বাঁশ-কাপড়ের ঘুপচি দোকানে বাজি বিক্রি করছিলেন বছর কুড়ির দুই যুবক। থরে থরে সাজানো ফুলঝুরি, রংমশাল, চরকা, তুবড়ি। একটু খেয়াল করতেই চোখে পড়ল ‘নিরীহ’ বাজির আড়ালে রাখা চকলেট বোমা, কালীপটকা, দোদোমা। দাম জিজ্ঞাসা করতেই একটু থমকালেন এক যুবক। মুখের দিকে তাকিয়ে কার্যত অস্ফূটেই জানালেন দাম। কিন্তু ওই সব শব্দবাজি বিক্রি করা তো নিষেধ? প্রশ্ন করতেই দ্রুত ‘লুকিয়ে’ ফেলা হল সেই বাজি। পুলিশের লোক নয় বলে আশ্বস্ত করতে এক জন নিচু গলায় বললেন, “আমরা কলেজে পড়ি। কিছু বাড়তি রোজগারের আশায় বাজির দোকান দিয়েছি। এই বাজিই তো লোকে চায়। এতে লাভও বেশি।’’
কালীপুজো, ছটপুজোয় শুধুমাত্র সবুজ বাজি পোড়ানো যাবে বলে নতুন নির্দেশিকা জারি করেছে রাজ্য সরকার। বাজি বিক্রি নিয়েও নানা নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে। কিন্তু চম্পাহাটির হাড়ালে বাজি বাজার ঘুরে দেখা গেল, রমরমিয়েই বিকোচ্ছে নিষিদ্ধ নানা বাজি। কেউ কিছুটা রেখে-ঢেকে শব্দবাজি বিক্রি করছেন। কেউ আবার বিক্রি করছেন প্রকাশ্যেই।
বাজির জন্যই বিখ্যাত হাড়াল। এই গ্রাম ও সংলগ্ন এলাকায় কার্যত ঘরে ঘরে বাজি তৈরি হয়। কয়েকশো স্থায়ী দোকানে সারা বছরই বাজি বিক্রি হয়। কালীপুজোর সময়ে আরও কয়েকশো অস্থায়ী দোকান বসে। জেলার বিভিন্ন প্রান্ত, এমনকি, জেলার বাইরে থেকেও লোকজন আসেন। তখন কার্যত মেলার চেহারা নেয় এলাকা। খুচরো ও পাইকারি— দু’ধরনের ব্যবসাই চলে।
এক সময়ে অন্যান্য বাজির পাশাপাশি হাড়ালের শব্দবাজির চাহিদা ছিল আকাশছোঁয়া। শব্দবাজি নিষিদ্ধ হওয়ার পরে সেই উন্মাদনা কিছুটা কমেছে। তবে স্থানীয় সূত্রের খবর, হাড়ালে শব্দবাজি তৈরি বা বিক্রি কখনওই বন্ধ হয়নি। শব্দবাজি তৈরি করতে গিয়ে একাধিক দুর্ঘটনা ও প্রাণহানিও ঘটেছে। অভিযোগ, পুলিশ নিয়মিত অভিযান চালালেও পুরোপুরি রাশ টানা যায়নি নিষিদ্ধ বাজি তৈরিতে। ব্যবসায়ীদের একাংশ জানান, শব্দবাজির চাহিদা বেশি, লাভের অঙ্কও চড়া। তাই আড়ালে-আবডালে বাজি তৈরি চলছেই। বছরভর হাড়ালে নির্দিষ্ট জায়গায় খোঁজ করলেই তা মেলে। কালীপুজোর আগে কার্যত প্রকাশ্যেই বিক্রি হয়।
বাজার ঘুরে দেখা গেল, অন্তত চার-পাঁচ রকমের চকলেট বোমা মিলছে। এক ব্যবসায়ীর কথায়, “হাড়ালের বোমা মানেই আওয়াজের ‘গ্যারান্টি’। যত দাম, তত আওয়াজ।” শব্দবাজির খোঁজে আসা ক্রেতারও দেখা মিলল প্রচুর। তবে দাম নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করলেন অনেকেই। জয়নগর থেকে আসা এক ক্রেতার কথায়, “ক’বছর আগে ৫০ টাকায় ১০০টি বোমাও কিনেছি। দাম ক্রমশ বাড়ছে।’’ ব্যবসায়ীরা জানান, এ বার টানা বৃষ্টির জেরে বাজি শোকানোর সময় মেলেনি। উৎপাদন কম হয়েছে, তাই দাম বেড়েছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী সমিতির তরফে অবশ্য মাইকে ক্রমাগত নিষিদ্ধ বাজি বিক্রি না করার বার্তা দেওয়া হচ্ছে। ব্যবসায়ী সমিতির তরফে অজয়কুমার চক্রবর্তী বলেন, “প্রশাসন এবং ব্যবসায়ী সমিতির তরফে সকলকে সতর্ক করা হয়েছে। তার পরেও কেউ লুকিয়ে নিষিদ্ধ বাজি বিক্রি করছে খবর পেলে আমরা দ্রুত ব্যবস্থা নিচ্ছি।’’
বারুইপুর পুলিশ জেলার অতিরিক্ত সুপার অতীশ বিশ্বাস জানান, নিষিদ্ধ বাজির বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চলছে। ইতিমধ্যেই ১৩টি মামলা হয়েছে। ১৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ৩০০০ কেজির বেশি বাজি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।