শহরে পুরনো, বিপজ্জনক বাড়ি ভেঙে পড়ার ঘটনা থামছে না। এই ধরনের জীর্ণ বাড়িতে বসবাস করতে গিয়ে বেঘোরে প্রাণ যাচ্ছে দেখেও হুঁশ হচ্ছে না অনেকের। অভিযোগ, অধিকাংশ পুরনো বাড়ির ক্ষেত্রেই বাসিন্দারা বাড়ির সংস্কার করানোর পথে হাঁটেন না। অন্যত্র গিয়ে থাকতেও রাজি হন না। প্রশ্ন উঠেছে, এই রোগ কি সারবে নতুন সরকারের আমলে? এখনও পর্যন্ত বিজেপি সরকারের তরফে এ ব্যাপারে কোনও প্রতিক্রিয়া মেলেনি। যদিও প্রশাসনিক কর্তাদের দাবি, পুরসভার আইন ইতিমধ্যেই সংশোধন করে সরল করা হয়েছে। বেশ কিছু ছাড়ের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। তবে তার পরেও কাজের কাজ হচ্ছে না কেন, সেটা দেখা হবে। সে ক্ষেত্রে পুর আইন সংশোধন ছেড়ে নতুন আইন পাশ করানোর পথেও হাঁটতে পারে সরকার।
এই প্রসঙ্গে কলকাতা পুরসভার প্রাক্তন ডিজি (বিল্ডিং) দেবাশিস চক্রবর্তীর মন্তব্য, ‘‘বিপজ্জনক বাড়ি সংস্কারে পুর আইন খাতায়-কলমেই রয়েছে। বাস্তবে কোনও ক্ষমতা নেই। বাড়িওয়ালা-ভাড়াটের ঝামেলায় বাড়ির সংস্কার হয়ে ওঠে না।’’ পুরসভাকে আরও আইনি ক্ষমতা দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন পুর আধিকারিকদের বড় অংশই। ‘কলকাতা গৃহমালিক সমিতি’র সম্পাদক সুকুমার রক্ষিতের আবার দাবি, ‘‘বর্তমান বাজারমূল্য অনুযায়ী ভাড়া বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে। কম ভাড়ায় ভাড়াটেরা থাকেন বলে সংস্কারের সময়েও তাঁদের যৎসামান্যই যোগদান পাওয়া যায়। মূল ভাড়াটে আইনের সংস্কার না হলে পুরনো বিপজ্জনক বাড়ির সংস্কার প্রক্রিয়া অসম্ভব।’’
পুরসভা সূত্রের খবর, বর্তমানে কলকাতায় বিপজ্জনক বাড়ির সংখ্যা প্রায় ৩৭০০। এর মধ্যে অন্তত ১৫০টি অতি বিপজ্জনক বাড়ি। কিন্তু বছরের পর বছর সেই সব বাড়ির সংস্কার হচ্ছে না। বহু ক্ষেত্রে মালিকেরও খোঁজ মিলছে না। কোথাও আবার মালিক থাকলেও ভাড়াটেরা সংস্কারে এগিয়ে আসছেন না। এমন উদাহরণও প্রচুর, যেখানে প্রোমোটারকে দিয়ে সংস্কার করানোর পরিকল্পনা হলেও সহমত হচ্ছে না কোনও পক্ষই। পুরনো ঘর ধরে রাখলে বহুতল ওঠার পরে ফ্ল্যাট পাওয়া যাবে ভেবে নিয়েও থেকে যাচ্ছেন অনেকে। ফি-বছর টানা কয়েক দিন বৃষ্টি হলেই এই সব বাড়ি ভেঙে পড়ছে। ১৯৮০ সালের পুর আইন অনুযায়ী, এমন বাড়ির ক্ষেত্রে ৪১১ (১) ধারা অনুযায়ী, প্রথমে ‘বিপজ্জনক’ নোটিস দিতে পারে পুরসভা। এর পরেও
সংস্কারের কাজ না হলে ৪১১ (২) ধারায় বাড়ির সামনে ‘বিপজ্জনক বাড়ি’ লেখা হোর্ডিং টাঙাতে পারে। তাতেও কাজ না হলে ৪১১ (৩) ধারায় বাড়ির মালিককে ব্যবস্থা নিতে সতর্ক করা হয়। এর পরে পুরসভা ৪১১ (৪) ধারায় বাড়ির বিপজ্জনক অংশ ভেঙে দিতে পারে।
পুরসভার বিল্ডিং দফতরের কর্তারা জানাচ্ছেন, এই সময়েও বাসিন্দারা বাড়ি ছাড়তে রাজি না হলে পুর আইনের ৪১২ (১) ধারায় বাড়ি খালি করার নোটিস দেয় পুরসভা। ৪১২ (২) ধারায় পুলিশকেও পদক্ষেপ করতে বলতে পারে। কিন্তু এই প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার সময় এলেই ভাড়াটেরা আদালতে গিয়ে স্থগিতাদেশ নিয়ে আসেন। জোর করে তাঁদের সরানোর ক্ষমতা পুরসভার নেই।
পুরকর্তাদের দাবি, এমন পরিস্থিতির জন্যই পুর বিল্ডিং আইনের ৪১২ নম্বর ধারা সংশোধন করে ৪১২এ ধারা আনা হয়। যেখানে বলা আছে, মালিক পুরনো বাড়ির সংস্কারে এগিয়ে এলে তাঁকে বাড়তি ছাড় দেওয়া হবে। ভাড়াটেরাও সংস্কার করতে পারবেন। কোনও পক্ষই রাজি না হলে পুরসভা তৃতীয় পক্ষকে দিয়ে সংস্কার করাবে। কিন্তু তা-ও বহু ক্ষেত্রেই বাড়িওয়ালা-ভাড়াটেরা সংস্কারে আগ্রহ দেখান না। ভাড়াটেরা দাবি তোলেন, সংস্কারের জন্য জায়গা ছেড়ে গেলে আর তাঁদের বাড়িতে ফেরা হবে না। ৪১২এ ধারায় ভাড়াটেদের ‘বাসিন্দা শংসাপত্র’ দেওয়ারও সংস্থান করা হয়। কিন্তু কলকাতা পুরসভার ২৪ নম্বর ওয়ার্ড, যেখানে প্রথম এমন শংসাপত্র দেওয়া হয়, সেখানেই পুরনো বাড়ির বিপদ কাটেনি।
এই পরিস্থিতিতে ওই শংসাপত্র দেওয়া বন্ধ হয়ে গিয়েছে। পুরসভা সূত্রের খবর, শহরে যে সংখ্যায় বিপজ্জনক বাড়ি রয়েছে, তার ২০ শতাংশই রয়েছে ওই ২৪ নম্বর ওয়ার্ডে। সেখানকার তৃণমূলের প্রাক্তন পুরপ্রতিনিধি ইলোরা সাহা বলেন, ‘‘বেশির ভাগ বিপজ্জনক বাড়ির মালিকের খোঁজ পাওয়া যায়নি। বাড়ির মালিক সংস্কারে এগিয়ে না এলে ভাড়াটেদের শংসাপত্র দিয়ে কী লাভ?’’ তা হলে সমাধান কিসে? উত্তর মেলে না কোনও পক্ষ থেকেই।