কবি জয় গোস্বামীর সঙ্গে যা ঘটেছে, তাতে অস্বস্তিতে লেখিকা তসলিমা নাসরিনও। রবীন্দ্র সদনের অনুষ্ঠানে কবিকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন তিনিই। জয়ের সঙ্গে সেখানে যে ব্যবহার করা হয়েছে, তা নিয়ে দুঃখপ্রকাশ করেছেন তিনি। জানিয়েছেন, ওই ঘটনায় তিনিও অপমানিত হয়েছেন। জয়ের বাড়িতে গিয়ে দেখাও করতে চান তসলিমা। তা শুনে জয় জানালেন, ওই ঘটনায় তসলিমাও যে অপমানিত বোধ করছেন— এটাই তাঁর কাছে যথেষ্ট। অন্য দিকে, শনিবারের ঘটনা নিয়ে মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল জানান, তৃণমূল জমানায় বিভিন্ন বিষয়ে কবির নীরবতার কারণেই জনমানসে ক্ষোভ দানা বেঁধেছে।
তসলিমা জানিয়েছেন, রবিবার বা সোমবারের মধ্যে জয়ের বাড়িতে যাবেন তিনি। তবে রবিবার রাত ৯ টা পর্যন্ত তা হয়ে ওঠেনি। তসলিমার সঙ্গে আলাদা ভাবে ফোনালাপও হয়নি জয়ের। লেখিকার সদিচ্ছা নিয়ে কোনও সংশয় নেই কবির মনে। তবে জয়ের দাবি, লেখিকার তাঁর সঙ্গে দেখা হোক— এমনটাই হয়তো সকলে চাইছেন না। এ প্রসঙ্গে সাহিত্যজগতেও ‘থ্রেট কালচারের’ তত্ত্ব উস্কে দিয়েছেন তিনি। কবির দাবি, ‘থ্রেট কালচারের প্রধান সহ-পরিচালকই’ চান না তাঁর সঙ্গে তসলিমার দেখা হোক। যদিও নির্দিষ্ট ভাবে কারও নামোল্লেখ করেননি জয়।
বাম জমানায় কলকাতা ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন তসলিমা। দু’দশক পেরিয়ে আবার কলকাতায় ফিরেছেন তিনি। শনিবার রবীন্দ্র সদনে তসলিমার এক অনুষ্ঠান ছিল। সেখানে জয়কেও আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন লেখিকা। অনুষ্ঠানের একটি পর্বে জয়কে কিছু বলার জন্য মঞ্চে ডেকেছিলেন তিনি। কিন্তু দর্শকাসন থেকে কয়েক জন দাঁড়িয়ে তার প্রতিবাদ করেন। কিছু ক্ষণের জন্য ছন্দপতন ঘটে। শেষমেশ মঞ্চে ওঠেননি কবি। এমনকি, তসলিমার ভাষণ শেষ হওয়ার আগেই তিনি প্রেক্ষাগৃহ ছেড়ে বেরিয়ে যান।
ওই ঘটনা নিয়ে রবিবার মুখ খোলেন লেখিকা। এ দিন বাংলা আকাদেমিতে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন তসলিমা। সওয়াল করেন মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে। রবীন্দ্র সদনে জয়ের সঙ্গে যা ঘটেছে, তা নিয়ে দুঃখপ্রকাশ করেন। জানান, কলকাতাকে তিনি দেখেন প্রগতিশীলদের শহর হিসেবে। এই শহরে সকলে বাক্স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের অধিকারে বিশ্বাস করেন বলেই মনে করেন তিনি। তাই কলকাতার বুকে রবীন্দ্র সদনের মতো ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে না বলেই আশাবাদী তসলিমা।
শনিবারের ঘটনা প্রসঙ্গে তসলিমা বলেন, ‘‘আমার তো খারাপ লাগবেই। ওটা তো শুধু জয়কে অপমান করা হয়নি। আমাকেও অপমান করা হয়েছে। আমিই তো জয়কে ডেকেছিলাম। আমি আমার ভাষণে বাক্স্বাধীনতার কথা বলেছি, আমাদের ভিন্ন মত থাকতেই পারে। কিন্তু আমাদের সবাইকে কথা বলতে দিতে হবে। কারও কথা বলা বন্ধ করে দেওয়া ঠিক নয়।’’
বাক্স্বাধীনতার পক্ষে নিজের অবস্থান আরও স্পষ্ট করে লেখিকা বলেন, ‘‘আমার কথা যাঁরা পছন্দ করেছেন, তাঁদের মধ্যেই কি কেউ ছিলেন যাঁরা জয়কে মঞ্চে উঠতে দেননি? তা হলে তো দু’রকম হয়ে গেল! একজন যখন মতপ্রকাশের পক্ষে বলছেন, তখন তাঁকে সমর্থন করছেন। আবার মতপ্রকাশের জন্য তিনি যখন কোনও কবিকে ডাকছেন, তখন তাঁর কথা শুনতে চাইছেন না।’’
তসলিমার এই বক্তব্যের পরে আনন্দবাজার ডট কম যোগাযোগ করে জয়ের সঙ্গে। কবি জানান, তিনিও সংবাদমাধ্যম থেকেই বিষয়টি শুনেছেন। বললেন, “আমার সঙ্গে যে ব্যবহারটা করা হয়েছে, তাতে উনি অপমানিত বোধ করেছেন। এটাই যথেষ্ট।” লেখিকার শনিবারের বক্তৃতার প্রশংসাও করেন তিনি। বিশেষ করে, ওই অনভিপ্রেত ঘটনার জেরে যে ছন্দপতন হয়েছিল, তার পরে তসলিমা যে ভাবে ফের অনুষ্ঠানের আবহ গড়ে তোলেন, তা ‘অসাধারণ’ বলেই মনে করেন জয়।
কবি জানালেন, সংবাদমাধ্যমের থেকেই তিনি খবর পান যে তসলিমা তাঁর বাড়িতে যেতে আগ্রহী। তবে তসলিমার ব্যস্ত সূচির কথা ভেবে কবি তাঁকে ফোন করেননি। বললেন, “অল্প কয়েক দিনের জন্য এসেছেন তো। কত দিন পরে কলকাতায় এসেছেন। এই সময়টা ওর উপরে চাপ থাকবে, ব্যস্ততা থাকবে। তাই আমি ওঁকে ফোন করার চেষ্টা করিনি।”
লেখিকার সঙ্গে কথা না-হলেও জয় নিশ্চিত তসলিমার সদিচ্ছা নিয়ে। বললেন, “উনি (তসলিমা) যখন বলেছেন, তখন নিশ্চয়ই সময় করতে পারবেন— এটা ভেবেই বলেছেন। এ বিষয়ে আমার কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু শেষপর্যন্ত সময় করা সম্ভব হবে কি না, তা আমি জানি না।” এর পরেই সাহিত্যজগতে ‘থ্রেট কালচারের’ অভিযোগ তোলেন জয়।
সরাসরি কারও নামোল্লেখ করেননি তিনি। কবি বলেন, “থ্রেট কালচারের লোকেরা ঘুরছে। তারা চেষ্টা করবে যাতে উনি আমাদের বাড়িতে না আসতে পারেন। সাহিত্য ক্ষেত্রে একটা থ্রেট কালচার ছিল। সেই থ্রেট কালচারের প্রধান সহ-পরিচালককে সে দিন মঞ্চে খুব সক্রিয় ভূমিকায় দেখা গিয়েছে। বক্তৃতা করেছেন। তিনি কবিতা, গল্প, উপন্যাস ইত্যাদি লেখেন। তিনি কখনও চাইবেন আমার সঙ্গে তসলিমার দেখা হোক? চাইবেন না। তাই আমি মনে করি, এমন ভাবে সূচিটা বানানো হবে, যাতে আমার সঙ্গে দেখা না হয়।”
জয়ের কথায়, “সাহিত্যজগতে ২০১৩-১৪ সাল থেকে থ্রেট কালচার এসে গিয়েছিল। সেটা দেখতে পেয়েই তো ২০২৩ সালে অবসর নিয়ে নিই। এটা অন্যতম কারণ, যা এত দিন বলিনি। এখন বললাম।”
শনিবারের ঘটনা নিয়ে মুখ খুলেছেন রাজ্যের পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পালও। জানিয়েছেন, তিনিও জয়ের লেখা কবিতার ভক্ত। তবে তৃণমূল জমানায় বিভিন্ন বিষয়ে কবির নীরবতার কারণেই জনমানসে ক্ষোভ দানা বেঁধেছে বলে মনে করেন মন্ত্রী। অগ্নিমিত্রা বলেন, “কবি-সাহিত্যিক বা সৃজনশীল জগতের লোকেরা অন্যায়ের প্রতিবাদ করবেন— আমরা সেটাই মনে করি। কিন্তু ১৫ বছর জয় গোস্বামী যে ভাবে চুপ করেছিলেন, তাতে আমরা ব্যথিত। এত অন্যায় হয়েছে, সেখানে জয় গোস্বামী কোনও প্রতিবাদ করেননি। সেই জন্যই গতকাল তসলিমা নাসরিন তাঁকে মঞ্চে ডাকেন, বাংলার মানুষ তার প্রতিবাদ করেছেন।”