviction Notice

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy