শহরের একাধিক উড়ালপুল ও রাস্তায় রামধনু রং গাড়ি বা মোটরবাইক চালকদের জন্য বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াবে না তো? পুজোর মুখে শহর সাজাতে যান চলাচলের জন্য ব্যবহৃত রাস্তার রং বদল ঘিরে এমনই চর্চা শুরু হয়েছে। পরিবেশকর্মী থেকে যানবাহন বিশেষজ্ঞদের অনেকেই বলছেন, এমন রঙের জেরে গাড়ি ও মোটরবাইক চালকদের দৃষ্টিভ্রম হতে পারে। এমন রঙের রাস্তা থেকে আলো প্রতিফলিত হয়ে সরাসরি চালকের চোখে গিয়ে পড়তে পারে। বৃষ্টি হলে এমন রঙে থাকা তেল রাস্তাকে আরও পিচ্ছিল করে তুলতে পারে। যার জেরে চাকা পিছলে বিপদ ঘটার ঝুঁকি প্রবল! অনেকের এ-ও প্রশ্ন, রাস্তায় থাকা ‘ট্র্যাফিক পুলিশ সঙ্কেত’ ঢেকে দিয়ে এমন রং করার অনুমতি দেওয়া হলই বা কী করে? রাজ্যের পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পালের যদিও দাবি, ‘‘গাড়িচালকদের তেমন কোনও সমস্যা হবে না। এমন একটা রং লাগানো হয়েছে, যেটা কয়েক মাসেই উঠে যাবে।’’
অগ্নিমিত্রা জানিয়েছেন, গড়িয়াহাট উড়ালপুল, চিংড়িঘাটা উড়ালপুল এবং রেড রোডে এই রামধনু রং করানো হয়েছে। পার্ক সার্কাস মোড়ের কাছে ও গড়িয়াহাট উড়ালপুলের নীচে আলপনা আঁকানো হয়েছে। মন্ত্রী বলেন, ‘‘কয়েকটি দেশ করলেও কলকাতার রাস্তায় এলজিবিটি বা কোনও সম্প্রদায়ের কথা ভেবে রামধনু রং করা হয়নি। আমরা এই রাস্তার নাম দিয়েছি ভালবাসার রাস্তা। বিশ্বাসের রাস্তা, সৌহার্দ্যের রাস্তা। তবে, সরকারি টাকায় নয়, কয়েকটি সংস্থা তাদের কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি তহবিল দিয়ে কাজটা করে দিয়েছে।’’ যদিও পরিবেশ প্রযুক্তিবিদ তথা যানবাহন বিশেষজ্ঞ সোমেন্দ্রনাথ ঘোষ বলছেন, ‘‘সামান্য এক সেকেন্ডই পথে দুর্ঘটনার জন্য যথেষ্ট। রাস্তা রং করা তো দূর, গাড়িচালকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে, এমন কিছুই করা উচিত নয়। এর চেয়ে কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি ফান্ডে শহরের ভাঙা রাস্তা সারিয়ে দিতে বললে ভাল হত।’’ প্রসঙ্গত, রাস্তার মাঝের পথ-বিভাজিকা বা রেলিংয়ে নীল-সাদা রং করা নিয়ে বিগত সরকারের আমলে আদালতে মামলা হয়েছিল।
সোমেন্দ্রনাথের মতো অনেকেরই দাবি, বিশ্বের কয়েকটি দেশে রাস্তার মোড়ে বা পথচারীদের জন্য বরাদ্দ রাস্তায় এমন রং করা হয়েছে। কিন্তু পাঁচশো মিটার বা তার চেয়ে বেশি দৈর্ঘ্যের কোনও রাস্তায় রং করা বিপজ্জনক। ‘ইন্ডিয়ান রোড কংগ্রেস’ সেই কারণেই পথের দিক-নির্দেশ বা সিগন্যাল সংক্রান্ত রং বেঁধে দিয়েছে। তাদের যুক্তি, উপর থেকে এমন রং করে দিলে রাস্তায় যে ‘সাইনেজ’ থাকে, সেটা ঢাকা পড়ে যায়। যে কোনও রঙে কিছু মাত্রায় তেল থাকে। বৃষ্টির জল পড়লে সেই তেল এবং জল রাস্তা পিচ্ছিল করে তুলতে পারে। এমন রঙের জন্য রাস্তা আরও মসৃণ হয়ে গেলে চাকার টায়ারের সঙ্গে রাস্তার ঘর্ষণ কমে যায়। গাড়ি বা মোটরবাইক পিছলে যেতে পারে। তা ছাড়া, রাস্তার কালো রঙে সূর্যের আলো পড়ে কম প্রতিফলিত হয়। সেখানে এমন রঙে আলোর প্রতিফলন বেড়ে দৃষ্টিভ্রম তৈরি করতে পারে। সোমেন্দ্রনাথ বলেন, ‘‘এমন রঙে রাস্তার গর্তও ঢাকা পড়ে যায়। বিপদ তাতে আরও বাড়ে। দিনকয়েকেই এই রং উঠতে শুরু করলে দৃষ্টিনন্দনের চেয়ে কুৎসিত ভাবটাই স্পষ্ট হবে বেশি।’’
একই রকম দাবি চোখের চিকিৎসক জ্যোতির্ময় দত্তের। বললেন, ‘‘বিজ্ঞানসম্মত ভাবেই রাস্তায় রং করা হয়। ট্র্যাফিক সিগন্যালের রং লাল করা হয়, কারণ, লাল রঙের তরঙ্গদৈর্ঘ্য বেশি। সেখানে এই ভাবে যেমন খুশি রং করে রঙিন হওয়ার কী দরকার পড়ল?’’ পরিবেশ ও সমাজকর্মী নব দত্তের মন্তব্য, ‘‘ঘর সাজানো, নিজেকে সাজানো আর মানুষের নিরাপত্তা জড়িয়ে রয়েছে যেখানে, সেই রাস্তা সাজানো এক ব্যাপার নয়। সব
মিলিয়ে এমন রঙে কাকে কী সম্মান জানানো হচ্ছে, সেটাই তো বোঝা
গেল না!’’